Alexa মুক্তির অগ্রদূতের ফিরে আসা

মুক্তির অগ্রদূতের ফিরে আসা

প্রকাশিত: ১১:০০ ১০ জানুয়ারি ২০২০  

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সত্তর ও আশির দশকে ‘শাহনাজ কালাম’ লেখক নামে ছড়া ও গল্প লিখিয়ে হিসেবে পরিচিত হলেও পেশা জীবনে এসে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠক্রমভিত্তিক গ্রন্থ রচনা এবং শিল্প-সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ক গ্ৰন্থ ও প্ৰবন্ধ লেখায় বিশেষ মনোনিবেশ করেন। ড. শাহনাওয়াজের রচিত ও সম্পাদনাকৃত গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। এক যুগের বেশি সময়কাল ধরে তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে রাজনীতি ও সমাজ-সংস্কৃতি বিষয়ক কলাম লিখে আসছেন।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বেড়ে ওঠাটা একটু আলাদা। যুগের বা সময়ের প্রয়োজনে প্রকৃতি থেকে হঠাৎ জন্ম নেয়া নয়। বাঙালির মুক্তির অগ্রদূত হতে তিলে তিলে তিনি নিজেকে তৈরি করেছিলেন।

জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানের উর্দুভাষী শাসকগোষ্ঠী সঙ্কট তৈরি করেছিল। তাইতো দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ৭ কোটি বাঙালি তৃপ্ত হয়নি। পথচেয়ে ছিল কবে সেই মুক্তির অগ্রদূত ফিরে আসবেন? এলেন ২৫দিন পর। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যখন ফিরলেন মূলত তখনই দেশ পেল আসল মুক্তির স্বাদ। স্বাধীনতার কথায় আসলে দেখা যায়- যে বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা অর্জনে সোচ্চার হয়েছিল, চার মাসের মাথায় তাদেরই মোহভঙ্গ হলো। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্লোগান তুলতে হলো ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরে। 

বাঙালির প্রতিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তরুণ শেখ মুজিব শুরু থেকেই নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। তিল তিল করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। ১৯০৬-এ মুসলিম লীগ সৃষ্টির সঙ্গে ১৯৪৯-এ আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মের মনস্তাত্তি¡ক কারণ অনেকটা অভিন্ন। মুসলিম লীগ জন্মের অনেক আগেই ব্রিটিশ ভারতের হিন্দু-মুসলমানের একমাত্র অসা¤প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু ১৯০৩ সালে সরকারের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনার কথা ঘোষিত হলে কংগ্রেসের প্রভাবশালী হিন্দু নেতারা এর বিরোধিতা করেন। ফলে মুসলমান নেতারা প্রথম হোঁচট খান। স্পষ্ট ছিল বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পিছিয়ে পরা পূর্ববাংলার প্রভ‚ত উন্নতি হবে। এ সময়ে ইংরেজদের সমর্থক ঢাকার নবাবরা বঙ্গভঙ্গের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু ১৯০৫-এ সরকার কর্র্তৃক বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে কংগ্রেস, হিন্দু প্রেস এবং শিক্ষিত ধনিক হিন্দু প্রবল বিরোধিতায় মাঠে নামলে অনেক মুসলমান নেতার মধ্যে বিশ্বাস জন্মে কংগ্রেসের এখন আর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র নেই। তাই মুসলমানের অধিকার সংরক্ষণে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন চাই। আর এভাবেই ঢাকায় জন্ম নেয় মুসলিম লীগ।

পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র জন্মের পরপরই ভাষার প্রশ্নে দ্ব›দ্ব শুরু হওয়ার পরিপেক্ষিতে বাঙালির অধিকার সংরক্ষণের প্রশ্ন আওয়ামী মুসলিম লীগ জন্মের নিয়ামক ছিল। তরুণ শেখ মুজিব কিন্তু এর আগেই নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি। পরের বছর আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি নিজ যোগ্যতায় এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম সম্পাদকের পদ লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামের দলটি অসাম্প্রদায়িক ঘোষণা করে দলের নতুন নামকরণ করে আওয়ামী লীগ। ততক্ষণে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক পরিপক্কতা একটি বিশেষ মানে পৌঁছে গেছে। আর এর স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায় তিনি ১৯৫৩ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। 
মোহভঙ্গ বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রশ্নে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এরই মধ্যে শেরেবাংলা ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে কৃষক প্রজা পার্টি পরে যা কৃষক শ্রমিক পার্টি নামে পরিচিত হয়। ষাটের দশকের শুরুর দিকেই আইয়ুব খানের শোষক চরিত্র স্পষ্ট হয়ে পড়ে বাঙালির কাছে। ১৯৬১ সালের শেষ দিক থেকেই আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত হয় পূর্ব পাকিস্তানে। আন্দোলন বেগবান হওয়ার পথ তৈরি হয় ১৯৬২ সালে। এ সময় শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বিক্ষুব্ধ করে তোলে ছাত্র-শিক্ষক সমাজকে। ক্রমে শিক্ষা কমিশনবিরোধী আন্দোলন ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ লাভ করে। গণতন্ত্র প্রবর্তন ও মানবিক অধিকারের জন্য নতুন স্লেগান যুক্ত হয়। এই গণআন্দোলনের নেতৃত্বের সামনের সারিতে এসে দাঁড়ান শেখ মুজিবুর রহমান। ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে সারাদেশে পালিত হয় হরতাল। ছাত্রদের ওপর আইয়ুব খানের পুলিশের রাইফেল গর্জে ওঠে। গুলিতে নিহত হন কয়েকজন ছাত্র। প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ ছাত্র সমাজ পূর্ব পাকিস্তানে সাধারণ ধর্মঘট ও দমননীতিবিরোধী দিবস পালন করে। ২২ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ। ২৯ সেপ্টেম্বর পল্টনের সমাবেশে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী ও আবুল কাশেম। এভাবে ক্রমে নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় চলে আসেন শেখ মুজিব। শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের দাবি উত্থাপনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। ছাত্রলীগও পাশে এসে দাঁড়ায়।

এ বছরই আইয়ুব খান নতুন শাসনতন্ত্র ঘোষণা করেন। জনগণের চোখে ধুলো দেয়ার জন্য এক অদ্ভুত গণতন্ত্র ‘মৌলিক গণতন্ত্রে’র কথা বলেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার অধিকার না দিয়ে নিজের ক্ষমতাকে সুসংহত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাঙালি বিরূপ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে থাকে। 

এর মধ্যে ১৯৬৩-তে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মৃত্যুবরণ করেন। আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী আওয়ামী লীগের হাল এবার শক্ত হাতে ধরেন শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের এই যোগ্য সাধারণ সম্পাদক এলিট শ্রেণির সঙ্গে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হন। আইয়ুব খান ঘোষণা করেন মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে ১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে মৌলিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছিল। পল্টনের জনসভায় শেখ মুজিব ও মওলানা ভাসানী সমন্বরে আওয়াজ তোলেন ‘মৌলিক গণতন্ত্র নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার চাই।’ নেতৃত্বের আপসহীন মনোভাবের মুখে আইয়ুব খান ভিন্ন পথ ধরলেন। বাঁধিয়ে দিলেন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। 
শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হলো। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ‘কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি’ বা ‘কপ’ গঠিত হলো। এই ‘কপ’ গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন শেখ মুজিব। কপের পক্ষ থেকে ফাতেমা জিন্নাহকে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হলো। নির্বাচনের প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন শেখ মুজিব। নির্বাচনের সার্বিক তদারকির জন্য তাকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব দেয়া হয়। নির্বাচনে আইয়ুব খান জয়ী হয়েছিলেন। এর অন্যতম কারণ ছিল কতিপয় বাঙালি নেতৃত্বের শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী তৎপরতা থেকে অজ্ঞাত কারণে পিছিয়ে আসা। আইয়ুব খান জয়ী হয়েছিলেন বটে, কিন্তু এই নির্বাচনে যে আইয়ুববিরোধী মোর্চা গড়ে ওঠে তা ভবিষ্যতে আইয়ুবের পতনের প্রধান কারণ হয়। 

নির্বাচনে জয়লাভের পর আইয়ুব সরকার বাঙালির ওপর অত্যাচার বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এনএসএফ বা জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন নামে একটি গুণ্ডাবাহিনী গড়ে তোলা হয়। এর মধ্যে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়। এসব অরাজকতার মধ্যে মুজিব তার বিখ্যাত ৬ দফা উত্থাপন করেন। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক শোষণ-নিপীড়ন ও অত্যাচারে বাঙালির জীবন যখন অতিষ্ট, তখনই ৬ দফা উপস্থাপিত হয়। চরম নিপীড়নের সেই সময়টিতে ৬ দফার মতো কর্মসূচি জনগণের সামনে ব্যাপক প্রচারের জন্য নৈতিক সাহসের প্রয়োজন ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান সেই সাহস নিয়েই অগ্রসর হয়েছিলেন। 

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি হন শেখ মুজিব। ততক্ষণে মানুষের মধ্যে ৬ দফা ব্যাপক প্রচারিত হতে থাকে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগ তার জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যায়। আইয়ুব শাসনের বড় সময়েই শেখ মুজিব কারারুদ্ধ ছিলেন। প্রথমে ১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত এবং পরে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত। ১৯৬৯-এ প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব সরকার শেখ মুজিবকে নিঃশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। মুক্তির পরদিন অর্থাৎ ২৩ ফেব্রæয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আহ্বান করে। এই সভাতেই তাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। 
৬ দফার ভেতরেই জেগে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার। এর শেষ পরিণতি ছিল মুক্তিযুদ্ধ। সুতরাং দেখা যাচ্ছে শেখ মুজিব সুযোগের সুবিধায় আবির্ভূত কোনো নেতা নন। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ইতিহাসের সোপান বেয়ে বাঙালির ভালোবাসা থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়েছিলেন। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর