Alexa মানুষের মাংস যখন মানুষেরই খাদ্য!

পর্ব-১

মানুষের মাংস যখন মানুষেরই খাদ্য!

মেহেদী হাসান শান্ত  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:২৮ ৬ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১২:৩২ ৬ আগস্ট ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপ মহাদেশের কথা। হঠাৎ করে ইউরোপিয়ানরা আবিষ্কার করলো, তাদের কাছে এক আজব ওষুধ এসে ধরা দিয়েছে। মৃগীরোগ থেকে শুরু করে নারীদের রক্তস্রাব, কাঁটা ক্ষত, বমি বমি ভাব; সবকিছু থেকে পরিত্রান পেতেই ওই ওষুধটিকে আদর্শ মনে করা হতো। ইউরোপের মানুষ তখন মনে করত, ওই ওষুধে সারে না এমন কোনো রোগ নেই! 

বাদামি রঙের ওই দানাদার গুঁড়ো ওষুধ পানিতে মিশিয়ে ড্রিংকস বানিয়ে, মলম তৈরি করে, বড়া বানিয়ে কিংবা সরাসরিই খাওয়া হতো। ওই ওষুধটির নাম ছিল ‘মামিয়া’ (Mumia)। কারণ, মমিকৃত মৃত মানুষের মাংস গুঁড়ো করে সেই ওষুধ তৈরি করা হতো!  

ইংরেজি ‘ক্যানিবাল’ (Cannibal) শব্দটির অর্থ করলে দাঁড়ায় স্বগোত্রভোজী। অন্য অর্থে নরভূক। অর্থাৎ যেসব মানবগোষ্ঠী মানুষের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে তাদের ক্যানিবাল বলা হয়ে থাকে। ইতিহাসখ্যাত নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সময় থেকে ক্যানিবাল কথাটি প্রচলিত হয়েছে। অনেকে ধারণা করেন, কলম্বাসই হয়তো ‘ক্যানিবালিজম’ শব্দটির প্রচলন ঘটিয়েছিলেন। 

নাবিক কলম্বাস একবার স্প্যানিশ নৌবহরের সহযোগিতায় গুয়াদালুপে দ্বীপ আবিষ্কার ও অধিগ্রহণ করেন। এরপর তিনি নতুন আবিষ্কৃত এ উপনিবেশ সম্পর্কে প্রতিবেদন দিতে তখনকার সময়ে স্পেনের রানি ইসাবেলার কাছে ফিরে যান। কলম্বাস রানিকে বললেন, নতুন দেশের মানুষরা বড়ই বন্ধুত্বপরায়ণ ও শান্তিপ্রিয়। তবে একটা ঝামেলা আছে। রানির ঔৎসুক্যের কারণে ঝামেলার কথাটা তাকে বললেন কলম্বাস, গুয়াদালুপে দ্বীপে কারিবা নামে একটি দল রয়েছে যারা খুব হিংস্রভাবে লুটতরাজ করে এবং বন্দি মানুষদের মাংস রান্না করে ভক্ষণ করে।

মানুষের মাংস রান্না করে খাওয়া হচ্ছেরানি ইসাবেলা কারিবা জনগোষ্ঠীর কথা শুনে আঁতকে উঠলেন। তিনি অবিলম্বে ঘোষণা দিলেন, এখন থেকে যে বা যারা মানুষের মাংস ভক্ষণ করবে, তাদের বন্দি করে দাস বানানো হবে। রানির এই নির্দেশকে কলম্বাস অত্যাচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে লাগলেন। তিনি মূলত গুয়াদালুপে দ্বীপটি দখল করেছিলেন ওখান থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ সোনা পাওয়ার আশায়। 

যখন কলম্বাস দেখলেন দ্বীপটিতে তেমন সোনা নেই, তখন তিনি নিয়মিত স্থানীয়দের ঘর-বাড়ি লুট করতে থাকলেন। স্থানীয় অধিবাসীরা এই কাজে বাঁধা দিলে অন্যায়ভাবে কারিবা উপাধি দিয়ে রানির দেয়া শাস্তির নির্দেশ অনুযায়ী তাদেরকে দাস করা হতো। শুধু গুয়াদালুপের অধিবাসীদের ক্ষেত্রেই নয়, ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শাসনামলে স্থানীয় অধিবাসীদের এভাবেই দমন-পীড়ন ও হত্যা করা হয়েছে। 

যাই হোক, সেই কারিবা শব্দটিই পরবর্তীতে ‘কানিবা’ এবং তার থেকে ক্যানিবাল রূপ নিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করে। ক্যানিবাল শব্দটি গুয়াদালুপে দ্বীপের রক্তাক্ত ইতিহাসের সাথে জড়িত থাকলেও এরপর থকে মানুষের মাংস ভক্ষণকারী যেকোনো মানবগোষ্ঠীকে ‘ক্যানিবাল’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। সুতরাং, গুয়াদালুপে দ্বীপ থেকে ‘ক্যানাবলিজম’ শব্দের উৎপত্তি হলেও সেখানকার মানুষরা আসলেই মানুষের মাংস ভক্ষণ করত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তবে মানুষের মাংস তাদের স্বগোত্রীয় মানুষেরই খাওয়ার ব্যাপারে রয়েছে এক জটিল ইতিহাস। 

শুরুতে বর্ণিত ‘মামিয়া’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রূপে ক্যানিবালিজম মানব সভ্যতার ইতিহাসে ছিল। ক্যানিবালিজমের পেছনের কারণও ছিল স্থান-কাল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন। অনেক সভ্যতার মানুষ দুর্ভিক্ষের সময় মৃত মানুষের মাংস খেয়ে বেঁচে থাকত। কারণ তাদের হাতে অন্য কোনো সুযোগ ছিল না। হয় তাদের মানুষের মাংস খেয়েই বাঁচতে হবে, নয়তো না খেয়ে মরতে হবে! এমন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর নানা অঞ্চলের মানুষ অনেকবারই পড়েছে। 

মানুষের মাংস কাটা হচ্ছেতবে কোনো কোনো সভ্যতার মানুষের দুর্ভিক্ষের মতো কারণের দরকার হতো না। তাদের সংস্কৃতিতে সাধারণভাবেই ক্যানিবালিজমের চর্চা ছিল। তবে কলম্বাসের মতো কিছু মানুষের মিথ্যাচারের কারণে তার সঠিক সংখ্যা মেলা ভার। মানবসভ্যতায় মানুষের মাংস ভক্ষণের সংস্কৃতির কথা বলতে হলে শুরুতে উল্লিখিত ‘মামিয়া’ জনপ্রিয়তার কথা বলতেই হয়। ওই সময় ইউরোপজুড়ে মামিয়ার চাহিদা বেশ বেড়ে গিয়েছিল। 

শুরুতে মিশর থেকে চুরি করে আনা মমি দিয়ে এ চাহিদা মেটানো হতো। পরবর্তীতে, মামিয়া ক্রেজ ছড়িয়ে পড়লে সেগুলো অপ্রতুল মনে হতে থাকে। ফারাওদের সময়ে মিশরে মৃতদেহ মমি করে রাখার প্রচলন ছিল। তাই সেখান থেকেই হাজার বছরের পুরানো মমি চুরি করেই ইউরোপে পাচার করা হতো। মিশরের মমি দিয়ে চাপ সামলাতে না পারায় সুযোগ সন্ধানীরা ইউরোপের বিভিন্ন কবরখানা থেকে মৃতদেহ চুরি করা শুরু করে মামিয়া তৈরির আশায়। চিকিৎসায় মামিয়ার ব্যবহার বছরের পর বছর ধরে চলতে লাগলো। বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় মেডিকেল এনসাইক্লোপিডিয়া মার্ক ইন্ডেক্সেও মামিয়াকে সংযুক্ত করা হয়। 

চিকিৎসার জন্য শুধু মৃতদেহের মমিই নয়, বরং মানবদেহের আরও নানা অংশ ব্যবহার হতে থাকে। তরল বা গুঁড়ো আকারে মানুষের রক্ত মৃগীরোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। এছাড়াও মানুষের মস্তিষ্ক থেকে পাতিত তেল, যকৃত, পিত্তের পাথর ও মানবদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হৃদপিণ্ড- এসবও চিকিৎসার কাজে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হতো। 

চীনে প্রায় দুই হাজার বছর পূর্বে সামাজিকভাবে স্বীকৃত ক্যানিবালিজমের লিখিত রেকর্ড পাওয়া যায়। চীনে ফিলিয়াল ক্যানিবালিজম নামের এক ধরণের ক্যানিবালিজম প্রচলিত ছিল। সেখানে একটু বয়স্ক ছেলে-মেয়েরা তাদের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে নিজেদের শরীরের এক টুকরো মাংস নিবেদন করত। তবে শরীরের কোনো সংবেদনশীল অঙ্গ থেকে সেই মাংস তোলা হতো না। বেশিরভাগ সময়েই উড়ু কিংবা আঙুলের মাংস নিবেদন করা হতো। 

চলবে... 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস