ভূস্বর্গে যুদ্ধের দামামা, সমাধান কোথায়?
Best Electronics

ভূস্বর্গে যুদ্ধের দামামা, সমাধান কোথায়?

প্রকাশিত: ১২:৪৪ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

ভারত ফুটছে। চারিদিকে একটাই রব– বদলা চাই। গুঁড়িয়ে দেয়া হোক পাকিস্তানকে। এমন সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবে না। 

অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া পাকিস্তানকে আজ সন্ত্রাসবাদীদের টাকায় দেশ চালাতে হচ্ছে। কাজেই সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করার এমন সুযোগ যে ভারত আর পাবে না তা বলাই বাহুল্য। আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তান আজ একঘরে। তাদের একমাত্র বন্ধু চীনও আজ মুখ ঘুরিয়ে নিল। আজ চীনে ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ চীনকে বোঝাতে সক্ষম হলেন যে সন্ত্রাসবাদকে উৎখাত করতে ভারতের এই সার্জিকাল স্ট্রাইক ছাড়া গতি ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরাসরি বলেছেন যে যদি ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করতে আমেরিকা পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকে সার্জিকাল স্ট্রাইক করতে পারে, আমরা সন্ত্রাসবাদীদের হত্যা করতে একই কাজ করলে অন্যায় কোথায়? আসলে সার্জিকাল স্ট্রাইক হল কোনো দেশ যদি বারেবারে অন্য কোনো দেশকে সন্ত্রাসবাদীদের সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য জানিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানায় এবং আবেদন গ্রহণকারী দেশ সে আবেদনে নিশ্চুপ থাকে, তখন আবেদনকারী দেশ অন্যদেশের সাধারণের বা সামরিক ক্ষতি না করে সে দেশের জঙ্গি ঘাঁটিকে সরাসরি আক্রমণ করে। ওসামা বিন লাদেন নিয়ে একই অভিযোগ ছিল আমেরিকার। সামরিক ঘাঁটির পাশে নিশ্চিত জীবন যাপন করছিলেন লাদেন। একটি সার্জিকাল স্ট্রাইকে পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকে লাদেনকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল আমারিকা। আর ভারতের মাথাব্যথা এখন মাসুদ আজাহার। কে এই মাসুদ আজাহার?

১৯৯৩-এ মাসুদ তখন করাচির এক ট্যাবলয়েডের সাংবাদিক। ‘মুক্ত কাশ্মীর’ দাবিকে জোরদার করতে সে বছরই বেশ কয়েকটি দেশে যায় সে। গোয়েন্দাদের দাবি, তখনই আফগানিস্তানে তালিবান এবং আল কায়দার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়ে যায়। ১৯৯৪ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরে পর্তুগিজ পাসপোর্ট সমেত ধরা পড়ে ২৬ বছরের যুবক আজহার। নিজেকে সে সাংবাদিক হিসাবে পরিচয় দিয়েছিল। সেদিক গ্রেফতারির পরেও ভারতীয় পুলিশের কোনও ধারণা ছিল না কে এই আজহার। তবে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর আধিকারিকেরা যত জেনেছেন ততই গায়ে কাঁটা দিয়েছে তাদের। 

জানা গেছে, জঙ্গি গোষ্ঠী হরকত-উল-মুজাহিদিনের কাজকর্ম খতিয়ে দেখতে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই বিশেষভাবে পাঠিয়েছিল আজহারকে। ভালো কথা বলতে পারে, মুহূর্তে সকলকে কথা দিয়ে বশ মানাতে পারে, এটাই ছিল তখন মাসুদ আজহারের ক্ষমতা। তবে পাঁচ বছর ভারতের জেলে বন্দি হয়ে থাকতে হয়েছিল আজহারকে। পরে ১৯৯৯ সালে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান অপহরণ করে আফগানিস্তানের কান্দাহারে নিয়ে যায় আজহারের ভাই মহম্মদ রউফ। এই কাজে তাকে সঙ্গত দিয়েছিল আইএসআই। এর বদলে আজহারকে ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল তৎকালীন বাজপেয়ী সরকার। এরপরই পাকিস্তানে ফিরে জঈশ-ই-মহম্মদ নামে জঙ্গি সংগঠন তৈরি করে মাসুদ আজহার। এবং ২০০১ সালে ভারতীয় সংসদে জঙ্গি হামলা জঈশেরই মস্তিষ্ক প্রসূত। তারপর থেকে আইএসআই-এর সাহায্যে পাকিস্তানে ক্রমাগত শক্তিসঞ্চয় করে গিয়েছে জঈশ ও আজহার। এর মধ্যে হরকাতুল মুজাহিদীনের অধিকাংশ সদস্যই মওলানা আজহারকে অনুসরণ করে নতুন দল জইশ-ই-মুহাম্মদে যোগ দেয়।

এদের কীর্তি কী কী? ভারতের সংসদ ভবনে লস্কর-ই-তৈয়বার সঙ্গে একযোগে জইশ-ই-মুহাম্মদের হামলা।মার্কিন সাংবাদিক ড্যানিয়েল পার্ল হত্যা। নিউ ইয়র্কে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা। গত কয়েক মাস ধরেই জইশ-ই-মহম্মদ প্রধান মাসুদ আজহারের অসুস্থ থাকার খবর প্রকাশ্যে আসছিল। পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জিহাদি সংগঠন ইউজেসি বা ‘ইউনাইটেড জিহাদ কাউন্সিল’-এর বৈঠকেও নাকি দেখা যাচ্ছিল না। অথচ তারই নির্দেশে কাশ্মীরে ভয়াবহ হামলা হল। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর গাড়িবহরে জঙ্গি হামলায় ৪০ জন নিহত ও অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের সবাই ভারতের কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) সদস্য। এই হামলার ঘটনায় কাশ্মীর ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জঈশ-ই-মহম্মদের আদিল মোহাম্মদ নামের এক হামলাকারীকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। গত বছর তিনি জঈশ-ই-মহম্মদে যোগ দেন। জঙ্গি সংগঠন জঈশ-ই-মহম্মদের আদিল মোহাম্মদ নামের সন্দেহভাজন এক হামলাকারী বিস্ফোরকবোঝাই একটি গাড়ি চালিয়ে সিআরপিএফের একটি বাসে সজোরে ধাক্কা মারে। বিস্ফোরণের পর গাড়িটি সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৪০ জওয়ান নিহত হন, আহত ৪১। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে উরি হামলার পর থেকে এটাই সবচেয়ে বড় হামলা। সেবার আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে সেনা ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। সেবারের ওই হামলায় ১৭ সেনা নিহত হন। বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডিতে পাক সেনার হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে মাসুদ আজহারের। গত চার মাস ধরেই সেখানে ভর্তি সে। পুলওয়ামায় হামলার আট দিন আগে একটি অডিও মেসেজ শোনা যায় মাসুদ আজহারের গলায়। ভাইপো উসমানের মৃত্যুর বদলা নেওয়ার বার্তা শোনা গিয়েছিল তার গলায়। সংগঠনের কর্মীদের সে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলে, ‘কেউ বলবে জঙ্গি হামলা, কেউ বলছে শান্তির পথে বাধা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সীমান্ত পার করে হামলা চালাতেই হবে।’

এই ঘটনাই তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার জন্ম দিল আপামর ভারতবাসীর মনে। পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদীরা বারেবারে ভারতের ওপরে আক্রমণ চালাবে আর ভারত সরকার সংযম দেখাবে তা কী করে হয়? চারিদিকে রব উঠল প্রতিশোধ, প্রতিশোধ। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখা ভাল। ভারতের প্রতিটি মানুষ সে যে প্রদেশেরই হোন, যে ধর্মেরই হোন, যে সামাজিক অবস্থানেরই হোন, যে রাজনীতিরই হোন দেশের প্রশ্নে আগে তারা সবাই ভারতীয়। অন্যদেশের ব্যাপারে তারা এককাট্টা। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর ওপরে চাপ তুমুল হয়েছিল। তিনি প্রথমেই সেনাবাহিনীকে যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার স্বাধীনতা দিলেন। পাকিস্তানকে দেয়া 'সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের (এমএফএন)' তকমা প্রত্যাহার করে নিলেন। একই সঙ্গে পাকিস্তান থেকে আমদানি পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে এক ধাক্কায় ২০০ শতাংশ করে দিলেন। এরপরে মঙ্গলবার ভোরে হল এয়ার সার্জিকাল অ্যাটাক। কাকভোরে ভারতের গোয়ালিয়র বিমান ঘাঁটি থেকে উড়ল ১২ টি মিরাজ ২০০০ যুদ্ধবিমান। লক্ষ্য পাকিস্তানের জইশ-ই-মুহাম্মদ, হিজবুল্লাহ মুজাহেদীন ও লস্কর-ই-তায়েবার প্রশিক্ষণ শিবিরগুলিকে ধ্বংস করা। মাত্র বাইশ মিনিটের মধ্যে ১০০০ কেজি বোমা লক্ষ্যে ফেলে তারা শিবিরগুলি ধ্বংস করে তিনশ জঙ্গিকে নিকেশ করে নিরাপদে ফিরে আসে নিজেদের ঘাঁটিতে। এবারে চাপে পড়ে পাকিস্তান। সেনাদের চাপে পাক প্রধান ইমরান খান আজ বুধবার সকালে পাঠালেন আধুনিক এফ ১৬ যুদ্ধবিমান। তাদের তাড়াতে ভারতের পক্ষে উড়ল মিগ ২১ যার এ বছর থেকে বায়ূসেনাদের যুদ্ধবিমান হিসেবে আর না থাকার কথা। সেই বিমান উড়িয়ে দিল এফ-১৬ কে। একটি মিগ ২১ ও ভেঙে পড়ল যার পাইলট এখন পাকিস্তানের কব্জায়। তার ছবি প্রকাশ করল পাকিস্তান যেখানে স্পষ্ট যে সেই পাইলটের ওপরে শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে অর্থাৎ পাকিস্তান তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ এর নীতি ভেঙেছে যা আন্তর্জাতিক অপরাধ।

বিশ্বের প্রায় সকল রাষ্ট্র আরব রাষ্ট্রসহ সবাই ভারতের পক্ষে। কাজেই জট ক্রমে পাকিয়ে যুদ্ধের দিকে চলেছে। বুধবার বিকেলে পাক প্রধান সুর নরম করলেও সন্ধ্যায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপরে সব স্বাধীনতা দিয়ে দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন ভারতের মানুষ কী চাইছেন? যাই হোক পাকিস্তানের মেরুদণ্ড ভেঙে গুঁড়িয়ে অধিকৃত কাশ্মীর দখল করে নাও। আরো তারা চাইছেন সংবিধানের ৩৭০ ধারা তুলে নাও। এই ৩৭০ ধারা কী? সহজে বলছি। কাশ্মীরে কাশ্মীরি বাদে অন্য কেউ জমি কিনতে পারবেন না। ফলে অন্যরাজ্যের বাসিন্দারা কাশ্মীরে কোন ব্যবসা বা শিল্প গড়তে পারেন না। ফলে সরকারি চাকরি ছাড়া অন্য চাকরি করতে গেলে তাদের রাজ্য ছাড়তে হবে। তাদের চাল, বিদ্যুৎ অতি অল্প দামে সরকার থেকে দেওয়া হয়। কাজেই তাদের পেট চলে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সার্বিক দৈনন্দিন জীবনের মান বাড়ছে না। কাজ নেই, অতএব সামান্য টাকার বিনিময়ে জঙ্গিদের নির্দেশমত তারা পাথর ছুঁড়ছে আড়াল থেকে সামরিক বাহিনীর ওপর। এই যে জইশ জঙ্গি যে এতজন আধা সামরিক লোক মারল, তার সম্পর্কে বলা হচ্ছে  স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা একবার আদিলকে হেনস্তা করেছিল।  আদিলের সহিংস হওয়া এবং প্রাণদানের পেছনে সামরিক বাহিনীর এই আচরণ দায়ী।  

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। সেই সময় থেকে কাশ্মীরিদের ওপর ভারতীয় বাহিনীর নৃশংসতা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৬ সালে হিজবুল মুজাহিদীন কমান্ডার ও বিদ্রোহী নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মীরে বড় ধরনের বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। গত বছর কাশ্মীরে অন্তত ১৬০ বেসামরিক নাগরিক, ২৬৭ সন্ত্রাসবাদী ও ১৫৯ সেনা সদস্য নিহত হয়। কিন্তু বাস্তব কী বলে? তথ্য বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাচ্ছে যে কাশ্মীরে সন্ত্রাস হচ্ছে। আর কে না জানে যে এই সন্ত্রাসের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা পাকিস্তান। অনেকের ধারনা কাশ্মীরিরা মুসলমান বলে তারা পাকিস্তানের সাথে মিলে যেতে চায়। খুবই ভুল ধারনা। ধর্ম রুটি দেয় না। ওটা অর্জন করতে হয়। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের দুরবস্থার কথা তারা জানেন। কাজেই কোন দুঃখে তারা পাকিস্তানে যাবে? তারা শান্তি চায়। সন্ত্রাসের অবসান চায়। এমন কি তারা কাশ্মীরের স্বাধীনতাও আর চায় না। তারা চায় কাশ্মীরে শিল্প গড়ে উঠুক। শান্তির ভূস্বর্গ হিসেবে পরিচিত হোক কাশ্মীর। আপামর ভারতবাসীর সঙ্গে তাদেরও আজ মনে এই কথাটা বেজে ওঠা উচিৎ যে বারেবারে মরার চেয়ে একবার মরে যাওয়া ভাল।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর

Best Electronics