মানুষ বনাম উন্নতি

প্রকাশিত: ১৩:০৭ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

অজয় দাশগুপ্ত সিডনি প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও ছড়াকার। জনপ্রিয় কলাম লেখক অজয় দাশ গুপ্তের জন্ম চট্রগ্রামে। দীর্ঘকাল প্রবাসে বসবাসের পরও তিনি দেশের একজন নিয়মিত কলাম লেখক। সম-সাময়িক বিষয়ের পাশাপাশি তির্যক মন্তব্য আর প্রেরণা মুলক লেখায় তিনি স্বীয় আসন নিশ্চিত করেছেন।

সমাজ ও দেশের উন্নতি যদি পরিপূরক না হয় তবে কোনো উন্নয়ন-ই টেকসই হয় না। দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়নের শর্ত হচ্ছে সমাজ প্রগতি। 

আমাদের দেশের আর্থিক উন্নতি দৃশ্যমান হলেও সমাজ সেভাবে এগুচ্ছে না। সমাজে পরিবর্তন যদিও দৃশ্যমান কিন্তু সমস্যা প্রকট। খবর দেখলে আমাদের রক্তচাপ থেমে থাকতে চায় না। বাড়তেই থাকে। একটা বিষয় মনে রাখা দরকার উন্নতি ও সমাজ শৃঙ্খলা সমান ভাবে চলেনা। বরং উন্নত দেশের সমাজে সমস্যার ধরণ গম্ভীর। গরীব দেশে সমস্যাগুলো মৌলিক। অন্ন বস্ত্র চিকিৎসা বসতবাড়ী লেখাপড়া এসব সমস্যার চাপে চ্যাপ্টা মানুষের অন্য কিছু ভাবার সময় থাকেনা। দেশ যত উন্নত হয় বেশিদিন। ততো অন্য সমস্যাগুলো মুখ বাড়িয়ে থাকে। মানুষের স্বভাব তাই। তার একদিক পূর্ন হলে অন্যদকে অপূর্ণতা থাবা বিস্তার করে। আজকাল দেশের সামাজিক সমস্যাও তাই ভিন্ন ধরণের।

আত্মহত্যার কথায় আসি। এত অভিমানী সমাজ ছিলো না আগে। বনিবনা না হলে বা মত না মিললে স্বামী স্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে এমন জটিলতা আগে দেখা যেতো না। কারণ তখন সমাজ ছিলো যূথাবদ্ধ। মানুষে মানুষে মেলামেশা আর বন্ধন ছিলো মৌলিক। বায়বীয় সম্পর্ক শুরু হবার পর তার আকার আয়তন পরিধি বাড়ার সঙ্গে উটকো ঝামেলাও ঢুকেছে বানের পানির মতো। মূলত সামাজিক মিডিয়ার ভয় আর আতংকেই মানুষ ভুল সিদ্বান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। স্বামী স্ত্রীর কলহ বা ঝগড়া খুব নিয়মিত একটা বিষয়। দুজন মানুষ আসে দুটো ভিন্ন পরিবার থেকে। তাদের জন্ম থেকে বড় হয়ে ওঠা একেবারেই আলাদা। রুচি খাবার পোশাক সংস্কৃতি সবকিছু মিলিয়ে নিতে একজীবন আসলেই যথেষ্ট না। তারপর  ও আমাদের দেশেই পরিবার টেকে। একবিবাহে অভ্যস্ত  হতে পারাই আমাদের সংস্কৃতি। এজন্যে চাই সমঝোতা তারচেয়ে বেশি দরকার ছাড় দেয়া। আমাদের সময় আমরা এত তথ্য প্রবাহ বা মিডিয়াবন্দী ছিলাম না। কে কোথায় যাচ্ছে কোথায় থাকছে বা কখন আসছে জানাটাও ছিলো কঠিন। তারুণ্যে যখন কলকাতা যেতাম পথেই লেগে যেতো দু দিনল চটৃগ্রাম থেকে ঢাকা। ঢাকা থেকে যশোর। যশোর থেকে বেনাপোল। তারপর পৌঁছে গিয়ে পোষ্টকার্ড ছেড়ে দেয়া। সে চিঠি দেশে পৌঁছুতে লাগতো এক সপ্তাহ।

এতদিন মা বাবারা ধৈর্য ধরে থাকতেন। স্বামী স্ত্রী থাকতেন সবুর করে। মনে বিশ্বাস আর ভরসাই ছিলো অবলম্বন। আজকাল কে কোথায় আছে বা কি করছে সেটা যাবার আগেই জানা হয়ে যায়। পথের ছবি বাসের ছবি নামার ছবি ওঠার ছবি দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মানুষ তাই ভরসার জায়গাটা হারিয়ে ফেলেছে প্রায়।
এত তথ্য বা এত জানাজানি একদিকে যেমন ভালো আরেকদিকে এর কুফল ভোগ করছে সমাজ। বিশ্বাস যে কতভাবে টাল খাচ্ছে মনে মনে। বন্ধুত্বের নামে অবাধ সম্পর্ক কার মনে না সন্দেহের উদ্রেক করে? একবার আমি লিখেছিলাম ইনবক্স ব্যাপারটা না থাকলে জুকার বার্গকে পথে বসতে হতো। তখন অনেকে রাগ করেছিলেন। কিন্তু এটা কি মিথ্যা? এই ইনবক্সের কারণেই আজ স্বামী স্ত্রীর ভেতর এত বিবাদ । যখন তা কোনভাবে বেরিয়ে আসে তখন যেকোন একজনের ফেরার পথ বন্ধ। যার পরিণতি আত্মহনন। বলছি না যে এটাই একমাত্র কারণ। আসলে প্রযুক্তির ব্যবহার বড় বিষয়। আমি সিডনির মত শহরে কিন্তু এর এমন প্রকোপ দেখিনা। কারণ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টা হয়তো তারা আগেই জেনে যায়। আর একটা কারণ মুক্ত সমাজে যখন বিষয়গুলো প্রকাশ্য বা সহজলভ্য তখন এত গোপনীয়তার আর কি দরকার? যখন যা খুব গোপন তখন ই তা উস্কানীর কেন্দ্র। আজকের বাংলাদেশে নবদম্পতি কিংবা মধ্যবয়য়সীদের জীবনে তাই সামাজিক মিডিয়া সমস্যা না সম্ভাবনা তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।

আরো অনেক রোগ আমাদের ঘিরে ধরেছে। দেখবেন প্রায় ই শেয়ার করা হয় বীভৎস নির্যতনের ভিডিও। আমরাতো তেমন প্রতিশোধ প্রবণ জাতি ছিলাম না। বাচ্চা বুড়ো কাউকে ছাড় দেয়া হয়না আজকাল। কিশোর বালক বালিকাদের ধরে পেটানোর নির্মম পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে এক শ্রেণীর মানুষ। আগে ছিলোনা তা বলিনা। তবে আগের মত প্রতিবাদ বা থামানোর চেষ্টা থাকলে কেউ অত সময় ধরে ভিডিও করতো না। এই যে পুরোটা ভিডিও করে বাজারজাত করা এখানেও আছে বিকৃতি। যে সব মানুষরা তা করে তারা কি ঘটনা থামানোর জন্য কোন চেষ্টা করে? না করার পেছনে আছে কথিত লাইক ডিস লাইক আর প্রতিশোধ প্রবণতা। সামাজিক মিডিয়ার কারনে এখন ধর্মের মত সংবেদনশীল পবিত্র বিষয় ও বিতর্কের মুখে। আমরা দেখেছি নীরিহ স্কুল টিচারকে কানে ধরিয়ে ছবি তোলার আনন্দ। সামাজিক মিডিয়ার গুজবে ধর্ম ও হয়ে উঠতে পারে বিধ্বংসী। ক দিন আগে ইজতেমার মাঠে মারামারিতে খুন হয়ে যাওয়ার ছবি দেখে হতভম্ব হয়ে গেছিলাম। শান্তি ও কল্যানের জন্য আসা মিডিয়ার কারণে কত অমঙ্গল আর অশান্তি যে উড়ে আসে এসে প্রভাবিত করে  যায় জীবন তা টের ও পায় না।

বাংলাদেশে এখন সামাজিক সমস্যার মূলে আছে দুর্নীতি আর মাদক। এই মাদকের সঙ্গে সামাজিক মিডিয়ার যোগ আছে। রোহিঙ্গাদের বিপুল সংখ্যক কিশোর কিশোরী এখন এই ব্যবসার হাতিয়ার। শুনেছি সামাজিক মিডিয়ায় নাকি জানা যায় কোথায় পাওয়া যাবে সস্তা ইয়াবা। পাওয়া যাবেনা কেন? ইয়াবা ব্যবসায়ী বা সম্রাট নামে কুখ্যাত মানুষ যদি রাজনীতির পুরোধা হয়তো কে ঠেকাবে কাকে? হঠাৎ হঠাৎ দু একজন তারকা উড়ে  এসে শরণার্থী শিবির দেখে গেলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে দেশের কোন কোন জায়গায় যে পরিবার ভাঙবে বা ভাঙছে তাও অচিরেই বেরিয়ে আসবে। এতসব সামাজিক সমস্যার আঁচ মাথায় নিবে আত্মতুষ্ট রাজনীতি ভালো আছে। অন্তত নেতাদের বচনে তাই মনে হবে। সামাজিক ভাবে একটা ভঙ্গুর বাস্তবতার দিকে এগুচ্ছে দেশ। এটা অস্বীকার করা যাবেনা। জঙ্গিবাদ থেকে মাদক পর্যন্ত বিস্তৃত সমস্যার ব্যাপারে আর যাই থাক সামাজিক সচেতনতা বড় কম। অভিভাবকেরা মূলত অসহায়।  সন্তানের সাথে তাদের যোগাযোগ করার সময় কোথায়? আমার পরিচিতা এক ভারতীয় মহিলা বলছিলেন তার শিশু কন্যাটি তাকে বলেছে সে বড় হয়ে মোবাইল হতে চায়। এ কথা শুনে হতভম্ব মা বাবা জানতে চেয়েছিল কেন? তার স্পষ্ট উত্তর তোমরা তাকে যতটা ভালোবাসো সময় দাও আমাকে দাওনা। তাই। এরপর ও সে মোবাইল ছাড়তে পারেনি। কমিয়েছে ব্যবহার।

আমাদের সামনে সারাবিশ্বের মত এই চ্যালেঞ্জ আজ দুয়ারে। সামাজিক মিডিয়া ও জীবনের ভেতর সেতু গড়ে তোলা পাশাপাশি সন্তনাদের সচেতন করা জরুরি। নিয়ন্ত্রণ হারানোর আগেই স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক হতে হবে স্বচ্ছ। সেটাই আমাদের জীবনবোধ ও সংস্কৃত। পশ্চিমের সমাজ যত আগুয়ান হোক তাদের শান্তি কম। আমরা  উন্নয়নের সাথে সাথে সেদিকে ধাবিত হচ্ছি। রাজনীতি পারুক না পারুক মানুষকে পারতেই হবে। মানুষ ভালো না থাকলে নিরাপদ না থাকলে কোন উন্নতি ই টিকবে না। নো থিংকিং আর হাই লিভিং এর কবল থেকে ফিরতে হবে প্লেইন লিভিং আর হাই থিংকিং এর যুগে। সাধারণ জীবনযাপন আর উচ্চ চিন্তাতেই আছে সমাধান। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর