Alexa মন কেড়েছে ‘মুন্নার’

মন কেড়েছে ‘মুন্নার’

সজল জাহিদ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:৪৭ ৪ মে ২০১৯   আপডেট: ১২:৪৯ ৪ মে ২০১৯

মুন্নার, কেরালা

মুন্নার, কেরালা

কেরালাকে বলা হয় ‌‘বিধাতার বাড়ি’। কেন বলা হয়? ঠিকই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গিয়েছিলাম কেরালা আর মুন্নার।

কেরালার অপূর্ব রেল স্টেশন ইরনাকুলাম থেকে মুন্নারের দিকে বাসে চড়ে যাচ্ছিলাম। বাস সমতল থেকে পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা আর উঁচু পথ ধরতেই, ধীরে ধীরে অনুভব করতে লাগলাম কেন এই জায়গাকে বিধাতার নিজের বাড়ি বলা হয়? এরপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিক মনে নেই। যখন ঘুম ভাঙলো, ততক্ষণে সমতল ছেড়ে পাহাড়ি পথে চলতে শুরু করেছিলাম। এক পাহাড়ি বাস স্ট্যান্ডে বাস থেমেছিল ১০ মিনিট বিরতিতে। এর পরেই শুরু হয়েছিল মুন্নার যাবার মনোমুগ্ধকর রাস্তা।

আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে উপরে উঠি আর সবুজের অরণ্য ভেদ করে নানা রকম আকর্ষণীয় সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে সামনে এগোতে থাকি। তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা তার ঝরার গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিয়েছিল, যে কারণে সবুজের ঘেরা পাহাড়ি পথের দুই পাশটা আরো বেশি মুগ্ধকর হয়ে উঠেছিল। একপাশে সবুজের সমুদ্র ঢেউ খেলানো চা বাগান, তার একটু উঁচুতে গভীর আর ভেজা অরণ্য। অন্যপাশে উঁচু উঁচু পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছোট বড় নানারকম রুপালি ঝরনা, সাদা মেঘের ভেলা, কাছে দূরে কুয়াশার নিজের মত করে খেলা। এক অপরূপ আবেশ তৈরি করে দিয়েছিল মুহূর্তেই!

হুট করেই বেশ ঠাণ্ডা লাগায় মোবাইলের স্কিনের দিকে তাকিয়ে দেখি দুপুরের ৩৭ ডিগ্রি তাপমাত্রা কখন যেন কমে ১৭ তে চলে এসেছে! মানে উত্তপ্ত গরম থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যে শীতের দেশে চলে এসেছি! বাহ কী অদ্ভুত ব্যাপার! যদিও এমন অভিজ্ঞতা দার্জিলিং-এ বহুবার পেয়েছি। কিন্তু এবার অনেক বেশি রোমাঞ্চকর ছিল সময়টা।

মুন্নার এর একটি রিসোর্ট

গরমে গোমড়া মুখে শীতের সুখ সুখ পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল মুন্নার যাবার পথের সবুজের সমুদ্র, ঢেউ খেলানো চা বাগান, গভীর আর অচেনা অরণ্য, ঝিরঝিরে বৃষ্টি, কাছে দূরের ছোট-বড় পাহাড়, পাহাড়ে-পাহাড়ে জমে থাকা মেঘের দল, মাঝে মাঝে বাসের খোলা জানালা দিয়ে আঁকড়ে ধরা শীতের কুয়াশা আর পাহাড়ের গা থেকে ঝরে পরা অসংখ্য রুপালী ঝরনাধারা।

মুন্নারে পৌঁছে সন্ধ্যায় ফ্রেশ হয়ে শহর দেখতে বেরিয়েই অবাক হলাম! কি ঝলমলে এক একটা দোকান, চায়ের ফ্যাক্টরি আউটলেট, কফি বিক্রির দোকান, নানা রকম দোকানে ভিন্ন রকম চকলেটের বিকিকিনি। এক একটা দোকানে ঢুকি আর চা, কফি, চকলেটের গন্ধে মুগ্ধ হই! এতটাই বিশুদ্ধ মনে হলো সে গন্ধ। মনে হচ্ছিল মুখ হা করে রাখি আর বুক ভরে বিশুদ্ধ খাঁটি কফি আর চকলেটের গন্ধ নিয়ে নেই যতটা পারি। আর চোখে পড়লো অন্য রকম এক সাবানের আয়োজন, পাতা আর কোনো একটা গাছের বাকলের মধ্যে আয়ুর্বেদিক সাবানের সমারোহ।

চা, কফি, সাবান আর বহু রকমের চকলেটের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল এক একটা বর্ণিল দোকানে নানা রকম বর্ণিল চকলেট দেখাটা। সেটাও চকলেটের প্যাকেট নয়, একেবারে ‘র’ চকলেট। কেজি ধরে বিক্রি হচ্ছে। সাদা, লাল, কফি, আর রঙ বেরঙের নানা রকম চকলেট। গামলায় গামলায় সাজিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে। দেখেই মন ভরে গেছে। আর মানুষ কিনেছেও দেদারছে!

মেঘের দল

রাতের মুন্নার ছিল, গাছে-গাছে, পাতায়-পাতায়, পাহাড়ে-পাহাড়ে, ফুলে-ফুলে, ঝরনা ধারায়, পাহাড়ি নদীতে বৃষ্টি ঝরা, বৃষ্টিময়। কিন্তু সকালের মুন্নার? একদম অন্য রকম মুগ্ধতা ছড়ানো! খুব ভোরে আমাদের ঘুম ভেঙে ছিল। আগের দিনের ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে মুন্নারের যে সিগ্ধ সবুজ রূপ দেখেছিলাম, সকালে সেই সবুজে সূর্যের আলোয় চারদিক যেন হলুদ রঙে সেজে উঠেছিল! সবুজ কচি পাতায়, সূর্যের প্রথম স্পর্শে একটা হলুদের ঢেউ ওঠে।

পাহাড়ের গায়ে গায়ে নাম না জানা অনেক রকমের আর রঙ-বেরঙের ফুল হেসেছিল সূর্যের ছোঁয়া মেখে। পাহাড় আর অরন্যরক ফাঁক গলে ঢুকে পরা শীত সকালের প্রথম সূর্যের উষ্ণ পরশ একটা অন্য রকম আরাম দিচ্ছিল। এরপর আলো আসল আকর্ষণ, মুন্নারের চা বাগান। এর আগে তো অনেক চা বাগান দেখেছি। কিন্তু এমন ঢেউ খেলানো, এমন আকৃতির আর আকর্ষণীয় চা বাগান এর আগে কখনো দেখিনি।

মুন্নারের ছবিতে আর সিনেমার নাচে গানে যে দৃশ্যগুলো দেখতাম তা আজ একদম হাতের নাগালে! চোখের সামনে সবকিছু, ক্যামেরার ক্লিকে। ইচ্ছে হলেই নেমে পড়া যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে, ছোঁয়া যাচ্ছে, আর প্রাণভরে রূপ, রস, গন্ধ অনুভব করা যাচ্ছে। পাগল করা মুহূর্তগুলো যতটা সম্ভব ধরে রাখতে কখনো ক্যামেরা আর কখনো মোবাইলে ধারণ করে রাখছিলাম। সেই হলুদ-সবুজ আর সোনালি স্নিগ্ধ চা বাগানে অনেক অনেকক্ষণ কাটিয়েছিলাম।

মুন্নারের নাকি কোনো ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ বা মশা মাছি নেই! যে কারণে সেখানে কারো তেমন রোগ বালাইও হয়না। শীতের সময়টুকু ছাড়া বছরের সবসময় তাপমাত্রা ১৫ থেকে ২৫ এর মধ্যে থাকে। যা খুবই আরামদায়ক। সবকিছু মিলেই কেরালা বা মুন্নারকে বলা হয় ‌‘বিধাতার বাড়ি!’

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে