মানব পাচার থামাতে হবে

মানব পাচার থামাতে হবে

প্রকাশিত: ১৫:৩৮ ১৮ মে ২০১৯  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী মানব পাচারের ঘটনাটি বহুল আলোচিত। বিশ্বের গরিব দেশগুলো মূলত এ সমস্যার নিত্যকার শিকার। বাংলাদেশের মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের প্রতি ১৭ জনের একজন এখন বিদেশে কর্মরত। বিদেশে প্রায় ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে।

এ ব্যাপারে জনশক্তি রফতানির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান যেমন অনস্বীকার্য তেমন আদম ব্যাপারী নামের প্রতারকদের প্রতারণাও অনেক বিয়োগান্ত ঘটনার জন্ম দিয়ে চলেছে। সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ৩৯ বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনায় মানব পাচারের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি তুলনামূলকভাবে হ্রাস পেলেও মানব পাচারের মতো ভয়াবহ ঘটনা কিছুতে থামছে না। আর এই না থামার প্রবণতা দেশের শিরঃপীড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। 

নব্বই দশকে ব্যাপক আকারে নারী ও শিশু পাচার অপরাধ শুরু হয়। ২০০০ সালে পাসকৃত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৫ ও ৬ ধারায় নারী ও শিশু পাচারের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অন্তর্ভুক্ত করে কঠোর আইন করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন মূলত দীর্ঘদিন থেকে দেশের কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, যশোর, লালমনিরহাট, ময়মনসিংহ, সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকাসমূহ দিয়ে প্রচুর নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা সংঘটিত হতো। প্রায়ই গ্রেফতারকৃত পাচারকারী ও পাচারকৃতদের ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো। কিন্তু পরে কাজের নামে ও যৌন শোষণের জন্য নারী ও শিশু পাচারের পাশাপাশি অনেক পুরুষও সীমান্তপথে বিদেশে পাচার হতে শুরু করে। এরপর একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে মানব পাচার ঘটনা বাড়তে থাকে। পরে সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর অবস্থান নেয়ার কারণে সমুদ্রপথে নারী-শিশু ও পুরুষসহ মানব পাচারের ঘটনা বহুলহারে বৃদ্ধি পায়। এ ধরনের পাচার আন্তর্জাতিক আইন, আমাদের সংবিধান ও দেশীয় আইনে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। নারী ও শিশু পাচারের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেও দেশের বিভিন্ন প্রচলিত আইনে সুনির্দিষ্ট ধারা ও শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে যে কোনো ব্যক্তির (পুরুষ, মহিলা ও শিশু সকলেই অন্তর্ভুক্ত) পাচার সংজ্ঞায়িত করে সুনির্দিষ্ট কোন আইন ও কঠোর শাস্তির বিধান ২০১২ সালের আগে ছিল না। ২০১২ সালে প্রণীত এই আইনে পাচারকারীদের শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি পাচারের শিকার ব্যক্তিবর্গের সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়ন ও নিরাপদ অভিবাসনের বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।

এক সময় মানব পাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে এ দেশের শত শত শিশু মধ্যপ্রাচ্যে উটের দৌড় প্রতিযোগিতায় জকি হতে বাধ্য হয়েছে। এদের কেউ কেউ দৌড় প্রতিযোগিতার সময় আতঙ্কে প্রাণও হারিয়েছে। বিষয়টি বিশ্বব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। আবার ইউরোপে কর্মসংস্থানের আশায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার সময় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন জাহাজ বা নৌকাডুবিতে। এ পর্যন্ত ইউরোপে মানব পাচারের সময় নৌকা বা জাহাজডুবিতে যারা মারা গেছেন তাদের সিংহভাগই বাংলাদেশি। খবরটি আঁতকে ওঠার মতোই। চলতি সপ্তাহেও তিউনিসীয় উপকূলে ইতালিতে পাচারের সময় নৌকাডুবিতে ৩৯ বাংলাদেশি মারা গেছেন। ইউরোপ যাওয়ার জন্য যারা মানব পাচারকারী চক্রের কাছে জনপ্রতি গড়ে ৮ লাখ টাকা জমা দিয়েছিলেন। তাহলে কি ভাবতে হবে টাকা দিয়ে তারা নিজেদের অজান্তে মৃত্যুর টিকিট কিনেছেন? অতীতেও ইউরোপ যাওয়ার নামে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছেন অনেক যুবক। মালয়েশিয়ায় চাকরির আশায় অবৈধ পথে সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ট্রলারডুবিতে কত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে তার হিসাব নেই। পাচারকারীদের পাল্লায় পড়ে থাইল্যান্ডের গহীন জঙ্গলে পণবন্দী হয়ে জীবনদান কিংবা ক্রীতদাসের জীবন বরণ করার ঘটনাও কম নয়। এছাড়া বিদেশে চাকরি দেয়ার নাম করে লাখ লাখ টাকা নিয়ে উধাও, চাকরি না দিয়ে প্রতারণা শুধু নয়, জীবন কেড়ে নেয়ার ঘটনাও অনেক ঘটেছে। আর এসব ঘটনা তো জনসম্মুখে বার বারই আসছে। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে- এত অঘটনের পরও কেন মানব পাচারের মতো জঘন্য অপতৎপরতা বন্ধ হবে না? কেন ভ‚মধ্যসাগরে এ দেশের শত শত তরুণের স্বপ্নের করুণ মৃত্যু ঘটবে? 

গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, মানব পাচারে যুক্ত নোয়াখালী ও শরীয়তপুরের চক্র সম্প্রতি শনাক্ত হয়েছে। নোয়াখালীর তিন ভাইয়ের সঙ্গে একটি শক্তিশালী চক্র রয়েছে লিবিয়া আর তুরস্কে। লিবিয়া থেকে নৌকায় ইউরোপে সাগর পাড়ি দেয়ার ঘটনাও বেড়েছে ব্যাপক হারে। বিশেষজ্ঞরা বার বার বলে আসছেন, এদেশীয় পাচারকারীদের সঙ্গে বিদেশের চক্রের যোগাযোগ আছে; সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করে। অন্যদিকে চলতি বছর বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি বাংলাদেশি শরণার্থী হিসেবে নৌকায় করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। আশ্রয় পাওয়ার জন্য এমন সব কারণ দেখানো হচ্ছে যা বাস্তবতাবিবর্জিত এবং দেশের জন্য অসম্মানজনক। মানব পাচারের ঘটনাগুলোর নেপথ্য কারণ বহুবারই আলোচনায় এসেছে। আর এসব সমস্যা নিরসনে উদ্যোগ গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করেছে সরকার। আর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মানব পাচারের মতো নিষ্ঠুর অপরাধ দমন করা কোনো দেশের সরকারের জন্য এককভাবে খুবই কঠিন কাজ, আর বাংলাদেশের মতো দেশে তা আরও দুরূহ। আমাদের দেশে এ রকম একটি ভয়ঙ্কর অপরাধ দমনে সরকারকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসতে হবে সকল রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার সংগঠন, সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম ও সর্বোপরি দেশের সাধারণ জনগণকে।

সরকারিভাবে মানবপাচারপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটিকে প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে। এসব কমিটি এবং মানব পাচার রোধে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারিকে বেশ কিছুদিন মানব পাচারের ঘটনা খুব একটা আলোচনায় আসেনি। তখন মনে করা হয়েছিল মানব পাচার নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া না গেলে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে। সঙ্গত কারণেই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নেয়া জরুরি। 

স্বীকার করতে হবে যে, বিপুল জনসংখ্যার এই দেশ থেকে কাজের সন্ধানে কিংবা জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে মানুষকে দেশ থেকে দেশান্তরে, দূর থেকে দূরান্তে যেতে হয়। কিন্তু এই যাত্রাপথ খুব যে মসৃণ, তা বলা যাচ্ছে না। প্রতারক চক্র নানান কায়দায়, নানারূপে, বিভিন্ন প্রকরণ ও ছদ্মাবরণে মানব পাচার করেই চলেছে। এমনটা ঘটছে মূলত কর্মসংস্থানের অভাব বা বেকার সমস্যা থেকে। জীবিকার জন্য মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের বাইরে যেতে চাইছে। এই যে মানুষ পাচার হয়ে যাচ্ছে অজানার পথে, অচেনা জগতে; আর ভাগ্য তাদের পরিণত হচ্ছে দুর্ভাগ্যে- বিষয়টি অত্যন্ত বেদনার বললেও কম বলা হয়। ফলে মানব পাচার প্রতিরোধে যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এর ধারাগুলোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যেহেতু সরকারের জন্য মানব পাচার রোধ এককভাবে কঠিন, সেহেতু বাংলাদেশে কর্মরত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসমূহের সঙ্গে সরকার ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নিতে পারে। মানব পাচার প্রতিরোধে আঞ্চলিক সরকারগুলোর মধ্যেও সমন্বিত নেতৃত্বের প্রয়োজন। এছাড়া আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও সচেতনতা সৃষ্টির জন্য তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বেআইনী অভিবাসনের চেষ্টা প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নিতে হবে। এভাবেই সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে মানব পাচারের অভিশাপ থেকে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি মুক্ত হতে পারে।   

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর