Alexa মাওলানা আলী মিয়া নদভী ও তার সমাজ সংস্কার আন্দোলন

মুসলিম মনীষী

মাওলানা আলী মিয়া নদভী ও তার সমাজ সংস্কার আন্দোলন

মাওলানা কামরুজ্জামান নদভী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৩১ ১৮ জানুয়ারি ২০২০  

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ইসলাম প্রচার-প্রসারে সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম সমাজসেবা ও জনকল্যামূলক কাজ। সৃষ্টিসেবার প্রতিটি দিক যাতে নিহিত আছে এবং এতে নানাবিধ উপকারও রয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের পথ উম্মুক্ত হয়। দূর হতে থাকে ভুল ধারণা। কমে যায় পারস্পারিক দূরত্ব। সৃষ্টি হয় সহমর্মিতা ও ভালবাসা। পরিবেশ অনুকূলে আসে। সত্য ও সঠিক পয়গাম বুঝার ক্ষেত্র তৈরি হয়। 

হুজুর (সা.) এর মানবতাবোধ ও রহমতের গুণের কারণেই বিশ্বের পূর্ব হতে পশ্চিম, উত্তর হতে দক্ষিণ মেরু পযর্ন্ত সমগ্র পৃথিবীতে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়েছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা পূর্ব-পুরুষদের রীতি-নীতি ছেড়ে দিয়ে নতুন ভিন্ন রীতি-নীতিকে মানুষ এত সহজে গ্রহণ করে নিয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কোনো দৃষ্টান্ত কেউ দেখাতে পারবে না। আর এটি কোনো জোরজবরদস্তি বা লোভ-লালসার মাধ্যমে হয়নি। বরং নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এটি আল্লাহ কর্তৃক সাহায্যের পাশাপাশি সুন্দর আখলাক ও উত্তম মানবতাবোধের ফসল। 

সীমাহীন ধৈর্য্য, পাহাড়সম হিম্মত, মানবতার প্রতি মমতাবোধ ছিল এ সফলতার মূল হাতিয়ার। ফলে ইনসাফগার ঐতিহাসিকগণ একথা অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, ইসলাম তরবারির জোরে বিস্তার লাভ করেনি বরং ইসলামের বিস্তার ঘটেছে উন্নত চরিত্র, ভালবাসা, সহমর্মিতা, আর মানবতবোধের বিস্তারের মাধ্যমে।
পেশা ও দাওয়াতের বর্ণাঢ্য জীবনে মাওলানা আলী মিয়া নদভী (রহ.) এ বিষয়টি বিশেষভাবে উপলব্ধি করেন। 

তিনি যখন দেখলেন, সমাজের মুসলমানরা কেবল নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, সদকা,কোরবানি, আর বিবাহ-শাদিতেই রাসূলের (সা.) সুন্নত অনুসন্ধান করে, অথচ লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়াদীন, হুদায়বিয়া সন্ধি, হিলফুল ফুজুল, মদিনার ঐতিহাসিক চুক্তি, বনু নাজরানসহ বহু ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে সন্ধিতে আবদ্ধ হওয়া, এগুলোও যে নবী (সা.) এর বাতানো পথ ও সুন্নত, এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করে না।

এ উপলব্ধি থেকেই হিন্দুস্থানের অবস্থাকে পর্যবেক্ষণ করে আলী মিয়া নদভী (রহ.) সমাজসেবা ও জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। মানবতাবোধের এ আন্দোলনে তিনি অমুসলিম বুদ্ধিজীবি ও দার্শনিকদেরও সঙ্গে রাখেন। আলী মিয়া নদভি (রহ.) এর সমাজ সংস্কার ও মানবতার প্রতি দায়িত্ববোধ, মানুষের ঈমান ও হেদায়েতের ফিকির, প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জিম্মাদারি বর্ণনা করে প্রফেসর ইউনুস চিশতী বলেন, একবার ফিলিস্তিন থেকে ছাত্র-শিক্ষকের একটি প্রতিনিধি দল মাওলানার সাক্ষাতে আসলো। তারা নিজ দেশের সার্বিক অবস্থা মাওলানার সামনে তুলে ধরল। তাদের ওপর অকথ্য জুলুম, নির্যাতনের বিবরণ শুনে আমরা অশ্রুসিক্ত হলাম। 

কিন্তু মাওলানা নিরব বসে রইলেন। সবাই ভাবছে হয়ত তিনি এখন জিহাদের ফজিলত নিয়ে আলোচনা শুরু করবেন। কিন্তু  মাওলানার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন পরিলক্ষিত হলো। তিনি একজন ব্যক্তিকে একটি জাতি বিবেচনা করতে লাগলেন। এই ছোট মজলিসকে একটি আন্তর্জাতিক মজলিসে পরিণত করলেন। আমাদেরকে হুজুর (সা.) এর যুগে নিয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, হুজুর (সা.) এর হাতে কি ইহুদিরা ঈমান আনেনি? হুজুর (সা.) কি তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাননি? তাদেরকে কি তিনি মানবতার শিক্ষা দেননি? আমরা কি ইসরাঈলিদের প্রতি এই গুরু দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে পেরেছি? এরপর তিনি সে সকল সাহাবার আলোচনা শুরু করলেন, যারা ইহুদি ধর্ম ত্যাগ করে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন। 

এসময় মাওলানা বলেন, নিজেদের দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে আদায় করা ব্যতিত আল্লাহর সাহায্যের আশা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। তিনি মুসলিম ইতিহাসের বিপর্যয়পূর্ণ কিছু সময় ও তার থেকে উত্তরণের কি পথ ও পন্থা ছিল তা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মানুষকে জাগাতে হলে সমাজসেবা, জনকল্যাণমূলক কাজ ও মানবতাবোধের শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার কোনো বিকল্প নেই। 

সমাজ ও মানবতার সেবায় মাওলানার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তিনি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার ফিকির করতেন। তবে মানবতাবোধের আড়ালে নিজ আদর্শ, ধর্ম, আর মিল্লাতের স্বার্থ বিসর্জন দিতে কোনো সময়ই প্রস্তুত ছিলেন না। বরং অত্যন্ত সতর্কতা ও সাহসিকতার সঙ্গে এ পথে অগ্রসর হন। মাওলানা (রহ.) নিজ দেশের সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। অন্যদিকে তাবলিগ জামাতের দাওয়াতি কাজেও সক্রিয় ছিলেন। পাশাপাশি এমন একটি জামাতের সূচনা করেন যাতে মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমরাও শরিক ছিল। সবাই মিলে একটি সুন্দর সমাজ গড়ার চিন্তা করেন। যেহেতু এ কাজটি ছিল অত্যন্ত নাযুক ও স্পর্শকাতর, এজন্য তিনি খুব সতর্কতার সঙ্গে সামনে অগ্রসর হন। 

মাওলানা (রহ.) বলতেন, এটি অল্প কয়েকদিনের ব্যাপার নয়, বরং এ আন্দোলন বিরামহীন চেষ্টা-সাধানার নাম। যে কোনো কাজই চূড়ান্ত চেষ্টা-সাধানা ছাড়া সফলতার মুখ দেখে না। তাই সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ, মানবতার মুক্তি, মানুষে মানুষে ভালবাসা, সহমর্মিতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি করতে হলে প্রতিটি সমাজকর্মির হাড়ভাঙ্গা মেহনত আর সাধনার বড় প্রয়োজন।

মাওলানা আলী মিয়া নদভী (রহ.) একজন সফল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর কর্মক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী ব্যাপৃত ছিল। ইসলাম ও মুসলমানদের ক্রান্তিকালে তিনি বিভিন্ন সময় জাতিকে পথনির্দেশ করেছেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও নিজ দেশ ও দেশের নাগরিকদের ভুলে যাননি। মাওলানা (রহ.) বিশাল কর্ম ব্যস্ততার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের সঙ্গে অমুসলিমদের দূরত্ব বজায় রেখে চলা ও সম্পর্কহীনতাই মূলত তাদের অন্তরে মুসলমানদের প্রতি ভুল ধারণার জন্ম দিয়েছে। 

মাওলানা লিখেন, ‘এই অভিজ্ঞতা থেকেই আমি ১৯৭৬ সালে সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ ও মানবতার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করি। এ কাজে আমি ব্যাপক সাড়া পাই। এতে করে মধ্যমপন্থি অমুসলিম বুদ্ধিজীবি ও দার্শনিকদের মাঝে ইসলাম ও মুসলমানদের ইতিহাস চর্চার ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। হিন্দুস্তানে মানবতার বিপর্যয়, চারিত্রিক অধঃপতন, জান-মালের নিরাপত্তাহীনতা, একগুয়েমি, ক্ষমতার লিপ্সা, ইত্যাদির মুকাবিলায় ইসলামের দিকদর্শন তাদের সামনে পেশ করা হলে, তারা বলতে বাধ্য হয়েছে যে, একটি দেশকে রক্ষা করা এবং যাবতীয় অনৈতিক কার্যকলাপ থেকে মুক্ত করতে ইসলাম ও মুসলমানগণ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রসরমান।’ (কারওয়ানে জিন্দিগী: ১/৪০০)।

মাওলানা লেখালেখির ময়দানে আত্মনিয়োগ, দাওয়াতি কাজের তরজুমানী, নদওয়াতুল উলামার পরিচালনা এবং এ ধরণের বড় বড় শত ব্যস্ততা সত্তেও মানবতাবোধের এ আন্দোলনে কোনোরূপ কমতি করেননি। মাওলানা বলেন, ‘প্রতিনিয়ত এ দেশ চারিত্রিক অধঃপতনের দিকে ছুটছে। রাষ্ট্র, সমাজ অনৈতিকতার কড়াল আগ্রাসনের শিকার। জাতির ওপর আমিত্ববোধের ভূত চেপে বসেছে। মানুষের জান-মালের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সামান্য স্বার্থের কারণে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ অনায়াসে জলাঞ্জলি দিচ্ছে। 

কাজ ফাঁকি দেয়া, দায়িত্বহীনতা, সুদ, ঘুষ, চোরাকারবারিসহ সব অনৈতিক কার্যকলাপ দেদারসে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে জনজীবনে চরম অস্থিরতা নেমে এসেছে। বহুদিন অপেক্ষার পর নিজের জ্ঞান দৈন্যতা ও প্রস্তুতি স্বল্পতা সত্তেও সমাজের এই অনৈতিকতার মোকাবিলায় এগিয়ে আসি। যেমনিভাবে কোনো মহল্লায় আগুন লাগলে কেউ নিজের কমজুরি আর দুর্বলতার দিকে লক্ষ করে বসে থাকে না বরং বোবাও চিৎকার দিয়ে উঠে, বিকলাঙ্গও দৌঁড়াতে চেষ্টা করে।’ 

নীতিবিবর্জিত এ সমাজ তাঁর সামনে ছিল। জনজীবন চরম হতাশায় ভূগছিল। মানবতা ছিল প্রায় মৃত। মূর্খতার জয়জয়কার ছিল। অঙ্গিকার ভঙ্গ করা, আমানতের খেয়ানত, জুলুম-নির্যাতনসহ এমন কোনো অপরাধ ছিল না যা সংঘটিত হত না। তখন প্রয়োজন ছিল একজন বীরপুরুষের, যিনি এ সমাজকে মুক্ত করবেন। আল্লাহ তায়ালা এই গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য তাকে কবুল করেছেন। তিনি আজীবন জনজীবনে প্রশান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষে সাধানা করে  গেছেন। মাওলানা বলতেন, ‘শুধু হিন্দুস্তান নয়, বরং সমগ্র বিশ্বে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা প্রয়োজন যা হবে সবধরণের অপরাধ হতে মুক্ত। যাতে কোনো ধরণের রাজনৈতিক প্রভাব থাকবে না। মানবতা আর ইনসানিয়্যাত যাতে থাকবে সম্পূর্ণ মুক্ত-স্বাধীন।’

১৯৯৮ সালে এক বিশাল জনসমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখেন। এতে সমাজের অসঙ্গতি আর বেহাল দশায় নিজের ব্যাকুলতার বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন, ‘একজন পিতা নিজ সন্তান অসুস্থ হলে অসস্তিবোধ করে। নিজ প্রতিবেশী অসুস্থ হলে একই রকম অস্বস্তি আর ব্যাথা অনুভব করবে এটাও তো উচিত ছিল। নিজ গ্রামে কেউ বিপদে পড়লে যেমন কষ্ট অনুভব হয়, একই রকম কষ্ট অনুভব হওয়ার দরকার ছিল রাষ্ট্রের যে কেউ বিপদে পড়লে। স্মরণ রেখো! সমাজসেবার এই মহান কাজ কেবল তাদের দ্বারাই করা সম্ভব, যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ভালবাসে এবং মানবতা আর ইনসানিয়্যাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। আজকে মানুষ মানুষ থেকে পলায়ন করে। এটি বড় আশ্চর্যের বিষয় যে, মানুষ মানুষকে ভয় পায়। মানুষ তো সিংহকে ভয় পাবে, হিংস্র প্রাণীকে ভয় করবে। কিন্তু মানুষ মানুষকে কেন ভয় করবে? এটি বড় আশ্চর্যজনক ব্যাপার! মানবতা আর ইনসানিয়্যাতের সম্পূর্ণ বিপরীত’। 

মাওলানা (রহ.) এর এ মিশন একটি আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। কিন্তু তিনি এর সুবিন্যস্ত পূর্ণ রূপ দিয়ে যাননি। তবে মাওলানার যোগ্য উত্তরসূরীগণ অত্যন্ত সুচারুরূপে তার অসমাপ্ত কাজগুলো আঞ্জাম দিচ্ছেন। বর্তমান পৃথিবীতে দ্বীনি যাবতীয় কাজ ও দাওয়াতি মেহনতের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবতা ও সমাজ সেবায় এগিয়ে আসা। অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুপরিকল্পিতভাবে এ ময়দানে ভূমিকা রেখে সারা দুনিয়ায় মানবতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়া। মাওলানা আলী মিয়া নদভী (রহ.) সমাজ সংস্কারের যে আন্দোলন সূচনা করেছিলেন ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিহার্য। বর্তমান সময়ে মানবতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার কাজকেও দাওয়াতি কাজের অংশ মনে করা উচিত। কারণ এর মাধ্যমে আমুসলিমদের বিভিন্ন সংশয়-সন্দেহ দূরীভূত হয় এবং দাওয়াতের বড় ক্ষেত্র তৈরি হয়। 

মাওলানার এ মিশনটি সময়ের বড় প্রয়োজনীয় একটি মিশন ছিল। বর্তমানে এর প্রয়োজনীয়তা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ বর্তমান অবস্থা আগের চেয়ে নাজুক। অমুসলিমদের ইসলাম সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণাটুকুও নেই। এজন্য আমাদের উচিত মাওলানার রেখে যাওয়া আমানতের সদ্ব্যবহার করা এবং মানবতার পয়গামকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমিন।

ভাষান্তর : মুফতি হাসানুজ্জামান

সংগ্রহ : নুসরাত জাহান

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে