ভূত-প্রেত, দুষ্ট আত্মা ও রোগ-বালাইয়ের রক্ষাকবচ এই গাছ!

ভূত-প্রেত, দুষ্ট আত্মা ও রোগ-বালাইয়ের রক্ষাকবচ এই গাছ!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৬:৫৮ ২১ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৭:০৮ ২১ ডিসেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

খ্রিস্টান ধর্মের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘ক্রিসমাস’। এই অনুষ্ঠানের বয়স দুই হাজার বছর ছাড়িয়েছে। যুগে যুগে সাম্প্রদায়িক ও অসাম্প্রদায়িক নানা উপায়ে উৎযাপন করা হয়েছে ক্রিসমাসকে।

খ্রিস্টান ধর্মের প্রচারক হিসেবে খ্যাত যীশুখৃষ্টের জন্মবার্ষিকীতে প্রতি বছর এ অনুষ্ঠান পালন করেন ধর্মপ্রাণ খ্রিষ্টানরা। আর এই বড় দিনের বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে ‘ক্রিসমাস ট্রি’। যা সাজানো হয় আপেল, পাখি, মোমবাতি, ঘুঘু, মাছ, ফুল, ফল, স্বর্গদূত আর রংবেরঙের কাগজ ও বাতি দিয়ে। তবে আমরা হয়তো অনেকেই জানি না অথবা জানার চেষ্টাও করিনা- ক্রিসমাস ট্রি’র রহস্য কী? 

নকল ক্রিসমাস ট্রি‘ক্রিসমাস ট্রি’র জন্য যে গাছটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় সেটি হল ফার গাছ। এটি মূলত দেবদারু জাতীয় গাছ। এছাড়া ঝাউ জাতীয় গাছও ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ক্রিসমাস ট্রি সত্যিকারের হতে পারে আবার সেটি কৃত্রিমও হতে পারে। ‘ক্রিসমাস ট্রি’তে আলোর ব্যবহার ছাড়াও বিভিন্ন অর্নামেন্ট দিয়ে সাজানো হয়। এই গাছের ওপরে একটি তারা বা স্বর্গদূত বসানো হয়। এই স্বর্গদূতটি বেথেলহেমে জন্ম নেয়া যিশুখ্রিস্টের প্রতীক।

বড়দিনে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো এবং উপহার দেয়ার শুরু কীভাবে? তার লিখিত কোনো দলিল পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে বিভিন্ন গল্প। এমন একটি গল্প হল রোমের এক গরিব কাঠুরের ঘরে একদিন এক শীতার্ত শিশু হাজির হয়। কাঠুরে দম্পতি ছিল যিশুভক্ত। তারা শিশুটিকে আদর করে খাওয়ালেন, নরম বিছানায় শুতে দিলেন। সকালে ওই শিশু দেবদূতের রূপ ধরে বলল, ‘আমিই যিশু’। তাকে আদর-আপ্যায়ন করার জন্য কাঠুরে দম্পতিকে তিনি একটি গাছের ডাল দিলেন এবং তা মাটিতে পুঁতে রাখতে বললেন। এরপর ক্রিসমাসের দিন দেখা গেল ডালটি সোনালি আপেলে ভরে গেছে। তখন তারা এ গাছের নাম দেন ‘ক্রিসমাস ট্রি’।

বরফাচ্ছন্ন আসল ক্রিসমাস ট্রিখ্রিস্টান ধর্ম প্রচলনের বেশ আগে গল দেশের (এখন ফ্রান্স) মানুষ বরফ পড়া শীতের দিনগুলোতে চিরহরিৎ (চিরসবুজ) গাছগুলো নানাভাবে সাজিয়ে ও গুছিয়ে রাখত। শুধু তা-ই নয়, তাদের ঘরের দরজা-জানালায় ঝুলিয়ে রাখা হতো এসব গাছের ডালপালা। ইউরোপের অনেক দেশে প্রচলিত ধারণাই ছিল ডাইনি, ভূতপ্রেত, দুষ্ট আত্মা, রোগ-বালাইয়ের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে এসব চিরসবুজ গাছ। প্রাচীন রোমানরা কৃষিদেবতার সম্মানে এক ধরণের উৎসব করে থাকত। তাতে তারা নিজের বাড়িঘর আর মন্দিরগুলোকে চিরসুবজ গাছের ডালপালা দিয়ে সাজাত। 

এমনকি ভাইকিংরাও তাদের সূর্যদেবতা ভালদার প্রিয় গাছ হিসেবে বিবেচ্য করত এসব গাছকে। বড়দিনে ক্রিসমাস ট্রির প্রচলনের কৃতিত্বটা দিতে হবে জার্মানদের। ১৬ শতকের দিকে শুরু হয়েছিল এই ধারা। তখন থেকে এই গাছগুলোকে পিরামিডের মতো করে সাজানো শুরু হয়। সে সময়ের এক প্রটেস্ট্যান্ট সংস্কারক মার্টিন লুথার প্রথমবারের মতো মোমবাতি দিয়ে গাছকে সুসজ্জিত করা শুরু করেন। তিনি এতে ছোট ছোট তাঁরাও সংযোজন করেন। থাকত আপেলও।

সাজানো ক্রিসমাস ট্রিআরেকটি গল্প এ রকম, একদিন এক গরিব শিশু এক গির্জার মালিকে কিছু পাইন গাছের চারার বিনিময়ে পয়সা দেয়ার অনুরোধ করল। মালি গাছগুলো নিয়ে গির্জার পাশে পুঁতে রাখল। ক্রিসমাসের দিন ঘুম থেকে উঠে দেখল, গাছগুলো গির্জার চেয়েও বড় হয়ে গেছে এবং সেগুলো থেকে অজস্র তারার আলো ঝরে পড়ছে। মালি তখন গাছগুলোর নাম দিল ‘ক্রিসমাস ট্রি’।

খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ‘ক্রিসমাস ট্রি’র ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে জার্মানির গেইসমার শহরের এক সাধু বনিফেসের সঙ্গে। সেইন্ট বনিফেস (৬৭২-৭৫৪ সালে) একটি প্রাচীন ওক গাছের মূলে একটি দেবদারু জাতীয় ফার গাছ বেড়ে উঠতে দেখেন। তিনি এটাকে যিশুখ্রিস্টের প্রতি বিশ্বাসের চিহ্ন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

ছোট্ট শিশু সাজাচ্ছে ক্রিসমাস ট্রি
ঐতিহ্য অনুসারে, ২৪ ডিসেম্বর ক্রিসমাস সন্ধ্যার আগে ট্রি সাজানো যায় না। আর এটি সরিয়ে ফেলা হয় ১২ তম রাতে অর্থাৎ ৬ জানুয়ারি। আর অনেকেই মনে করেন এই নিয়ম না মানা হলে অমঙ্গল হতে পারে। তবে প্রথাগতভাবে না হলেও এখন ক্রিসমাস ট্রি আরো আগে সাজানো হয়। জার্মানিতে এটা ঐতিহ্য অনুসারে ২৪ ডিসেম্বরে সাজানো হয় এবং ৭ জানুয়ারি খুলে ফেলা হয়। ক্যাথলিকদের রীতিতে এটি জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত সাজিয়ে রাখা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় এটি ডিসেম্বরের শুরুতে সাজিয়ে গ্রীষ্মের ছুটি পর্যন্ত রাখা হয়।

প্রকৃত ক্রিসমাস ট্রি 

নানা দেশে নানান প্রজাতির গাছকে ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে সাজানো হয়। তবে মূল ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে বিবেচনা করা হয় পিসিয়া এবিইস নামক গাছকে। এই  গাছটির আদি নিবাস ইউরোপ। তাই গাছটিকে সাধারণভাবে বলা হয় ইউরোপিয়ান স্পরোউস। অনেক সময় একে নরওয়ে স্পরোউসও বলা হয়। গ্রিক শব্দ পিসসা থেকে গাছের নাম পিসিয়া গৃহীত হয়েছে। তবে শব্দটি সাধারণভাবে ইউরোপে পিসিয়া বলতে পাইন গাছকে বোঝায়। আর এবিইস হলো ফার জাতীয় গাছের সাধারণ নাম। এটি একটি দ্রুত বর্ধনশীল চিরোসবুজ বৃক্ষ। যা লম্বায় প্রায় ৩৫ থেকে ৫৫ মিটার (১১৫-১৮০ ফুট) হয়ে থাকে। এদের পাতা সুঁচের মত। পাতার রং গাঢ় সবুজ।   

বিভিন্ন আলোকসজ্জায় সাজানো ক্রিসমাস ট্রি ক্রিসমাস ট্রি জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে পুরো কৃতিত্ব যুক্তরাজ্যের রানি ভিক্টোরিয়ার। ১৮৪৮ সালের বড়দিনের আগে রানি তার স্বামী জার্মান প্রিন্স অ্যালবার্টকে আবদার ধরে বলেন, ছেলেবেলায় বড়দিনে যেভাবে গাছ সাজানো হতো সেভাবে যেন তিনি এবার একটা গাছকে সাজান। প্রিন্স অ্যালবার্ট জার্মান স্টাইলে সবুজ একটা গাছকে বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি, মোমবাতি ও অলংকার দিয়ে সাজালেন। সেই গাছের ছবি লন্ডনের বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হলে যুক্তরাজ্যে ও যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চবিত্তদের মধ্যে ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। 

নিরাপদ আলোকসজ্জার জন্য ১৮৮২ সালে টমাস আলফা এডিসনের সহযোগী এডওয়ার্ড জনসন ক্রিসমাস ট্রিতে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা করেন। এরপর থেকে মোমবাতির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবহার শুরু হয়। ১৮৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২৩তম প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন হ্যারিসনের আমলে প্রথমবারের মতো হোয়াইট হাউসে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হয়। এরপর থেকে যতই দিন গেছে ততই ক্রিসমাস ট্রি বড় দিনের মূল আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস