Alexa মঙ্গল গ্রহের কুয়া ।। হারুকি মুরাকামি

মঙ্গল গ্রহের কুয়া ।। হারুকি মুরাকামি

(বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫০ ৬ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৬:০৭ ৬ আগস্ট ২০১৯

ছবি: ইন্টারনেট

ছবি: ইন্টারনেট

[ডেরেক হার্টফিল্ডের লেখা ছোট গল্পগুলোর মধ্যে ‘মঙ্গল গ্রহের কুয়া’ একটি বিখ্যাত ও ভিন্নধর্মী রচনা। অনেক পূর্বে পড়েছিলাম। গল্পের অনেক বিস্তারিত খুঁটিনাটিই আমি ভুলে গেছি। তবে মোটামুটি সারাংশ নিম্নরূপঃ]

‘মঙ্গল গ্রহের কুয়া’ এক পরিব্রাজক যুবকের কাহিনী। আমরা জানি মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠদেশে হাজার হাজার কুয়া আছে। যুবক এই কুয়াগুলোর ভেতরে ঘুরে বেড়ায়।
কুয়াগুলো অদ্ভুত ধরণের। কোনটারই কোনটারই তলা নেই। সম্ভবত শত সহস্র বছর পূর্বে কুয়াগুলো খনন করা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কুয়াগুলোর কোনটিতেই জলের অস্তিত্ব ছিল না। ধারণা করা হয়ে থাকে যে, মঙ্গল গ্রহের অধিবাসীরাই কুয়াগুলোর সঙ্গে জলের কোনো সংযোগ না থাকে তার ব্যবস্থা করেছিল। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে।

কুয়াগুলো তৈরির উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সঠিক তথ্য আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে ধারণা করা হয়ে থাকে যে, কুয়াগুলো মঙ্গলের অধিবাসীরা তাদের এক সময়কার অস্তিত্বের উদাহরণ হিসেবে রেখে গিয়েছে। অন্যদের জন্যে।  বর্তমান পর্যন্ত মঙ্গলের অধিবাসীদের কোনো হস্তলিখিত ভাষা, বাসস্থান, খাদ্যগ্রহণের তৈজসপত্র, ধাতু, গোরস্থান, রকেট, নগর, কলাই ভাঙ্গানোর যাঁতা – কোনো কিছুই বৈজ্ঞানিকেরা খুঁজে পাননি। এমনকি বেলাভূমির কোনো সমুদ্রঝিনুক পর্যন্ত নয়। শুধুমাত্র কুয়াগুলো  ছাড়া!

মঙ্গলের অধিবাসীদের অস্তিত্ব সম্পর্কে এখনো পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা তর্কে লিপ্ত রয়েছে। কারণ ওখানে এমনকিছুই পাওয়া যায়নি যার মাধ্যমে প্রমাণ করা সম্ভব যে, তারা অস্তিত্বশীল বা কোনো সভ্যতার অংশ ছিলো। কিন্তু কুয়াগুলোর নির্মাণশৈলী ছিলো অসাধারণ। শত সহস্র বছর পরেও এদের আকৃতি পূর্বের মতই রয়ে গেছে। কুয়াগুলোর শরীরের গাঁথুনিতে দেয়া একটা পাথরও এদিক সেদিক হয়নি।

বর্তমান পর্যন্ত পৃথিবীর অনেক মহাজাগতিক অভিযাত্রী ও বিজ্ঞানীরাই কুয়াগুলোর সম্পর্কে সত্য উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করেছে। অনেক বিজ্ঞানীই চেষ্টা করেছিলেন দড়ির আগায় কিছু বেঁধে দিয়ে কুয়াগুলোর তলা পর্যন্ত প্রেরণ করতে। কিন্তু কুয়াগুলো এতোই অন্তহীন ছিলো যে, তারা কোনো ধরণের সাফল্যই অর্জন করতে সক্ষম হননি। কয়েকজন অভিযাত্রী চেষ্টা করেছিলো দড়ি ছাড়া নিজেরাই এর তলদেশে পৌঁছাতে। এরা কেউই আর কোনদিনই মঙ্গলের পৃষ্ঠে ফিরে আসেনি। অন্তত এই যুবকের আগমনের পূর্ব পর্যন্ত।

পূর্বেই বলেছি এই যুবক একজন মহাজাগতিক পর্যটক। চেনা পৃথিবীর বাইরে মহাকাশ জুড়ে তার পরিভ্রমণ। কিন্তু মহাকাশের সীমাহীন বিশালতা ও নির্জনতা দেখতে দেখতে একসময়ে সে খুবই ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে। সে আর কিছুই দেখতে চায় না।  তার বর্তমান চাওয়া শুধুমাত্র মৃত্যু।  মহা জগতের নির্জন কোনো গ্রহে একাকী নামহীন মৃত্যু। একারণেই সে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্ঠে অবতরণ করেছে।

মঙ্গলের পৃষ্ঠে অবতরণ করেই যুবক দেখতে পায় শত সহস্র কুয়া। ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে মঙ্গল গ্রহের পৃষ্টদেশ জুড়ে।  যুবক কোনো ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই যেকোনো একটা কুয়ার ভেতরে নেমে পড়ে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কুয়ার দেয়াল বেয়ে কিছুদূর নামার পরেই যুবকের মানসিক অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যায়। জগত পরিভ্রমণের পর তার ভেতরে যে মানসিক অবসাদ বা হতাশা সৃষ্টি হয়েছিল, তা অলৌকিকভাবে অন্তর্হিত হয়ে যায়।

কুয়ার উপরিভাগ হতে প্রায় আধা মাইল নীচে সে একটা সুড়ঙ্গপথ দেখতে পায়। মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশের সমান্তরালে। আঁকাবাঁকা ও দীর্ঘ। ল্যাবিরিন্থের মতো। ভেতরে প্রায়ান্ধকার। তবে দেখে মনে হয় সুড়ঙ্গপথটি কোথাও গিয়ে শেষ হয়েছে।

যুবক তার পরিবর্তিত মানসিক অবস্থায় তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয় অন্ধকারাচ্ছন্ন সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ করার এবং সুরঙ্গপথ অনুসরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। যদিও সে নিশ্চিত নয় যে, এই সুরঙ্গ পথ তাকে আদৌ কোনো গন্তব্যে নিয়ে যাবে কিনা। তবে নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুবক কোন অন্তর্দ্বন্দ্বে ভোগে না। সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। গভীর অন্ধকার রাতের সেনাটহলের দুঃসাহসী স্কাঊটের মতো।

যাই হোক, যুবক তার এই অনির্দিষ্ট যাত্রায় এক সময়ে সময়ের খেই হারিয়ে ফেলে। তার হাতের ঘড়ির কাঁটা বন্ধ হয়ে যায়। তবু সে থামে না। এগিয়ে যেতে থাকে একাধারে। অনির্দিষ্টকাল ধরে। এই কাল দুই ঘণ্টা অথবা দুইদিন অথবা আরো বেশি হতে পারে। কিন্তু অন্ধকারের ভেতরে যুবক তা বুঝতে পারে না। তবে আশ্চর্যজনকভাবে যুবকের ক্ষুধা, তৃষ্ণা কিছুই পায় না। যেনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে পেয়ে বসে। যার থেকে তার নিষ্কৃতি নেই!

অনেক সময় অতিক্রান্ত হবার পর একদিন যুবক দেখতে পায় তার মাথার ওপরে উজ্জ্বল আলো ঠিকরে পড়ছে। সে আবিস্কার করে যে সুরঙ্গপথ অন্য একটা কুয়ার সঙ্গে সংযোগ প্রাপ্ত হয়েছে। এবং তার অবস্থান নতুন কুয়াটির প্রবেশ মুখের সন্নিকটে। হামাগুড়ি দিয়ে সে কুয়ার কিনারায় ওঠে আসে। পুনরায় সে মঙ্গলের পৃষ্ঠদেশে। কিনারা থেকে প্রথমে সে তাকায় সামনের অখণ্ড বিশাল প্রান্তরের দিকে। অতঃপর দৃষ্টি ফেরায় ওপরের দিকে। সূর্যের পানে। কিছু পরিবর্তন সে লক্ষ্য করে। বাতাসের গন্ধ, সূর্য সব কিছুতেই। সূর্য যদিও তার মাথার ওপরে, কিন্তু দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল যে, ওটা ছিল একটা অস্তগামী সূর্য। নিবু নিবু করছিল এবং আকাশের ভেতরে ঝুলে ছিল। বিশাল এক কমলা লেবুর মত।

“আর মাত্র ২,৫০,০০০ বছর। তার পরেই সূর্য বিস্ফোরিত হবে,”একটা কণ্ঠ ফিসফিস করে করে বলে। “২৫০,০০০ বছর। তুমি জানো এটা খুব দূরে নয়।”
যুবকের মনে হয় কথাগুলো বাতাসের সঙ্গে ভেসে আসছে এবং বাতাসেরই কণ্ঠস্বর।

“তুমি কিছু মনে করো না। আমি শুধুমাত্রই বাতাসের প্রবাহ। তুমি চাইলে আমাকে মঙ্গল গ্রহের অধিবাসী বলেও ডাকতে পারো। ডাকটার ভেতরে একটা রিনরিনে ভাব আছে, নুপুরের নিক্বণের মতো। যদিও শব্দ বা কথা আমার কাছে কোনো অর্থই বহন করে না।”
“কিন্তু তুমি তো কথা বলছো, ”যুবক উত্তর দেয়।

“আমি? না, আমি কথা বলছি না। এই কথাগুলো তোমারই। আমি শুধু তোমার মনের ভেতরে সংকেত পাঠাচ্ছি।”
“ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা আমি তোমার কাছ থেকে জানতে ভাই। বলতে পার সূর্যের কি হয়েছে?”
“সে বুড়ো হয়ে গেছে এবং শীঘ্রই মারা যাবে। কিন্তু এটা নিয়ে তোমার বা আমার কিছুই করার নেই।”
“কিন্তু তার এই হঠাৎ মৃত্যু ...”

“হঠাৎ? কখনোই নয়। তুমি কুয়ার ভেতরে প্রবেশ করার পর অর্ধ বিলিয়ন বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। এবং পুরো সময়ে তুমি কুয়ার অভ্যন্তরেই ছিলে। তোমরা পৃথিবীর মানুষেরা অনেক সময়ে বলে থাকো, ‘সময় উড়ে যায়’। এটা সেই সময় উড়ে যাবার মতো। এই সুড়ঙ্গপথগুলো তৈরি করা হয়েছে সময়ের বক্রতা দিয়ে। আমরা মঙ্গলের অধিবাসীরাই এগুলো খনন করেছি। যে সুড়ঙ্গপথ দিয়ে তুমি এখানে এসেছো তা আসলে প্রবাহিত হয়েছে মোচড়ানো সময়ের (Time Warp) পথ অনুসরণ করে। আমরা এগুলো তৈরি করেছি সময়কে পাশ কাটিয়ে ভ্রমণ করার জন্যে। সংক্ষিপ্ততম সময়ের ভেতরে বিশ্ব জগতের শুরু থেকে শেষ অবধি বিচরণ করার জন্যে। বলতে পার, সৃষ্টির আদিকাল থেকে চূড়ান্ত ধ্বংস বা মহাপ্রলয়ের দিন পর্যন্ত। জীবন ও মৃত্যুর বাইরে অন্য এক জগতে আমাদের অস্তিত্ব ও বাস। আমরা প্রবাহমান বাতাস বা বায়ুপ্রবাহ।”
“আমি কি তোমাকে আর একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
“অবশ্যই।”
“ এই দীর্ঘ ভ্রমণে কি শিখতে পেরেছো তুমি এতোকাল ধরে?”
অকস্মাৎ যুবকের চারপাশের বাতাস নড়ে উঠলো। অদৃশ্য কোন হাসির গমকে। তারপর একটা চিরন্তন নীরবতা নেমে এল। মঙ্গলের প্রান্তরের ওপরে।
যুবক পকেট থেকে পিস্তল বের করে কালবিলম্ব না করে নিজের মস্তকে সেটা স্থাপন করে ট্রিগার চেপে দিল।

(সম্পাদিত)
ছবিঃ আন্তর্জাল
মূলঃ হারুকি মুরাকামি

অনুবাদঃ মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
 

Best Electronics
Best Electronics