Alexa এই লেকে গেলেই মৃত্যু!

এই লেকে গেলেই মৃত্যু!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:২২ ৮ অক্টোবর ২০১৯   আপডেট: ১৫:৪৭ ৮ অক্টোবর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

একটি ভয়ংকর লেক। এর আশেপাশে গেলেই মৃত্যু অনিবার্য। লেকটির নাম শুনলেই গায়ে কাটা দেয় যেন! ‘দ্য লেক অব নো রিটার্ন’। নামের মধ্যেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটি কতটা ভয়ংকর। হ্যাঁ আসলেও লেকটি অনেকটা ভয়ংকর। বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে পৃথিবীর বুকে এমন অনেক অজানা রহস্য রয়েছে যার রহস্য আজও উন্মোচন করা সম্ভব হয় নি। তেমনি একটি রহস্যময় জায়গা হচ্ছে এই লেকটি।

আপনি যদি জানেন এই লেকটির কাছাকাছি গেলে আপনার আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই তাহলে কি আপনি সেখানে যাবেন? আপনি কেন অনেক সাহসী বীরের পক্ষেও এই স্থানটিতে যাওয়ার সাহস হবে না। শুরুতে যারা না জেনে এই লেকটিতে গিয়েছিলো তারা কেউ আর ফিরে আসে নি। কিন্তু কেনো? সেটাই আসলে রহস্য। কোনো এক অজানা কারণে লেকটিতে কেউ গেলেই সে আর ফিরে আসে না বললেও ভুল হবে। আসলে সে অদৃশ্য হয়ে যায়। 

ভয়ংকর লেকদূর থেকে তাকে আপনি দেখছেন। কিন্তু হঠাৎই সে আপনার চোখের সীমানা থেকে হারিয়ে যাবে! উত্তর মায়ানমারের ঘন জঙ্গলে অবস্থিত এ হ্রদটির রহস্যময়তার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি। এই রহস্যময় হ্রদটির কথা জানা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। সে সময় এ অঞ্চলে একটি রাস্তা তৈরি হয়েছিল। এই রাস্তার কাজ শুরু হয় ১৯২৩ সালে। তখনই এ হ্রদের খোঁজ পাওয়া যায়। এর অলৌকিক ক্ষমতার কথাও ছড়িয়ে পড়ে অচিরেই।

অরুণাচল প্রদেশের কাছে ভারত-বার্মা সীমান্তে উত্তর মিয়ানমারের ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাংসাউ গ্রামে রয়েছে বারমুডার মতই রহস্যময় এই স্থানটি। প্রায় ১ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং মাত্র শূন্য দশমিক ৮ কিলোমিটার প্রস্থের লেকটি ঘিরে আছে আরো হরেক গল্পগাঁথা। এর নামকরণের পেছনেও আছে নানান ইতিহাস। এর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ঐতিহাসিক লেদো রোড, ১৯৪২ সালে অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিত্রবাহিনী রাস্তাটি তৈরি করে। মানচিত্রে তখন এর পরিচয় ছিল- স্টিলওয়েল রোড।

সে সময় হিমালয়ের পূর্ব পাশ ঘেঁষা এই লেকের ওপর দিয়ে ভারত হয়ে চীনে যেত রসদবাহী বিমান। জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত মার্কিন ও চীনা সেনাদের রসদ পৌঁছাতে এর চেয়ে নিরাপদ আর কোনো পথ সেই সময়ে জানা ছিল না মিত্রবাহিনীর। তবে কোনো এক অজানা কারণে রসদবাহী বিমানগুলো হয় নিরুদ্দেশ হতো না হয় মুখ থুবড়ে পরতো লেকের আশেপাশে। ঠিক ওখানে গেলেই নাকি বিমানগুলোর ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ দেখা দিত। পাইলটরাও কোনো ধরনের বার্তা পাঠাতে পারতেন না। 

ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি সফল অভিযান শেষে ওই পথ দিয়েই ফিরছিল এক কোম্পানি জাপানি সেনা। পথ হারিয়ে সেই লেকের কাছে যায়। লেকের বাতাসে ভেসে বেড়ানো ম্যালেরিয়ার জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে একে একে সেখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অর্থাৎ যেভাবেই যাওয়া হোক, এ লেকের পাশ দিয়ে গেলে না ফেরা নিশ্চিত। 

সুন্দর এই স্থানটি পর্যটনদের জন্য খুবই আকর্ষণীয়একবার নাকি পুরো এক ব্যাটালিয়ান জাপানি সেনা স্রেফ উধাও হয়ে যায় লেকের আশপাশ থেকে। এমনকি এর তদন্তে যাওয়া আরেকটি সেনাদলও আর ফিরে আসেনি। আরেকটি সূত্রমতে, যুক্তরাষ্ট্রের একদল আর্মিকে একবার লেকটি নিরীক্ষণ করতে পাঠানো হয়। হঠাত লেকের পানি বাড়তে শুরু করে এবং তারা পানির ফাঁদে নিমজ্জিত হয়। অনেক চেষ্টার পরেও পানির তোড় থেকে তারা বেরোতে অক্ষম হয়। লেকের পানি যেন তাদের গলাধঃকরণ করে নেয়!

যারা শুধু কল্পকাহিনী ভাবছেন তাদের জন্য বলা, এই লেকের কথা কিন্তু ইসরায়েলের ‘হাড়িয়ে যাওয়া দশ উপজাতি’দের পুরানো লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এই উপজাতিদের ধর্মযুদ্ধের সময় ইসরায়েল থেকে বিতাড়িত করা হয়। ধারণা করা হয়, সেই উপজাতিদের একটি এই অঞ্চলেই নিজেদের ঠিকানা তৈরি করে নেয়।    
 
আরো আছে স্থানীয় প্রাচীন লোকগাঁথা। গ্রামের এক লোক একবার একটা বিরাট মাছ ধরে এই লেক থেকে। এক বৃদ্ধা আর তার নাতনি ব্যতীত গ্রামের সবাইকে সে মাছ খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। শুধু তাই নয়, লেকের তত্ত্বাবধায়ক তাদের দু’জনকে সে রাতেই গ্রাম ছেড়ে পালাতে বলে। পরের দিন না-কি সমগ্র গ্রাম সে লেকের পানিতে তলিয়ে যায়। তাছাড়া যাবার আগে, বৃদ্ধা তার বাঁশের লাঠি লেকে ছুঁড়ে ফেলে যায়, স্থানীয়দের বিশ্বাস সে বাঁশ এখনো হ্রদের পানির নিচে ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।

রহস্যের এখানেই শেষ নয়। লেকটি না-কি ক্যামেরাবন্দিও হতে চাই না! এ লেকের ছবি তুললেও সে ছবি ওপর থেকে ঝাপসা আসে। হয়ত লেকটির চারপাশে কোনো রশ্মি সর্বক্ষণ বিকিরণ করে যাচ্ছে যার জন্য এখানকার কোনো ছবি ফটো প্লেট চিহ্নিত করতে পারে না! আবার যারা বিভিন্ন সময় হেলিকপ্টারে এ লেক প্রদক্ষিণের চেষ্টা করেছেন, তাদের কারো সঙ্গে কারো তথ্যের মিল নেই। কেউ কেউ একে, লেক হিসেবেই মানতে রাজি নয়। তাদের মতে, এটা কেবলই ঘন জঙ্গলে ঢাকা একখন্ড জমি।

লেক অব নো রিটার্নবর্তমানে লেকটি পরিত্যক্ত। পাংসাউ পাস অঞ্চলে এর কাছে তাংসা উপজাতির বাস। তারা প্রতি শীতে সাড়ম্বরে হিম উৎসব আয়োজন করে। উৎসাহী পর্যটকেরা একইসঙ্গে আদিবাসীদের জীবনাচরণ এবং লেকের রহস্যময়তা উপভোগ করতে পানসাউতে ভিড় জমান। তাছাড়া লেকের ছবি তোলা যায় না বলে যে গুজব রয়েছে সেটিও তো একপ্রকার মিথ্যাই। নইলে গুগলে এত ছবিই কারা তুলল, কীভাবে তুলল? 

আরও অনেক অভিযাত্রী হেলিকপ্টারে করে এই স্থানটির উপর দিয়ে গিয়েছেন। তাদের মতে, অঞ্চলের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় তারা বিস্ময়করভাবে পুনঃযৌবন লাভ করে। এখান থেকে দূরে চলে এলেই পূর্বের অবস্থা ফিরে আসে। এ রহস্যময় হ্রদের ব্যাপারে আরেকটি অবাক ব্যাপার হল এর ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কে হেলিকপ্টার আরোহীদের দেয়া তথ্য। এসব তথ্য কারও সঙ্গে কারোটা মিলেনা।

ধারনা করা হয়, এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি অদ্ভুতভাবে সব সময় পাল্টায়। ফলে এটি সত্যি জল টলটলে হ্রদ, না এমনি একটি জলাভূমি, না একখণ্ড জঙ্গলে জমি তা সঠিকভাবে জানা যায়না। ভয় আরও বেড়ে যাবে যখন শুনবেন নীরব-নিস্তব্ধ এই স্থানটি থেকে গভীর রাতে মানুষের দুর্বোধ্য আওয়াজ ভেসে আসার কথা শুনলে। এমনটিই শুনে থাকেন স্থানীয় মায়ানমার ও ভারতীয় গ্রামের অধিবাসীরা। তাদের মতে, যেকোনো বড় জনবসতির দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক শোরগোলের মতই সে শব্দ।

দেখা যাক, লেকের এ রহস্য কতদিন অমীমাংসিত থাকে। লেকের রহস্যের সত্যতার গ্যারান্টি না দেয়া গেলেও সবুজে ঘেরা পানসাউ গ্রাম দেখে যেকোনো পর্যটক নিরাশ হবেনা সে কথা বলা যায়। ঐতিহাসিক এ স্থানটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক স্মৃতিচিহ্ন সম্বলিত, রয়েছে যুদ্ধে প্রাণ হারানো সৈনিকদের সমাধিস্থল।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস