মানুষ হবার শিক্ষা জরুরি

মানুষ হবার শিক্ষা জরুরি

প্রকাশিত: ১১:৪৩ ২৩ জানুয়ারি ২০২০  

আফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিভি`তে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

আমার আজকের এ লেখা মা-বাবাকে নিয়ে। সেই মা যিনি আমাদের গর্ভে ধারণ করেছেন, জন্ম দিয়েছেন, দিনরাত এক করে মানুষ করেছেন। অসুখে রাত জেগেছেন, নিজে হাতে পেন্সিল ঘুরিয়ে লেখা শিখিয়েছেন, পরীক্ষার সময় রাতের পর রাত পাশে বসে থেকেছেন। নিজে না খেয়ে তার ভাগের খাবারটা আমাদের খাইয়েছেন। নিজে না খেয়েও তৃপ্তি পেয়েছেন সন্তান বাড়তি খেয়েছে বলে। 

আজকাল কর্মজীবী মায়েদের ঘরে বাইরে কাজ করতে হয়। আগের চেয়ে তাদের ওপর চাপ অনেক বেশি। তারপরও সন্তানদের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করে তবেই একজন মা কর্মক্ষেত্রে যান। সে কারণে কর্মজীবী মায়েদের সকাল পাঁচটায় উঠে রান্নাঘরে ঢুকতে হয়, অফিস ফেরত মা কাপড় না বদলেই রান্নাঘরে ঢোকেন।

অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে পৃথিবীর সব দেশের, সব যুগের সব মায়ের চিত্র একই। উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত নিন্মবিত্ত বিত্তহীন সব মায়ের একই আলেখ্য। হয়ত সামাজিক আর অর্থনৈতিক অবস্থানগত পার্থক্যের কারণে কোনো মায়ের কষ্ট বেশি, কোনো মায়ের কম। কিন্তু ত্যাগ সব মায়েরই সমান।

এতো গেলো মায়ের কথা। বাবা দিনরাত পরিশ্রম করে, হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সংসারের জন্য রোজগার করেছেন। ছেলে মেয়ের মুখে ভালো আর পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। ভালো স্কুল কলেজে পড়িয়েছেন। কোচিং-এর খরচ জুগিয়েছেন। ছেলে মেয়ের ভালো পোশাক আর সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেছেন। এসব করতে গিয়ে নিজে সময়মতো খেতে পারেননি। বছরে একটা নতুন কাপড়ও তার জোটেনি। সন্তানদের দিয়েই খুশি থেকেছেন। হ্যাঁ, বাবার এই চিত্রও সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে পৃথিবীব্যাপী এক। 

কিন্তু এই যে মা-বাবা তাদের প্রতি আমরা কোন কর্তব্য করছি, কতটুকু করছি!  সে খতিয়ান বড়ই হতাশাব্যঞ্জক। একই বাড়িতে থেকে ছেলে মা বাবাকে আলাদা করে দিচ্ছেন। পৃথক হাড়িতে রান্না হচ্ছে। যে ছেলের সামর্থ্য আছে তিনি ভিন্ন বাড়িতে চলে যাচ্ছেন বা ছলে বলে কৌশলে মা বাবার কাছ থেকে বাড়িটা লিখিয়ে নিচ্ছেন। মা বাবার জায়গা হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। দিনে দিনে দেশে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে বৈ কমছে না। অনেক সন্তান বৃদ্ধাশ্রমের খরচও ঠিকমতো বহন করছেন না। টাকার অভাবে বাবা মা বৃদ্ধাশ্রম থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন এমন খবরও আমরা পাই। একই শহরে, হয়ত দুই চার কিলোমিটারের মধ্যে থেকেও মাসের পর মাস সন্তান মা বাবাকে দেখতে যান না। তাদের খোঁজ-খবর নেন না। অসুখে মা-বাবা একা পড়ে থাকেন বৃদ্ধাশ্রমে। পথ চেয়ে থাকেন তাদের সন্তান দেখতে আসবে এই আশায়। তারপরও সন্তানকে কখনই অভিসম্পাত করেন না। সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। সারাক্ষণ প্রার্থনা করেন তার সন্তান যেন দুধে ভাতে থাকে, তার যেন মঙ্গল হয়। 

পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি কার্যকর করতে গিয়ে এখন প্রতি পরিবারে একটি দুটি সন্তান। কোনো পরিবারে মাত্র একটাই সন্তান। যৌথ পরিবার প্রথা ভেঙে ইউনিট পরিবার হতে হতে পরিবারে অন্য লোকজনও নেই। তাই সেই একটি দুটি সন্তান যদি বাবা মাকে না দেখে তাহলে বাবা মায়ের দুঃখ রাখার জায়গা থাকে না। বাবা মা সন্তানের কাছে টাকা পয়সা গাড়ি বাড়ি চায় না। চায় তাদের সাহচর্য। চায় তাদের কাছে থাকতে, কাছে রাখতে। বাবা মায়ের সেই সামান্য চাওয়াটুকুও পূরণ হয় না। 

আজ থেকে পঁচিশ-তিরিশ বছর আগেও বাবা মাকে এভাবে অবহেলা করার কথা সন্তানরা ভাবতে পারত না। যারা বাবা মাকে অবহেলা করত সমাজের চোখে তারা হতো নিন্দিত। কিন্তু তথাকথিত প্রযুক্তি উৎকর্ষ উন্নয়ন আমাদের মানবিক বোধগুলো ভোঁতা করে দিয়েছে বলে এখন বাবা মাকে অবহেলা করা, অভিভাবকদের অসম্মান করা সমাজের চোখে খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এ বিষয় নিয়ে কেউই আর মাথা ঘামায় না। 

আমার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে। বাবা মায়ের মুখে মুখে তর্ক করার কথা কখনই ভাবিনি। তাদের সামনে গলা উঁচিয়ে কথা বলার সাহস ছিল না। আব্বাকে তো রীতিমতো ভয় পেতাম। শুধু আমি একা নই, আমার বয়সের সব সন্তানের একই চিত্র ছিল তখন। অথচ এই বাবা অসুখ হলে ঠিকই শিয়রে বসে রাত জাগতেন। কোর্ট থেকে ফেরার পথে প্রতিদিনই হাতে করে কিছু না কিচছ নিয়ে আসতেন। কখনো চকলেট কখনো বিস্কুট আবার কখনও আম লিচু। এখনকার মতো এতরকম খাবার তখন ছিল না। কোর্ট থেকে ফিরে প্রতিদিনই খুচরো টাকাগুলো ভাই বোনদের মাঝে ভাগ করে দিতেন। আইনজীবী পেশার শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজে অঙ্ক আর ইংরেজি শেখাতেন। আমরাও স্কলারশিপ পেয়ে মায়ের জন্য শাড়ি, আব্বার জন্য সার্জের পাঞ্জাবি কিনতাম। আব্বা খুশি হয়ে ফাউন্টেন পেন কিনে দিতেন। মা প্রতিবেশিদের বাড়িতে মিষ্টি পাঠাতেন। প্রতিবেশিরা সে মিষ্টি খেয়ে বাড়িতে এসে আশির্বাদ করে যেত। 

দিন বদলেছে। এখনকার ছেলে মেয়েদের কাছে সন্তানরা বন্ধুর মতো। সে কথা বাবা মা, সন্তান সবাই গর্ব করে  সোচ্চারে বলেন। বন্ধু হওয়া ভালো কিন্তু একটা চেক এন্ড ব্যালান্স, একটা রাশটানার ব্যাপার তো থাকবেই। ছেলেবেলা থেকে আদর্শ আর  নৈতিকতার শিক্ষা না দিলে সন্তানরা স্বাভাবিকভাবেই লোভী আর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। সেই আত্মকেন্দ্রিকতা এমন জায়গায় পৌঁছে যে, বাবা মাকেও নিজের থেকে আলাদা করে দেয়। নিজের পরিবার বলতে ছেলেমেয়েরা এখন বোঝে, স্বামী স্ত্রী আর সন্তান। স্বাভাবিকভাবেই  সন্তানরা যা দেখে তাই শেখে। বড় হয়ে বাবা মাকে বিচ্ছিন্ন করে  দেয়। যেমন তার বাবা মা দাদা দাদিকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।

আমি একথা বলছি না যে, আমাদের সময়ের সব ছেলে মেয়ে বাবা মায়ের প্রতি যথাযথ দাষিত্ব পালন করেছে বা করছে। অনেকেই করেনি। অনেকে বাবা মাকে ফেলে রেখে দূরদেশে পাড়ি জমিয়েছে। দেশে শেষ বয়সে অসুখে বিসুখে কেটেছে বাবা মায়ের নিঃসঙ্গ জীবন। কারো অসুখে চিকিৎসা হয়েছে, কারো হয়নি। কিন্তু মনঃকষ্টের চিকিৎসা কারো হয়নি এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি।

দিন যত যাচ্ছে বিচ্ছিন্নতা তত বাড়ছে। বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব ততই বাড়ছে। এখনকার সন্তানদের উচ্চাকাঙক্ষার শেষ নেই। সে উচ্চাকাঙক্ষায় ইন্ধন দেয় বাবা মা। আন্ডার গ্রাজুয়েট লেবেলেই ছেলে মেয়েরা বিদেশ পাড়ি জমাচ্ছে। সেখানে কারো লেখাপড়া শেষ হচ্ছে, কারো হচ্ছে না। কিন্তু দেশে ফেরার চিন্তা খুব অল্পজনই করছে। বিদেশে অড জব করছে, মানবেতন জীবনযাপন করছে। কিন্তু দেশে ফিরছে না। দেশে বাবা মা কাটাচ্ছে একাকী জীবন। 

তাই আজ সন্তানের সাথে বাবা মায়ের যে বিচ্ছিন্নতা তার পুরো দায় সন্তানের নয়। তবে অনেকটা তো বটেই। যে সন্তান তার জন্মদাতা জন্মদাত্রীর প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করে না, তার শিক্ষার কোনোই মূল্য নেই। হতে পারে সে কোনো সেলিব্রেটি, হাইপ্রফাইল কোনো মানুষ। তার চেয়ে সারাদিন রিক্সা চালিয়ে সন্ধ্যেবেলা যে ছেলেটি ৩৫ টাকার পাউরুটি নিয়ে মার হাতে তুলে দেয় মা পাউরুটি খেতে ভালোবাসে বলে, সে অনেক বড় মানুষ, অনেক ভালো মানুষ। সারাদিন মোট বয়ে যে ছেলেটি রাতে হাঁপনি রোগি বাবার বুকে সরষের তেল মালিশ করে দেয় সে অনেক বড় মানুষ। সারাদিন মানুষের বাড়িতে কাজ করে যে মেয়েটি গৃহকর্মীর দেয়া খাবার বাড়ি নিয়ে বাবা মায়ের সাথে ভাগ করে খায় সে সত্যিকার মানুষ। 

তাই বড় চাকরি, প্রতিষ্ঠা পাবার জন্য শিক্ষা নয়, মানুষ হবার শিক্ষাটা জরুরি।   

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর