ভেতরে সবার সমান কালো

ভেতরে সবার সমান কালো

প্রকাশিত: ১৭:৪৬ ৩ জুন ২০২০   আপডেট: ০৩:৫৪ ৪ জুন ২০২০

কর্ম-পরিচয়ে মনদীপ ঘরাই একজন সরকারি কর্মকর্তা। লেখালেখিও করেন। করেন আরো অনেক কিছু। যার অধিকাংশই উল্লেখযোগ্য। এবার কোনো প্রকারের সরকারি অনুদান ছাড়াই তৈরি করেছেন ‘আমার ইউপি’ অ্যাপ। যার মাধ্যমে যে কোনো নাগরিক জানতে পারবেন ইউনিয়ন পরিষদের সব তথ্য।  এমন অসংখ্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে তার

সামাজিক আলোতে এসে আমরা সবাই বলি- বর্ণবাদ ঘৃণা করি। যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ হত্যাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া বিক্ষোভেও সবাই পক্ষ নিয়েছি নিহতের এবং কৃষ্ণাঙ্গদের।

অনেকের মন ছোঁয়া স্ট্যাটাস দেখে একটা প্রশ্ন মনে হলো, সাদাদের কথা বাদ দেই, আমাদের সমাজের কী সম্পূর্ণরূপে বর্ণবাদ মুক্ত? নিশ্চয়ই এ প্রশ্নের জবাব চিৎকার করে দেবেন, ‘অবশ্যই’

আমি কোনো পক্ষ নেবো না, কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টাও করবো না। শুধু চারপাশের কিছু ঘটনা আর ধারণা তুলে ধরবো সামনে। পত্রিকার পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনের কথা মনে আছে? সোশ্যাল মিডিয়া স্রোতের ঠিক আগের জামানায় বিয়ের জন্য পাত্রী প্রত্যাশীদের জন্য ওটাই ছিল সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বিজ্ঞাপনগুলোর প্রায় সবকটাতেই ফর্সা, সুন্দরী পাত্রী চাই কথাটা লেখা থাকতো। আত্মীয়দের বিয়ের আলোচনায় বয়স্কদের বলতে শুনেছি
‘মেয়ে ফর্সা তো?’

বিপুল জনগোষ্ঠীর এই মানসিকতার বীজ হয়তো ঔপনিবেশিক শাসনের কোনো মনস্তাত্বিক প্রভাব বলে এড়িয়ে যাবেন অনেকেই। তবে, দু’শ বছরের ভুত ঘাড় থেকে না নামানোর দায়টা সমাজেরও কম নয়।

এবার আসি অন্য গল্পে। ফর্সা হবার ক্রিম ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির নাম কে না জানে? এর আবিষ্কার কিন্তু সাদা চামড়ার মানুষরা করেনি। ১৯৭৩-৭৫ সালে হিন্দুস্তান লিভারের গবেষণার ফল এই ক্রিম। প্রতিবেশী দেশ ভারতে আবিষ্কৃত এই রঙ ফর্সাকারী ক্রিম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় আমাদের এশিয়া মহাদেশে। এই পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখলে মনে হবে, জগতে গায়ের রঙ শ্যামলা কিংবা কালো হওয়া পাপ পর্যায়ের ব্যাপার। ফর্সা হওয়ার ঝলমলে স্বপ্নে বিভোর আমাদের সমাজের লাখো তরুণী। এর পেছনে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি একটুও কি দায়ী নয়?

খুব ঠাট্টার ছলে ক্লাসের কালো বন্ধুটাকে ‘কাইল্যা’ বলে ডাকতে দ্বিধা করে না আমাদের স্কুল কিংবা কলেজের ছেলে মেয়েরা। ক্লাসের ওই ছেলেটিরও মন খারাপ হয়। হয়তো খেলার ছলে বন্ধুদের বলেও বসে। তবে, এটাকে এতই স্বাভাবিক ঘটনা বলে আমরা মেনে নিয়েছি যে, এই লেখাটা পড়েও অনেকে বলবেন, ‘তাতে হয়েছেটা কী?’

হয়তো কিছুই হয়নি, আবার অনেক কিছুই হয়েছে। আমাদের এক জনৈক ক্রিকেট ধারাভাষ্যকার একবার ক্রিকেটার এনকালার কথা বলেছিলেন, ‘তিনি নামেও কালা, দেখতেও কালা!’ এই বক্তব্যগুলো খুব স্বাভাবিক কি?

ইদানীং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় পড়ছে। ফার্মগেটের রাস্তায় বের হলে প্রায়ই এদের দেখা যায়। ওরা নিজেদের মতোই বাজার করে, নিজেদের মধ্যে কথা বলে। আর প্রায়ই রাস্তার মানুষের বর্ণবাদে দুষ্ট মন্তব্য কানে আসে। যদি ওরা বাংলা বুঝতে পারতো, নির্ঘাত কষ্ট পেতো।

শেষ করার সময় হয়েছে। আমরা তো পশ্চিমা সাদা নই। তাতেও আমাদের সমাজের এই ঘটনাগুলো ভাবিয়ে তোলে। কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার বিপক্ষে অবস্থান নিতে যখন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন, মন থেকে একেবারে সব কলুষগুলো বের করে দিন সেই সঙ্গে। কালো শব্দটা অনেকাংশে নেতিবাচক করে রেখেছে এই জগতের সবাই। কেউ ভালো কিছু করলেই বলি, সাদা মনের মানুষ। আর শোকের আর অন্ধকারের রঙ কালো।

একটা গানের দুটো লাইন দিয়ে শেষ করি...
‘কালো কালো করিস না লো 
ও গোয়ালের ঝি
আমায় বিধাতা গড়েছে কালো
আমি করবো কী!’

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/