ভ্রমণ যাত্রা

ভ্রমণ যাত্রা

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:১৮ ২০ জুন ২০২০   আপডেট: ২১:০৫ ২১ জুন ২০২০

ছবি: আন্তর্জাল

ছবি: আন্তর্জাল

মানব জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবন। জীবন তার সকল মাধুরী নিয়ে এই সময়ে আবির্ভূত হয়।

১৯৯২ সনের এপ্রিল মাস। আমি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন। মাত্র বছর খানেক পূর্বে ১৯৯১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর সরকারিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। আমি এসেছি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায়। জাতিসংঘের United Nations Missions Transitional Authority in Cambodia (UNTAC) এর অধীনে সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে। শুধু আমি নই আমার কোর্সের অনেক অফিসার এসেছে এই মিশনে। ক্যাপ্টেন হিসেবে। সামরিক পর্যবেক্ষক, মাইন ক্লিয়ারিং টিম এবং জাতিসংঘ মিশনে সর্বপ্রথম নিয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের সদস্য ক্যাটাগরিতে।

সামরিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমার বদলী হয়েছে কম্বোডিয়ার উত্তর-পূর্ব সীমান্তে। লাওস সীমান্তের কাছে। কম্বোডিয়ার এই প্রদেশের নাম স্টুং ট্রেং। মেকং নদীর পূর্ব ও পশ্চিম তীর জুড়ে স্টুং ট্রেং প্রদেশ বিস্তৃত। ঠিক যমুনা নদীর পূর্বতীরে অবস্থিত আমার জন্মস্থান জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ থানা ও পশ্চিম তীরে অবস্থিত বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি থানার মত। আমার কর্মস্থল স্টুং ট্রেং শহরের বিপরীত দিকে মেকং এর পশ্চিম তীরে অবস্থিত থালা বারিভাত নামক জেলা সদরে।

আমি যেখানে থাকি সেই জায়গাটা সমতল হলেও সীমান্তের কাছাকাছি এলাকাটি পাহাড়ি অঞ্চল। শেরপুর জেলার গারোপাহাড়ের মত। এই অঞ্চলে ভিরাচে ন্যাশনাল পার্ক (Virachey National Park) নামে বিস্তৃত পাহাড়ি বনাঞ্চল আছে। এই বনাঞ্চল বিস্তৃত হয়ে উত্তরে লাওসের বিশাল পাহাড়গুলোর সাথে মিশে গেছে। অনেকটা ভারতের আসামের মেঘালয়ের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের গারো পাহাড়ে মিলে যাবার মত। লাওসের ভেতরে এই বনাঞ্চলের নাম ডং হুয়া সাও সংরক্ষিত বনাঞ্চল (Dong-Hua-Sao National Bio-Diversity conservation Area)। আমার অবস্থান হতেই ঈশান কোনে বিস্তৃত সারি সারি নীলাভ রিজলাইন দেখা যায়। ঠিক যেমন আমার শৈশবে আমাদের জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ থানার কুমারপাড়া গ্রামের বাড়ির উত্তর প্রান্ত হতে দিগন্তের ওপারে গারো পাহাড়ের দিগন্ত বিস্তৃত রীজ লাইন দেখা যেত।

এই পাহাড়ি এলাকার কিছু পশ্চিম দিয়ে মেকং নদী সীমান্ত অতিক্রম করে লাওসের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে পাকসে (Pakse) নামক স্থানে থাইল্যান্ড-লাওস সীমান্ত বরাবর উত্তর দিকে মায়ানমার সীমান্তের দিকে চলে গেছে। আমি আসলে বর্ণনাটি দিলাম উল্টো দিক হতে। আসলে তিব্বতের মালভূমি হতে সৃষ্ট হয়ে মেকং নদী চীন, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম অতিক্রম করে চীন সাগরে পতিত হয়েছে।

থালা বারিভাত মেকং নদীতীরের এক নিঃশব্দ জনপদ। নদীর কূল ঘেষে একটা মাটির রাস্তা উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হয়েছে। এই রাস্তার পাশে চৌকির উপরে স্থাপিত একটা কাঠের তৈরি বাড়িতে আমাদের বসবাস। আমাদের বলতে আমি ছাড়া আরও ৬ জন। অস্ট্রিয়ার লেফটেন্যান্ট পিটার সিন্টলার, আয়ারল্যান্ডের মেজর ডিয়ারম্যুইড, ফ্রান্সের মেজর বারট্রান্ড, ব্রিটেনের ক্যাপ্টেন মাইক, চীনের ক্যাপ্টেন শি এবং আমাদের কম্বোডিয়ান দোভাষী নারা। ছবি (Sovy) নামের একটা মেয়ে আমাদের খাবার রান্না করে দিয়ে যায়। তবে সে অনুপস্থিত থাকলে কোন কোন দিন থালা বারিভাত-স্টুং ট্রেং খেয়াঘাটে একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করি। রেস্টুরেন্টের মালিক একজন মহিলা। জন্মস্থান লাওসের পাকসে এলাকা। মহিলার স্বামী যুধ্যমান অন্যতম ফ্যাকশন বা দল CPAF (Cambodian People's Armed Forces ARMED) এর হোমরাচোমরা ব্যক্তি।এই এলাকায় এই দলেরই প্রাধান্য বেশি। তাকে বিবাহ করে তিনি চিরতরে এখানে চলে এসেছেন। আর কখনই কখনই আর লাওসে ফিরে যাননি।

ছবি: আন্তর্জাল

অনেকটা যমুনার ওপার চিলমারী থেকে আসা আমার দাদার সৎ মা’র মত। আমি কখনই চিলমারীর সঙ্গে আমাদের এলাকার মানুষের যোগাযোগ হতে দেখিনি। দাদার এই মা’কে আমরা ডাকতাম জেঠী বলে। তাকে আমি কোনদিন কোথাও বেড়াতে যেতে দেখিনি। আমৃত্যু। বেড়ানো নিয়ে কোন প্রসঙ্গও তিনি কখনোই উত্থাপন করেননি। বিষয়টা নিয়ে আমি তাকে কখনো কাঁদতেও দেখিনি। শুধুমাত্র যখন আমাদের বাড়ির একমাত্র রেডিওতে নিদাঘ দুপুরে ফেরদৌসি রহমানের সকরুণ সুর ‘ওকি গাড়িয়াল ভাই... হাঁকাও গাড়ি তুই চিলমারীর বন্দরে...’ গানটা বেজে উঠত! শুধুমাত্র এই সময়টাতেই জেঠিমার চোখের কোণটা ছলছল করে উঠত। আমাদের বাড়িতে বর্ষাকালে ব্যবহারের জন্যে একটা কাঠের ডিঙি নৌকা ছিল। কেউ একজন শখ করে ডিঙি নৌকার একপাশে আলকাতরার ওপরে সাদা রঙ দিয়ে একটা বিশাল চোখ এঁকেছিল। এই চোখের ওপরে যখন বৈঠার জল ছিটকে পড়ত, তখন আমি স্পষ্ট দেখতে পেতাম আঁকা সেই চোখের কোণায় জল!

দুই কিশোরী মেয়েকে নিয়ে রেস্টুরেন্ট চালান লাওসের মহিলা। মেয়ে দুটো ভীষণ প্রাণবন্ত। চঞ্চল প্রকৃতির এবং মুখরা। ভীষণ অতিথিপরায়ণ। আমরা ছাড়া এই হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করে ইটালিয়ান এক পুলিশ সদস্য।ইংরেজি বলতে পারে না। তবে কম্বোডিয়ার খেমার ভাষা শেখার চেষ্টা করছে। মূল কারণ সম্ভবত কিশোরী মেয়ে দুটির প্রতি অব্যাখ্যাত কোন আকর্ষণ। মেয়ে দুটোর মা প্রায়শই আমাকে আর আমাদের দোভাষী নারাকে নদীর তীরে দাঁড়িয়ে দূরের অস্পষ্ট লাওস দেখায়। বলে ছবির মতন সুন্দর দেশ লাওস। মেকং নদী সেখানে বয়ে চলেছে খরস্রোতা তটিনীর মতন। চুনা পাথরের পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে। সীমান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মা’র চোখগুলো অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। সেসময়ে মেয়েদের মুখও ম্লান হয়ে যায়। আমি নারাকে বলি, ‘আমি যখন প্রথমবার ছুটিতে যাবো, তখন আমি প্রথম লাওসে বেড়াতে যাব। ওখানকার অনেক ছবি তুলে আনব।’

কয়েক মাস পর আমার সত্যিই ছুটি জমে যায়। বেশ কয়েকদিন। এই ছুটিকে জাতিসংঘের ভাষায় বলা হয় CTO বা Compensatory Time Off। আমাদের দেশের সাময়িক ছুটির মত। আমি কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন হয়ে জাতিসংঘের প্লেনে করে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক। সারাদিন ঘুরে বেড়ানো। রবিন্সন মার্কেট। এটিএম মার্কেট। রোজ গার্ডেন। সন্ধ্যের পর বাসে করে যাত্রা। লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনের উদ্দেশ্যে। সারারাত লাগবে লাওস সীমান্তে পৌঁছতে। আমার পাশের সিটে লাওসের এক মেয়ে। কিশোরী। ব্যাংককে চাকুরি করে। সপ্তাহ শেষে লাওসে ফিরে যায়। আমি লাওসে যাচ্ছি শুনে খুব খুশি। বলে, ‘লাওস থাইল্যান্ডের মতন ধনী দেশ না, তবে অনেক সুন্দর।লাওসের মানুষজনও খুবই সহজ সরল। আর অতিথিপরায়ণ।’

সারারাত ধরে আলোআঁধারির ভেতরে বাস চলতে থাকে।প্রতিটা আসনেই একটা করে কম্বল দেয়া আছে। বাইরে হাল্কা শীত। আধো ঘুমের ভেতরে আমার মনে হয় সারাটা পথই একটা অবিচ্ছিন্ন আলোকিত নগরের মধ্য দিয়ে পথ চলছি। উজ্জ্বল স্ট্রিট লাইট এবং রাস্তার পাশে একটু পর পর নতুন কোন শহর বা উপশহরের উপস্থিতির কারণে।

সকালের দিকে বাস থামল। মেকং নদীর দক্ষিণ তীরে। থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী শহর নংখাই’তে আমাদের এলাকার ঝাড় কাটা নদীর মতন প্রশস্থ। নদীর বুকে অনেকগুলো রঙিন ইঞ্জিন বোট। মাত্র কয়েক মিনিটের জলযাত্রা। অতঃপর লাওস সীমান্ত। থাইল্যান্ড এবং লাওসের মধ্যবর্তী সীমান্তরেখা মেকং এর তীর ঘেঁষে প্রথমে পশ্চিম থেকে পূর্বে, তৎপরবর্তীতে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে যেয়ে কম্বোডিয়ার STUNG TRENG প্রদেশের ভেতরে প্রবেশ করেছে। যেখানে আমার বর্তমান বাস! নদী পার হলেই লাওস। সকালের নরম আলোতে মেকং নদীর ওপাড়টাকে মনে হচ্ছে স্বপ্নের দেশ। লম্বা একটা রঙিন নৌকায় করে নদী পার হলাম। অনেকটা রূপকথার ময়ুর পঙ্খীর মত দেখতে।

আমার ভেতরে নেশাগ্রস্ত অবস্থা। জীবনে ইতিপূর্বে কখনই ভ্রমণ করা হয়নি। সারাজীবন যদি এভাবে ঘুরে বেড়ানো যেত!

‘ইচ্ছে জাগে, মেষপালকের বেশে ঘুরিফিরি;
অরণ্যের অন্ধকার আদিম সর্দার সেজে মহুয়ার মাটির বোতল
ভেঙ্গে উপজাতি রমণীর বল্কল বসন খুলে জ্যোৎস্নায় হাঁটু গেড়ে বসি।’ – কবি আবুল হোসেন

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই