Alexa মাত্র দুই টাকায় সারাবছর পড়ান এই শিক্ষক!

মাত্র দুই টাকায় সারাবছর পড়ান এই শিক্ষক!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৯:৪৩ ২৫ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১০:৪১ ২৮ আগস্ট ২০১৯

ছবি- সংগৃহীত

ছবি- সংগৃহীত

পঁচাত্তর বছর বয়সেও অবসরে যাননি এক গৃহশিক্ষক। তবে তার ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট থেকে খুব বেশি বেতন নেন না তিনি। মাত্র দু’টাকাতেই পড়ান সারাবছর। আবার পড়ানো বাবদ যে আয় হয় তার সবটাই খরচ করেন ছাত্র-ছাত্রীদের পেছনে। 

এই শিক্ষকের বাড়ি ভারতের পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের উত্তর রামনগরে। সুজিত চট্টোপাধ্যায় নামের এই শিক্ষকের ‘সদাই ফকিরের পাঠশালায়’ তিনশত’র বেশি ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। বেশির ভাগই জনজাতি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। এখানে ছাত্রী  প্রায় ৮০ শতাংশ।

মাধ্যমিক স্তরে বাংলা, ইংরেজি, ভূগোল, ইতিহাস এবং উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক স্তরে বাংলা পড়ান তিনি। সঙ্গে গত পাঁচ বছর ধরে সাহায্য করেন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের। বছরে এক বার থ্যালাসেমিয়া নির্ণায়ক শিবিরও করেন। 

এই শিক্ষককে খুব শ্রদ্ধা করেন আশপাশের বহু গ্রামের লোকেরা। এদের মধ্যে ওই শিক্ষকের ছাত্র-ছাত্রীরা যেমন রয়েছেন, রয়েছেন বহু অভিভাবকও। ২০-২৫ কিলোমিটার দূর থেকে সাইকেল চালিয়ে তার কাছে এখনো পড়তে আসে অনেকে। 

পাঠশালায় পড়াশোনা শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টায়। তিন ধাপে পড়ানো শেষ হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায়। হয়  ‘রোল কল’। দু’দিন কোনো শিক্ষার্থী না এলেই কেন সে আসছে না খোঁজ নিতে বের হন এই শিক্ষক। দাদা- মেয়ে-নাতি, তিন প্রজন্ম তার কাছে পড়েছে এমন নজিরও রয়েছে।

তিনি বলেন, সবাইকে শিক্ষার আলোয় নিয়ে আসা শিক্ষকের দায়িত্ব। তা পুঁথিগত হোক, বা সামাজিক। দায়িত্ব পালন না করলে নিজেকে শিক্ষক বলব কী ভাবে!

১৯৬৫ সালে গ্রামের উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা জীবন শুরু বাংলায় স্নাতকোত্তর এই শিক্ষকের। স্কুল ছুটির পরে পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের বিশেষ ক্লাস নিতেন। স্কুল জীবনের শেষ দিকে স্থানীয় জনজাতি পরিবারগুলির শিশু ও কিশোরদের স্কুলমুখী করার জন্য উৎসাহিত করতে শুরু করেন। 

২০০৪ সালে স্কুল থেকে অবসর নিয়ে বাড়িতেই শুরু করেন পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পড়ানো। পেনশনের টাকার একাংশ খরচ করে তাদের বই-খাতা কিনে দেন। 

প্রথম দিকে বিনা পারিশ্রমিকেই পড়াতেন। পরে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের সাহায্যের জন্য বছরে এক টাকা বেতন নেয়া শুরু করেন। 

বৃদ্ধ শিক্ষক বলেন, বাজার আগুন। এখন তাই বেতন বেড়ে হয়েছে দু’টাকা।

 বছর খানেক আগে এক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ছাত্রের ক্যানসারও ধরা পড়েছে। প্রতি মাসে তার কলকাতা যাতায়াতের জন্যও সাহায্য করেন ওই শিক্ষক।

ছেলে সরকারি কর্মী, মেয়ে শিক্ষিকা। বাড়িতে আছেন স্ত্রী ও অন্য ভাইদের যৌথ পরিবার। স্ত্রী মীরা চট্টোপাধ্যায় বলেন, ছাত্র-ছাত্রী করেই জীবন কেটে গেল তার। কী করে সংসার চলে, খেয়াল করেননি। 

তাকে অনেক বার বলেছি, একটু বেশি টাকাও তো নিতে পার। জবাব পেয়েছি, তা হলে আর শিক্ষক হলাম কিসের? আর কথা বাড়াইনি।

এ বছর ‘পাঠশালা’র শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাধ্যমিকে ৫১ জন ও উচ্চ মাধ্যমিকে ১১৬ জন পরীক্ষা দিয়েছিল। অনেকেই ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। 

উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ আউশগ্রামের দোলচাঁদা খাতুন, মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হেঁদেগোড়ার মাম্পি বিশ্বাসদের কথায়, পড়ার পাশাপাশি, মাস্টারমশাইয়ের কাছ থেকে সমাজের পাশে দাঁড়াতেও শিখছি। ভুঁইরা গ্রামের যমজ বোন কৃষ্ণপ্রিয়া ও বিষ্ণুপ্রিয়া মেটে গুসকরা কলেজে পড়ছেন। 

তারা বলেন, জীবনে মাস্টারমশাইয়ের স্নেহস্পর্শ না পেলে পড়াশোনা তো দূর, জঙ্গলে কাঠ কুড়িয়ে হয়তো জীবন কাটত।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমএস