মুসলিম উম্মাহর দ্বারপ্রান্তে পবিত্র শবে বরাত

মুসলিম উম্মাহর দ্বারপ্রান্তে পবিত্র শবে বরাত

গাজী মো. রুম্মান ওয়াহেদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:২৫ ১৫ এপ্রিল ২০১৯   আপডেট: ২১:৩২ ১৫ এপ্রিল ২০১৯

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

সময়ের চাকা ঘুরে আবার মুসলিম উম্মাহর দ্বারপ্রান্তে হাজির হয়েছে পবিত্র শবে বরাত।

শবে বরাতকে আরবিতে ‘লাইলাতুল বারাআত’বা মধ্য-শা'বান নামে অভিহিত করা হয়। ‘শব’ ফারসি শব্দ। এর অর্থ রজনী বা রাত, আরবিতে একে ‘লাইলাতুন’ বলা হয়। আর ‘বারাআত’ শব্দের অর্থ মুক্তি, নাজাত, নিষ্কৃতি প্রভৃতি। ‘লাইলাতুল বারাআত’ মানে মুক্তির রজনী বা নিষ্কৃতির রজনী।

শবে বরাত হিজরী শা’বান মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যে পালিত একটি পূণ্যময় রাত। এই রাতকে লাইলাতুল বরাতও বলা হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানের অনেক মুসলমান ইবাদাতের মাধ্যমে এই রাত পালন করেন। তবে মুসলিমদের কোনো কোনো দল এই রাতে বিশেষ কোনো ইবাদাতের নির্দেশ নেই বলে মনে করেন।

কোরআন ও হাদিসে উল্লেখ: এই বিশেষ রাতের ব্যাপারে কোরআনে সরাসরি কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। অবশ্য কেউ কেউ সূরা আদ-দুখান এর ৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত বরকতময় রাতকে শবে বরাত হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অন্যরা বরকতময় রাত দ্বারা শবে কদরকে বুঝানো হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। সিহাহ সিত্তাহ বা বিশুদ্ধ ছয়টি হাদিসগ্রন্থের কোনো কোনো হাদিসে এই রাতের বিশেষত্ব নির্দেশক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এছাড়াও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থেও এই রাতের বিশেষত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। হাদিসগুলোর সনদ বিভিন্ন মানের এবং এবিষয়ে মতভেদ বিদ্যমান।

হাদিস শাস্ত্রে ‘শবে বরাত’ বলতে যে পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা হলো ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শা'বান’ তথা ‘শা'বান মাসের মধ্য রজনী’। একটি হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে (বিছানায়) না পেয়ে তাঁর খোঁজে বের হলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, তিনি জান্নাতুল বাকিতে, তাঁর মাথা আকাশের দিকে তুলে আছেন। তিনি বলেন, হে আয়েশা! তুমি কী আশঙ্কা করেছো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করবেন? আয়েশা (রা.) বলেন, তা নয়, বরং আমি ভাবলাম যে, আপনি হয়তো আপনার কোনো স্ত্রীর কাছে গেছেন। তিনি বলেন, মহান আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে দুনিয়ার নিকটবর্তী আকাশে অবতরণ করেন এবং কালব গোত্রের মেষপালের পশমের চাইতেও অধিক সংখ্যক লোকের গুনাহ মাফ করেন। (১) (সনদ দুর্বল)।

আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, আল্লাহ মধ্য শাবানের রাতে আত্নপ্রকাশ করেন এবং মুশরিক ও হিংসুক ব্যতীত তাঁর সৃষ্টির সকলকে ক্ষমা করেন। (২) (৩)।

শবে বরাত উদযাপন: ইরানে শবে বরাত শিয়া মাজহাবের দ্বাদশ ইমাম হজরত ইমাম মাহদির জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়। এই রাতে ইরানের সর্বত্র আলোক সাজসজ্জা করা হয়, দোয়া-মাহফিলের আয়োজন করা হয়। (৪)। অন্যদিকে এক-দুটি দল বাদে সুন্নি দলগুলো গুনাহ মাফের রাত হিসেবে শবে বরাত পালন করেন।

শবে বরাতের অন্যান্য নাম:
> লাইলাতুল বরাত।
> লাইলাতুল দোয়া।
> ইরান ও আফগানিস্তানে নিম শা'বান।
> আরবী ভাষাভাষীগণ বলেন নিসফ্ শা'বান।
> মালয় ভাষাভাষীগণ বলেন নিসফু শা'বান।
> তুর্কি ভাষাভাষীগণ বলেন বিরাত কান্দিলি।
> ভারতীয় উপমহাদেশে বলা হয় শবে বরাত।

ভ্রান্ত বিশ্বাস: শবে বরাতের রাতে প্রথম কোরআন নাজিল হয়েছিল এবং এ রাতে আগামী এক বছরের ভাগ্য লেখা হয় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। এটা সম্পূর্ণভাবে পবিত্র কোরআনের ও বিশুদ্ধতম হাদিসের বিরোধী। তাই এমন বিশ্বাস অবশ্যই বর্জনীয়। পবিত্র কোরআন সর্বপ্রথম নাজিল হয়েছিল কদরের রাতে আর মহান আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টি ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেছেন জগৎ সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে।

এই রাতের বর্জনীয় আমল সমুহ: এই রাতে সম্মিলিত না হয়ে একাকী আমল করা উত্তম। কারণ সম্মিলিত হওয়ার ক্ষেত্রে আমলের চাইতে ফেতনাটাই হওয়ার আশংকা বেশি। আতশবাজি করা যাবে না। হালুয়া রুটি বিতরন করা বা নিজ ঘরে তৈরি করা যাবে না। কারণ এতে অহেতুক সময় নষ্ট হয়, এবং বর্তমানে এটা একটা বড় ধরনের ফেতনার আকার ধারন করেছে। 

মাইকে কোরআন তেলাওয়াত বা হামদ নাত পরিবেশন করে অন্যের আমলে ব্যাঘাত ঘটানো যাবে না। কবরস্থানে ভিড় করা বা মেলা বসানো যাবে না। আমাদের দেশে শবে বরাত এলে পটকা ফোটানো, কবর ও মাজারে মোমবাতি/আগরবাতি জ্বালানো, আলোকসজ্জা করা ইত্যাদি রেওয়াজ বেশ পুরোনো।  অনেকে দল বেঁধে সারা রাত ঘুরে বেড়ান, গল্প করে আড্ডা মেরে রাত পার করে দেন। একটি পুণ্যময় রাতকে এভাবে অবহেলায় নষ্ট করা মোটেও উচিত নয়। অনেকে আবার সারা রাত নফল নামাজ পড়ে, ইবাদত-বন্দেগি করে ঘুমিয়ে যান। ফজরের ফরজ নামাজ তাদের কাজা হয়ে যায়। 

স্মরণে রাখা প্রয়োজন, মহান আল্লাহর দরবারে লক্ষ বা কোটি রাকাত নফল নামাজ এক রাকাত ফরজ নামাজের সমান বিবেচিত হবে না। আর ফরজ নামাজ না পড়ার ক্ষতি পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই পূরণ করা যাবে না। 

সুতরাং নফলকে ফরজের ওপর কোনো ভাবেই প্রাধান্য দেয়া যাবে না, তাহলে সব আমলই বরবাদ হয়ে যাবে।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া।

 (১) সুনানে ইবনে মাজাহ ১৩৮৯, 
 (২) সুনানে ইবনে মাজাহ ১৩৯০, 
 (৩) Sunan Ibn Majah Vol.1 1, Book 5, Hadith 1390, Sunnah.com 
 (৪) ‘ইরানের শবে বরাত উৎসব’। প্রথম আলো। ১৪ মে ২০১৭।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে