মশা-মাছি এমনকি নারীরাও তার সংস্পর্শে এলে মারা যেত!

মশা-মাছি এমনকি নারীরাও তার সংস্পর্শে এলে মারা যেত!

সাদিকা আক্তার  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:২০ ২২ মার্চ ২০২০   আপডেট: ১৭:৩০ ২২ মার্চ ২০২০

ছবি: প্রতীকী

ছবি: প্রতীকী

ভোজনরসিক মানুষের কাছে খাওয়াই যেন তার সর্বশেষ ইচ্ছা! সুস্বাদু খাবার খেতে কে না পছন্দ করে? তবে খাবারের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তো আপনি মেনেই চলেন তাইনা! ঠিক কতটুকু খাবার আপনি দিনে খেতে পারবেন? যতটুকুই পারেন না কেন তা নিশ্চয়ই ৩৭ কেজির কোঠায় গিয়ে ঠেকবে না! অবাক হচ্ছেন? হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন এমনি এক ব্যক্তির নাম মাহমুদ বেগাদা। তিনি ভারতের গুজরাটের রাজা ছিলেন। 

মাহমুদ বেগাদা সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন। ১৪৫৮ থেকে ১৫১১ সাল পর্যন্ত, প্রায় ৫৩ বছর ধরে তিনি গুজরাটে রাজত্ব করেছিলেন। তিনি সত্যিকার অর্থে একজন ভোজনরসিক ছিলেন। রাজ্য শাসনকালে তিনি আর কিছু না করুন চুটিয়ে খাওয়া-দাওয়া করেছেন বটে! তেমনই ছিল তার বাহুবল। শরীরের শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই খাওয়া পেটে পুরতেন তিনি।

‘পয়জন সম্রাট’, বিষ খেতেন সুলতান

ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ বার্বোসা এবং ভার্থেমার কথা অনুযায়ী জানা যায়, একবার সুলতানের খাবারে বিষ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর থেকে তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে প্রতিদিন অল্প পরিমাণে খাবারের মধ্যে বিষ মেশানো হতো এবং প্রতিদিন এটি তাকে খেতে দেয়া হতো। ভাবছেন বিষ তো মানুষকে মেরে ফেলে! তাহলে সেই সুলতান কেমন করে বেঁচে ছিলেন? 

ভোজনরসিক মাহমুদ বেগাদাওখানেই তো ছিল তার বিশেষত্ব। রোজ একটু একটু করে বিষ খেতেন তিনি। হজমও করে ফেলতেন। এর অবশ্য একটি কারণ ছিল। তিনি ভাবতেন, সব ধরনের বিষ যদি তার শরীরে প্রয়োগ করা হয় তবে কখনো তিনি বিষের প্রভাবে মরবেন না। রাজনৈতিকভাবে তিনি কতটা সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করতেন তা ঘটনার মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়। জানা যায়, তার লালাতেও বিষের প্রভাব থাকত। এজন্য প্রতিপক্ষকে জব্দ করতেই তিনি নিজেকে বিষ নায়কে পরিণত করেছিলেন।

ইতিহাসবিদদের মতে, তার শরীরের সংস্পর্ষে যদি কোনো মশা বা মাছিও আসত সেগুলোও মরে যেত। এমনকি সুলতান তার জীবদ্দশায় যত জন নারীর সঙ্গে সহবাস করেছিলেন তারা সবাই তাতক্ষণিক মৃত্যুবরণ করেন। অনেকের ধারণা, তার পোশাক পরিচ্ছদও দাস-দাসীরা স্পর্শ করেনি এবং তারা সেগুলো পুড়িয়ে দিয়েছে।

তার শাসনকাল

সুলতান তার ৫৩ বছরের শাসনকালে সুসজ্জিত রাস্তা-ঘাট, বিশাল স্থাপনা, মসজিদ, মন্দির নির্মাণ করেছেন। তিনি গুজরাটে আহেমদাবাদ নামে একটি শহরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সবুজ গাছপালায় ঘেরা এক প্রশান্ত স্থান আহেমদাবাদ। সেখানকার তৎকালীন কয়েকটি ঐতিহাসিক নির্মাণ রয়েছে যেমন- ভাম্মারিও কুভো, চন্দ-সুরজ ও মেহাল পাশাপাশি রোজা-রোজি। ধারণা করা হয়, ভাম্মারিও কুভো থেকে আহেমদাবাদ, পাবাগড় এবং জুনাগড়ের সঙ্গে সংযুক্তকারী কয়েকটি ভূগর্ভস্থ সুরঙ্গ রয়েছে। 

সুলতানের সময়ের স্থাপনাতার সাফল্য

সুলতানের প্রথম বিজয় ছিল পবাগড় দুর্গ। টানা ২০ মাস অবরোধের পরে ১৪৪৪ সালের ২৪ নভেম্বরে তিনি দুর্গটি জয় করেন। এরপর তিনি তার রাজধানী চম্পানরে এই দুর্গের কাছে স্থানান্তরিত করেন। শহরটি তৈরি করতে তার ২৩ বছর সময় লেগেছিল। সুলতান চম্পানে তার রাজত্বকালে একটি সুন্দর জামে মসজিদও নির্মাণ করেছিলেন। যা গুজরাটে সেরা স্থাপত্যশৈলীর মধ্যে অন্যতম। 

মসজিদে দু’টি সুউচ্চ মিনার রয়েছে যা ৩০ মিটার উঁচু, ১৭২ পিলার এবং সাতটি মিহরাব রয়েছে স্থাপনাটিতে। মসজিদের কেন্দ্রীয় গম্বুজ, বারান্দাগুলো এবং প্রবেশদ্বারে মূল্যবান জালিস পাথর দিয়ে কারুকাজ করা হয়। বেগদা আমলের আরো কয়েকটি কাঠামো হলো- কেভাদা মসজিদ, সিটাদেল জাহানপাহ, শাহার কি মসজিদ, কাস্টম হাউজ, নাগিনা মসজিদ, বাভা ম্যানস মসজিদ, খাজুরহা মসজিদ, এক মিনার মসজিদ এবং লীলা গুম্বাজ।

গুজরাটের দুই মিনারের মসজিদ

ভোজন রসিক আহমেদ

সুলতান প্রতিদিন সকালে নাস্তায় এক কাপ মধু, মাখন ও ৫০টি কলা খেতেন। প্রতিদিন তিনি ৩৫ থেকে ৩৭ কেজি খাবার খেতেন। খাওয়ার পরে তিনি যেসব মিষ্টান্ন খেতেন তার ওজনই ছিল কয়েক কেজি। যদি খাওয়ার পরে তার পেট না ভরত তখন তাকে সাড়ে চার কেজির ডেজার্ট খেতে দেয়া হতো। এত কিছুর পরও রাতের বেলা ক্ষুধা পেত সুলতানের। এর জন্য তার বিছানার দু’পাশে দুটি বড় থালায় মাংস ভর্তি সমুচা রাখা থাকত। যাতে রাতের বেলা ক্ষুধা লাগলে তিনি সেগুলো খেতে পারেন।

সুলতানের কথা শুনে মনে হতে পারে, এসব একেবারই গল্প কথা। সুলতানের এই গল্প দূর-দূরান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এবং যারা সপ্তদশ শতাব্দীতে ব্যঙ্গ রচয়িতা স্যামুয়েল বাটলারের ‘হুদিব্রাস’ বই পড়েছেন, তারা সবাই রাজার খাওয়া-দাওয়া সম্পর্কে জানতো। মাহমুদ তার ক্ষুধা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং বলতেন, আল্লাহ যদি না থাকত তবে আমার ক্ষুধা কে মেটাত? সুলতান এভাবেই খেতে খেতে একদিন মৃত্যুবরণ করেন। তবে আজো তার রেখে যাওয়া কাণ্ডকীর্তি সবাইকে কৌতূহল করে তোলে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস