Alexa ভাষা আবিষ্কারের কাহিনী

ভাষা আবিষ্কারের কাহিনী

সালমান আহসান নাঈম  ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৩৫ ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কাল আপনি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে যাবেন। মনে মনে কল্পনা করছেন, লাবণি পয়েন্টে সমুদ্রস্নানে নেমেছেন। বিশাল ঢেউ আপনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আপনি আনন্দসাগরে অবগাহন করছেন।

এখন ভাবুন তো ভাষা যদি না জানেন তাহলে আপনি চিন্তা করবেন কীভাবে? ভাষা ছাড়া চিন্তা বা কল্পনা করা যায় না। এমনকি স্বপ্ন দেখতেও ভাষা দরকার। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, মাতৃভাষাযই মানুষকে সহজে চিন্তাভাবনা করতে শেখায়। মাতৃভাষাতেই মানুষ সবচেয়ে সহজে কল্পনা করতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে। যার চোখে স্বপ্ন নেই, যার কল্পনা শক্তি নেই, তার জীবন প্রায় অর্থহীন হয়ে যায়।

আমরা ছোটবেলা থেকেই মায়ের মুখে গল্প, ছড়া, গান শুনে শুনে মাতৃভাষায় দক্ষ হয়ে উঠি। যখন আমাদের বয়স হয়তো এক মাসও না তার আগে থেকেই মায়ের কোলে, মায়ের হাসি সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে। মা আমাদের অনেক ছবির বই চোখের সামনে রেখে রূপকথার গল্প শোনান। এভাবে আমরা কল্পনার জগতে চলে যাই। সবই মাতৃভাষার কল্যাণে।

আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ পেডিয়াট্রিকসের গৃহীত নীতিনির্ধারণী অবস্থানে বলা হয়েছে, জন্মের পর থেকেই পড়াশোনার বিষয়টি প্রাথমিক শিশু পরিচর্যার অংশ হওয়া উচিত। ‌এর অর্থ, খুব ছোট বাচ্চাদেরও বই পড়ে শোনানোর গুরুত্ব সম্পর্কে মা-বাবাদের সচেতন হতে হবে। শিশুর বয়স দেড় থেকে দুই মাস হলে তার চোখের সামনে ছবির বই ধরে রেখে ছড়া ও গল্প পড়ে শোনানোর তাৎপর্য গভীর। গবেষণায় দেখা গেছে, এই বাচ্চারা বড় হয়ে অনেক বেশি চৌকস ও বুদ্ধিদীপ্ত হয়।

বিস্তৃত পরিসরে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, বইয়ের সংস্পর্শে ও বই পড়ে শোনানোর মধ্য দিয়ে বড় করে তোলা শিশুরা পরে সহজে ভাষা শেখে ও স্কুলে বড় বড় সাফল্য অর্জন করে। পেডিয়াট্রিক্স জার্নালে ২০১৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানা গেছে, যেসব শিশুর বাসায় বেশি বই আছে এবং শিশুকে বেশি বই পড়ে শোনানো হয় তাদের মস্তিষ্কের বাঁ অংশ উল্লেখযোগ্য হারে সক্রিয় হয়ে ওঠে। পেরিয়েটাল-টেম্পোরাল-অক্সিপিটাল অ্যাসোসিয়েশন কর্টেক্স নামে অভিহিত মস্তিষ্কের এই অংশে শব্দ ও চোখে দেখার অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটে। একটু বড় শিশুরা জোরে শব্দ করে পড়লে মস্তিষ্কের এই অংশ উদ্দীপিত হয়।

শিশু চিকিৎসাবিদেরা লক্ষ করেছেন, খুব ছোট বাচ্চাদের বইয়ের গল্প পড়ে শোনালেও একইভাবে মস্তিষ্কের এই অংশ উদ্দীপিত হয়। মায়ের মুখে গল্প শোনার সময় বাচ্চারা মনে মনে কল্পনার জাল বোনে। যেমন মা বললেন, ‘বাগানে একটা হরিণ এসেছে সে তোমার সঙ্গে কথা বলতে চায়।’ সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চা তার মনে একটা সুন্দর হরিণের চিত্র এঁকে ফেলে। শুধু তাই নয় হরিণের সঙ্গে কথা হবে শুনে তার মনের আনন্দের শিহরন বয়ে যায়।এভাবে কথার সঙ্গে কল্পনার একটা যোগসূত্র স্থাপনের দক্ষতা অর্জন করে।

এখানে একটা কথা বলা দরকার। আমরা যদি শিশুকে গল্প পড়ে না শুনিয়ে শুধু ভিডিও দেখাই, তাহলে শিশু কল্পনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। সারাক্ষণ ভিডিও স্ক্রীনে চোখ রেখে শুধু একের পর এক দৃশ্য দেখে যায়। নিজের কিছু করার থাকে না। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, নতুন প্রযুক্তির যুগে ঘরে ঘরে আধুনিক ফ্যাশন হিসেবে এটাই ঘটে চলেছে। মনে রাখতে হবে বইয়ের গল্পে অনেক বেশি ও নতুন শব্দ থাকে। তাই গল্প পড়ে শুনালে বাচ্চাদের শব্দভাণ্ডার ও কল্পনা শক্তি বাড়ে। এরা স্কুলে বেশি মেধার পরিচয় দেয়। (সূত্রঃ নিউইয়র্ক টাইমস)
 
আমরা যে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে মাতৃভাষার জন্য বুকের রক্ত দিয়েছিলাম সেটা মূলত এজন্যই। মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত হলে আমরা বোকাসোকা একটা জাতিতে পরিণত হতাম, বিশ্বে আমাদের কোনো মর্যাদা থাকতো না।

মানুষ ভাষা আবিষ্কার করল কীভাবে?
ভাষা একদিনে আবিষ্কার হয়নি। এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে মানুষ ভাষা আয়ত্ত  করেছে। আদিম যুগে মানুষ বনে মূলত ফলমূল, লতাপাতা খেয়ে থাকত। এরপর শিকারি যুগের মানুষ দেখল ভাষা ছাড়া জীবন চলে না। সবাই দল বেঁধে শিকারে যেত এবং পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালাত। সামনে থাকত দলনেতা। অন্য সদস্যরা কে কোথায় অবস্থান নেবে সেটা আগে থেকেই বুঝিয়ে দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু ভাষা ছাড়া কাউকে কিছু বোঝানো সম্ভব নয়। এজন্য গুহাচিত্রের প্রথা চালু হলো।

প্রথমদিকে গুহার গায়ে ছবি একে সবাইকে বুঝিয়ে দেয়া হতো শিকারে কার  অবস্থান কোথায় হবে। পরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধ্বনির সাহায্য মনের ভাব প্রকাশ করা শুরু হলো। কিন্তু এই ধ্বনিগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। অর্থ বুঝানোর জন্য দরকার শব্দ ও বাক্য। এই কাজটাও সম্পন্ন হয় শিকার করার সময় প্রয়োজনের তাগিদে। বিভিন্ন ধ্বনির অর্থবহ সমন্বয়ে শব্দ আবিষ্কারের পর মানুষ কিছু শব্দ যোগ করে বাক্য গঠন করতে শিখলো। এভাবেই ভাষার আবিষ্কার।

শিশুও কী পড়তে পারে?
প্রথমে মনে হয় অবিশ্বাস্য! কিন্তু এটা সত্যি যে ছয় মাস বা কয়েক বছর বয়সের শিশুরা পড়তে পারে তবে একটু ভিন্নভাবে। ওরা পড়ে মায়ের মুখে ছড়া বা গল্প শুনে। এটাও এক ধরনের পড়া। তবে আসল কথা হলো এই পড়া মাতৃভাষায় হতে হবে। না হলে ওরা কিছুই বুঝবে না। এ ধরনের পড়াও  যে পড়া সেটা বোঝা যায় যখন আমরা পড়াকে বলি 'পড়াশোনা'। অর্থাৎ শোনাও পড়ার একটা মাধ্যম। মায়ের মুখের পড়াশোনা বাচ্চারা শুধু পড়ে না, মায়ের মুখের প্রকাশভঙ্গি দেখে এবং আবেগ-অনুভূতি দিয়ে পড়ার অন্তর্নিহিত বক্তব্য অনুধাবন করে। 

এখানে মাতৃভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পড়ে শোনানোর মধ্য দিয়ে শিশুরা অন্তত চারটি বিষয়ে পারদর্শী হয়ে ওঠে। শিশুর মনোযোগ বৃদ্ধি পায় ফলে তার স্মৃতিশক্তি বাড়ে। মায়ের মুখে গল্প শুনতে শুনতে সে কল্পনায় ছবি আঁকে, এতে তার কল্পনা শক্তি বাড়ে। এভাবে তার ভাষার দক্ষতাও বাড়ে। শিশুদের নিয়ে গবেষণা করেছেন এমন বিজ্ঞানীরা বলেন, এক-দেড় বছরের শিশুদের দিনে ২০ মিনিট পড়াশোনাই যথেষ্ট। ঘুমের সময় ছড়া পড়ে শোনানো অনেক পরিবারে একটি সাধারণ নিয়ম। বই পড়ে শুনতে শুনতেই শিশু বইয়ের ভক্ত হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতে মেধা বিকাশে এটা বড় অবদান রাখে।

মাতৃভাষা ছাড়া কী চলে?
এর উত্তর হলো মাতৃভাষা না শিখে জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করা খুব কঠিন। এমনকি নিজের অস্তিত্ব রক্ষাও কঠিন। একবার রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক কিছু অনাথ শিশুকে একটি প্রাসাদে আলাদা করে রাখার আদেশ দেন। নির্দেশ দেয়া হয় যেন তাদের সামনে কেউ কোনো কথা না বলে বা কোনো আবেগ অনুভূতির প্রকাশ না ঘটায়। তাদের খাওয়া থাকার চমৎকার ব্যবস্থা করা হয়। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল ওরা কোনো ভাষাই জানে না! মনের ভাব প্রকাশও করতে পারে না! এ ধরণের আরো অনেক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ভাষা শুধু মানব জীবনের সৃজনশীল অবদানই নয়। সেটা জীবনের অস্তিত্বের অন্যতম শর্ত। 

মাতৃভাষার গুরুত্ব এখান থেকেই বোঝা যায়। মাতৃভাষা মানুষের সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে বিশেষ অবদান রাখে। মাতৃভাষা সহজে শেখা যায়, এজন্য ব্যাকরন শিখতে হয় না। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিশু চারপাশের জগত সম্পর্কে সার্বিক ধারণা পায়। এরপর দ্বিতীয় কোনো ভাষা শিখতে চাইলে অনায়াসে সেটা সে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা প্রথমে মাতৃভাষা আত্মস্থ করে তারা অন্যদের তুলনায় দ্রুত ও সহজে দ্বিতীয় কোনো ভাষা শিখতে পারে। যেমন, মাতৃভাষা বাংলা ভালোভাবে জানলে সহজে ইংরেজি বা অন্য ভাষায় দক্ষতা অর্জন করা যায়। বিভিন্ন ভাষা জানালে সহজে বিশ্ব জ্ঞানভান্ডারে প্রকাশ করা যায়। এজন্যই বলা হয় জ্ঞান অর্জনের ভিত্তি রচনা করে মাতৃভাষা।

অন্য ভাষা শেখার গুরুত্ব:
মাতৃভাষার গুরুত্ব যেমন বেশি তেমনি অন্য ভাষা শেখারও গুরুত্ব রয়েছে। যেমন একটি বা দুটি বিদেশি ভাষা জানলে নতুন নতুন শব্দ শেখা, নতুন জ্ঞান অর্জন করে প্রত্যহিক জীবনে তার ব্যবহার, কোনো ঘটনা বা অভিজ্ঞতা ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করা দক্ষতা, ভিন্ন ভাষার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়ের সক্ষমতা অর্জন করা যায়। শিশুর আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। এটা তার বড় হয়ে ওঠার জন্য খুব দরকার। মার্কিন কমিউনিটি সার্ভেতে দেখা গেছে সে দেশে পাঁচ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তিদের প্রতি পাঁচজনে একজন ইংরেজি ছাড়াও অন্য ভাষায় কথা বলে। 

যুক্তরাষ্ট্রে একাধিক ভাষা শেখার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা মাতৃভাষার পাশাপাশি আরো অন্তত দুটি ভাষা অনায়াসে শিখতে পারে। একাধিক ভাষা শেখায় তার জ্ঞান অর্জনের দক্ষতা বৃদ্ধি পায়। বর্তমান বিশ্বে মাতৃভাষার পাশাপাশি বিদেশি অন্তত একটি বা দুটি ভাষা শেখা খুব জরুরি।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে

Best Electronics
Best Electronics