দূরবীনপ্রথম প্রহর

মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাত করাও একটি সদকা

ওমর শাহডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম
ফাইল ছবি

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালার কাছে পছন্দনীয় আমলের মধ্যে একটি হলো কোনো মুমিনকে আনন্দিত করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে এবং তার কথা ও কাজের মাধ্যমে এ কথা স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো মুমিনকে আনন্দিত করা আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত পছন্দনীয়। এ আনন্দিত করা অনেকভাবেই করা যায়। কৌতুক বলে, হাসির কথা বলে, উপহার দিয়ে কিংবা হাসিমুখে দেখা করেও।

আল্লাহর বান্দাকে খুশি রাখা:

হজরত ডা. আবদুল হাই (র.) বলতেন, কোনো বান্দা যখন আল্লাহ তায়ালার প্রতি মনোনিবেশ করে, আল্লাহ তায়ালার প্রতি তার ভালোবাসা প্রকাশ করে, তখন আল্লাহ তায়ালা জবাবে অবস্থার ভাষায় যেন বলেন, যদি আমাকে ভালোবাস, আমি তো তোমাদের সঙ্গে পৃথিবীতে মিলিত হবো না যে কোনো সময় সাক্ষাত করে স্বীয় ভালোবাসা প্রকাশ করবে। তবে আমার সঙ্গে তোমাদের ভালোবাসার দাবি হলো, আমার বান্দাদেরকে ভালোবাস, আমার সৃষ্টিকে ভালোবাস। আমার সৃষ্টিকে ভালোবাসার দাবি হলো, যথাসম্ভব তাকে খুশি করা ও খুশি রাখার চেষ্টা করো।

অন্তর খুশি করাই বড় হজ:

আমাদের সমাজে এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি দুটোই রয়েছে। ভারসাম্যপূর্ণ কোনো পথ নেই। কিছু লোক তো এমন যারা কোনো মুসলমানকে আনন্দিত করার গুরুত্বই বোঝে না। তাদের জানা নেই এটা কত বড় ইবাদত। কোনো মুসলমান বা মানুষকে আনন্দিত করলে আল্লাহ তায়ালা কি পরিমাণ সাওয়াব দেন এর অনুভূতি আমাদের নেই। বুজুর্গগণ বলেন-

دل بدست آور کہ حج اکبر است

কোন মুসলমানের অন্তর খুশি করাই বড় হজ।

অন্যকে খুশি করার সাওয়াব:

একটু চিন্তা করুন। যদি এ হাদিসের শিক্ষার ওপর আমরা সকলে আমল করতে থাকি এবং প্রতিটি মানুষ এ কথা চিন্তা করে, আমি অন্য কাউকে খুশি করব, তা হলে এ দুনিয়া বেহেশতের নমুনা হয়ে যাবে। কোনো মনোমালিন্য বাকি থাকবে না। হিংসা বাকি থাকবে না। কেউ কাউকে কষ্ট দেবে না। তাই যত্ন করে অন্যকে খুশি করো। কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে অন্যকে খুশি করো।

যদি তোমরা সামান্য কষ্ট সহ্য কর, ফলে অন্য কেউ খুশি হয়ে যায়; কয়েক মুহূর্ত বা কয়েক মিনিটের যে কষ্ট তুমি পৃথিবীতে করেছ, এর বিনিময়ে পরকালে আল্লাহ তায়ালা যে সাওয়াব দেবেন, তা এই মামুলি কষ্টের চেয়ে বহুগুণ উৎকৃষ্ট।

হাসিমুখে সাক্ষাত করা একটি সদকা:

এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকার বহু প্রকার বর্ণনা করেছেন, এ আমলটিও সদকা, অমুক আমলটিও সদকা। সদকা হওয়ার অর্থ হলো, এ আমলের ওপর সদকা করার ন্যায় সাওয়াব হবে। এ হাদিসের শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-

و أن تلقى أخاه بوجه طلق

‘মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাত করাও একটি সদকা।’ (মুসলিম, তিরমিজি)

যখন তোমরা কারো সঙ্গে সাক্ষাত করো আর বোঝতে পার এই সাক্ষাত তাকে আনন্দিত করবে, তার হৃদয়ে প্রশান্তি অনুভব হবে, তা হলে এটাও সদকার অন্তর্ভুক্ত হবে।

অতএব যারা অন্যের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বা লেনদেনের সময় ভাব নিয়ে থাকে এবং গম্ভীরতার চাদরে আবৃত করে নিজেকে রিজার্ভ রাখে, তারা সুন্নত তরিকার ওপর আমল করে না। সুন্নত তরিকা হল, যখন কোনো মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে মিলবে, উত্তম চরিত্রের সঙ্গে হাসিমুখে মিলবে এবং তাকে আনন্দিত করে দেবে।

পাপের মাধ্যমে অন্যকে খুশি করবে না:

অপরদিকে কোনো কোনো লোকের মাঝে এ সীমালংঘন পরিলক্ষিত হয় যে, তারা বলে, যেহেতু অন্যকে খুশি করা বড় ইবাদত তাই আমরা এই ইবাদত করছি। হোক সেই খুশি করাটা কোনো পাপ বা অবৈধ কাজের মাধ্যমে। আল্লাহ তায়ালা যখন বলে দিলেন, অন্যদের খুশি করো, আমরা এ ইবাদতটি আদায় করছি, অথচ এটি একটি ভ্রষ্টতা। কারণ অন্যদের খুশি করার অর্থ বৈধ তরিকায় খুশি করা। যদি অবৈধ তরিকায় অন্যকে খুশি কর, তা হলে এর অর্থ হবে পাপ করে আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে বান্দাকে খুশি করছ, এটা কোনো ইবাদত নয়। সুতরাং যদি অন্য কারো প্রতি রেয়ায়েত করে বা তার সম্পর্কের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পাপে জড়িয়ে পড়ে, তা হলে এটা দীন নয়, এটা কোনো ইবাদত নয়।

কবি ফয়জির ঘটনা:

বাদশা আকবরের জমানায় ফয়জি নামে একজন বড় সাহিত্যিক ও কবি অতিক্রান্ত হয়েছে। একবার সে নাপিত দ্বারা দাড়ি কাটাচ্ছিল। তার পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি যাচ্ছিল। সে কবি ফয়জিকে দাড়ি কাটাতে দেখে বলল, জনাব, আপনি দাড়ি কাটাচ্ছেন? উত্তরে ফায়জি বলল-

بلی, ریش می ترا نشم

জি হ্যাঁ, দাড়ি তো কাটাচ্ছি। তবে কারো অন্তরে কষ্ট দিচ্ছি না। অর্থাৎ আমার আমল আমার সঙ্গে থাকবে। আমি কারো অন্তরে কষ্ট দিই না। আর তুমি আমার কাজে অভিযোগ তুলে আমার অন্তরে কষ্ট দিয়েছ। তখন ঐ ব্যক্তি বলল-

دلے کسی نمی خراشی ٭ ولے دلے رسول اللہ می خراشی

তুমি বলছ- আমি কারো অন্তরে কষ্ট দিই না। আরে তুমি তো এ কাজের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মনে কষ্ট দিচ্ছ।

অন্যদের খুশি করার সীমা: কারো কারো মনে ও মুখে এ কথা থাকে- আমরা তো অন্যদের অন্তর খুশি করি; এতে পাপ করতে হলে তাও করি।

ভাই, আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করে, তার নাফরমানি করে এবং আল্লাহর বিধানকে লংঘন করে কোনো মানুষের অন্তর খুশি করা বৈধ হতে পারে না। কারণ সে আল্লাহ তায়ালাকে অসন্তুষ্ট করেছে। এটা কোনো ইবাদত নয়। এ হাদিসের উদ্দেশ্য হলো, বৈধ কাজে মুসলমানদেরকে খুশি করার চিন্তা করো। হজরত থানবি (র.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, এটি সুফি-সাধকদের প্রকৃতিগত আমল। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার বন্ধু ও অলি ও সুফি-সাধকগণ সর্বদা প্রত্যেক মুসলমানকে খুশি করার চিন্তা করেন। তাদের কাছে এসে সব সময় মানুষ খুশি হয়ে ফিরে যায়- বিরক্ত হয়ে নয়। এই জন্য আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহে তাদের এ সুন্নতের ওপর আমলের তাওফিক হয়। তারা আল্লাহর বান্দাদেরকে খুশি করে থাকেন।

নিজে পাপে জড়াবে না: এরপর তিনি বলেন, তার একটি শর্ত হলো, অন্যের অন্তরে আনন্দ দিতে গিয়ে নিজে পাপে জড়াবে না। যেমন, একটি দল, তাদের মতাদর্শের অনুসারীদের উপাধি- ‘সুলহে কুল’ বা ‘সকলের সংশোধনকারী’ রেখে দিয়েছে। তাদের বক্তব্য হলো, আমরা তো ‘সুলহে কুল’- ‘সকলের সংশোধনকারী’, তাই যে যাই করুক আমরা কারো ভুল ধরব না। কোনো মন্দকে মন্দ বলব না। কোনো মন্দ কাজের প্রতিবাদ করব না। আমরা তো ‘সুলহে কুল’- এই পদ্ধতি যথার্থ নয়।

সৎ কাজের নির্দেশ বর্জন করবে না:

হজরত থানবি (র.) আরো বলেন, কেউ কেউ তো সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে না। কারণ কাউকে নামাজ পড়ার জন্য বললে তার মন খারাপ হয়ে যাবে। যদি অমুকের কোনো পাপের ভুল ধরি, তার মন খারাপ হবে। আমার কারণে কারো মন খারাপ না হোক। তিনি আরো বলেছেন, কোরআনের এ নির্দেশ কি তাদের সামনে আসে নি যে-

و لا تأخذكم بهما رأفة في دين الله

আল্লাহর দীনের ব্যাপারে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়। (নুর: ২)। অর্থাৎ এক ব্যক্তি দীনের বিরোধিতা করছে, পাপে জড়াচ্ছে, তার ব্যাপারে তোমার অন্তরে যেন দয়ার উদ্রেক না হয় যে, যদি আমি তাকে পাপ থেকে বাধা দান করি, তার অন্তর ব্যথিত হবে।

নম্রতার সঙ্গে পাপ থেকে বাধা দান করো: মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য কষ্ট কম পায় এমন পদ্ধতি অবলম্বন করবে। কষ্টদায়ক তরিকা অবলম্বন করবে না। বরং নম্রতা, সহমর্মিতা, দয়া, ভালোবাসা, কল্যাণকামিতা ও ইখলাসের সঙ্গে হবে। রাগ ঝাড়া উদ্দেশ্য হবে না। তবে এই চিন্তা করা- যদি আমি তাকে বাধা প্রদান করি সে কষ্ট পাবে- নম্রতার সঙ্গে হলেও ঠিক নয়। কারণ মাখলুককে সন্তুষ্ট করার চেয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা আগে।

অতএব প্রতিটি মুসলমানকে খুশি করার চেষ্টা করো, তবে যেখানে আল্লাহর সীমা এসে যায়, হারাম ও অবৈধ কাজ এসে যায়, তখন কারো অন্তর ব্যথিত হোক বা খুশি হোক, ঐ সময় আল্লাহর হুকুমই মানতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই আনুগত্য করতে হবে। অন্য কারো পরোয়া করা যাবে না। তবে যথাসম্ভব নম্রতা অবলম্বন করা চাই।

মহান রাব্বুল আরালামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

daily-bd-hrch_cat_news-20-10