মাছ রফতানি অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাত

মাছ রফতানি অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাত

প্রকাশিত: ১৪:৪২ ২৫ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৫:০২ ২৫ জুলাই ২০১৯

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

এমন একটা সময় ছিল যখন আমাদের দেশে মাছ উৎপাদন হতো শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণ করার লক্ষে। সময়ের স্রোতে এখন বদলে গেছে সেই চিত্র। 

এখন বাংলাদেশ থেকে যেসব পণ্য বিদেশে রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয় তার মধ্যে হিমায়িত ও জীবিত মাছ উল্লেখযোগ্য একটি পণ্য। দিনদিন সারা বিশ্বে বাংলাদেশের মাছের চাহিদা বাড়ছে। চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম কারণ হলো মিষ্টি এবং লোনা জলের মাছ, অন্য মাছের চেয়ে স্বাদে আলাদা। এ কারণে বাংলাদেশের মাছ রফতানিতে আলাদা জায়গা দখল করেছে। বিশেষ করে আমাদের ইলিশ এখন দেশ এবং জাতির অহংকারের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা এই ইলিশ আমাদের দেশের জন্য বিশ্ব স্বীকৃত ব্র্যান্ড মালিকানা পণ্য হিসেবে খ্যাত। 
শুধু তাই নয় যে কোনো মাছের উৎপাদনে আমরা আমাদের ঘাটতি মোকাবিলা করে আরও রফতানি করতে সক্ষম হয়েছি। আজ মাছ নিয়ে আলোচনা করার প্রধান কারণ, গতকাল ২৩ জুলাই শেষ হয়েছে জাতীয় মৎস সপ্তাহ-২০১৯। যা গত ১৭ জুলাই থেকে শুরু হয়েছিল। শেষ হয় ২৩ জুলাই। প্রতিবারের মতো এবারও একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল মৎস সপ্তাহকে ঘিরে। এবার মৎস সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘মাছ চাষে গড়বো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।’ 

মাছ চাষ ও মাছ রফতানি নিয়ে আলোচনার পূর্বে আমাদের খাদ্য তালিকায় মাছের প্রয়োজনীয়তার দিকে একটু দৃষ্টি দেয়া যাক। প্রতিদিন একজন মানুষের প্রায় ৬২ গ্রাম আমিষের প্রয়োজন। আর এই আমিষের প্রধান চাহিদার উৎস হচ্ছে মাছ। আশার খবর হলো দিনদিন আমরা আমাদের এই আমিষের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হচ্ছি মাছের মাধ্যমে। কারণ দিনকে দিন আমরা মাছ চাষ বা উৎপাদনে আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে যাচ্ছি। গত কয়েক বছর ধরে মাছ উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। এখন আমরা দেশে মোট কৃষিজ আয়ের শতকরা ২৪ ভাগের বেশি পাই মৎস্য খাত থেকে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন কিংবা জিডিপির অবদানেও রয়েছে মৎস্য খাতের অবদান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে সারা বিশ্বে মিঠা পানির মাছ উপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। বাংলাদেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এতে করে সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন চীনকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থানে পৌঁছে যাবো আমরা। 

এবার একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। আমাদের দেশের মোট জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় পৌনে ২ কোটি মানুষ মৎস্য সংশ্লিষ্ট কাজে নিয়মিত নিয়োজিত। মৎস্য খাত থেকে আয়-উপার্জন করে তারা জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক লাভজনক হওয়ায় দিনদিন বেকার যুবক থেকে শুরু করে অনেকে মৎস্য চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। আর এটা সম্ভব হয়েছে সরকারের সুচিন্তিত পরিকল্পনা, মৎস্য বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের নিরলস পরিশ্রমের কারণে। পাশাপাশি মৎস্য চাষের ক্ষেত্রে গবেষণা ও সময় অনুযায়ী জলজ সম্পদ ও মাছের বংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করার ক্ষেত্রেও সাফল্য আশাজাগানিয়া। বিশেষ করে সম্প্রতি দেশের পুকুর ও খালগুলোতে মাছ চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। গত তিন দশকে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২৫ গুণ। 

এটা গেলো উৎপাদনের ক্ষেত্রে। মাছ রফতানি করে এখন বাংলাদেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। শুধু তাই নয়, দেশে উৎপাদিত মাছের বড় অংশ এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে। বিশেষ করে হিমায়িত মাছ রপ্তানি করে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ দিনদিন এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ বিষয়ে সাফল্য এসেছে ব্যাপক। বিগত কয়েক বছর মাছ রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে আগের বছরগুলো থেকে। ফলে মাছ রপ্তানির এ খবর আমাদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। তবে হিমায়িত ও জীবিত মাছ রপ্তানিতে কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হিমায়িত মাছ রপ্তানি কাঙ্খিত লক্ষ্যে থাকলেও জীবিত মাছের ক্ষেত্রে সাফল্য আশাব্যাঞ্জক নয়। ফলে জীবিত এবং হিমায়িত মাছ রফতানির ক্ষেত্রে এই তারতম্যের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে ইলিশ, চিংড়িসহ হিমায়িত মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া, কুঁচিয়া ইত্যাদি জীবিত মাছ রপ্তানি হয়ে আসছে। ফলে জীবিত মাছ রপ্তানি কেন পিছিয়ে পড়ছে তা খতিয়ে দেখে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। মাছ রফতানির এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কোনো বিকল্প নেই, যদি আমরা মাছ রফতানি করে আরও বেশি আয় করতে চাই। 

যেহেতু মৎস্য খাতে রফতানি আয় বাড়ছে সেহেতু সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিশ্চিত করা। যাতে, মাছ রপ্তানি আয়ে ভাটা না পড়ে। কারণ রফতানি বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থ দেশের সমৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই এটি গভীরভাবে বিবেচনায় নিয়ে মাছ রপ্তানির সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংশ্লিষ্টদের আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি এক্ষেত্রে আরও কিছু উদ্যোগও প্রয়োজন। বিশেষ করে সম্ভাবনাময় রফতানিযোগ্য এই পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যা নিরসন করতে হবে। 

এবার মৎস সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল- ‘মাছ চাষে গড়বো দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ।’ এই প্রতিপাদ্যটি যেন সঠিকভাবে আমাদের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে। উৎপাদনের পাশাপাশি মাছ রপ্তানির বিষয়টি বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে। তবেই মাছ রফতানিসহ সার্বিকভাবে দেশের রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মধ্যদিয়ে দেশ আরও সমৃদ্ধি হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর