ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগমের আত্মত্যাগের অজানা কথা

ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগমের আত্মত্যাগের অজানা কথা

সালাহ উদ্দিন চৌধুরী, সেন্ট্রাল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৯:৫১ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০   আপডেট: ২০:২৬ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগম

ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগম

একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির চির প্রেরণা ও অবিস্মরণীয় একটি দিন। এটি এখন শুধু বাংলাদেশের নয়, সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। তবে বাঙালি জাতির এ গৌরবোজ্জ্বল অর্জন সহজেই আসেনি, অর্জিত হয়েছে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে। এ প্রাপ্তির পেছনে এখনো রয়ে গেছে অনেক অজানা কথা। অজানা ইতিহাস। সেই রকমই একটি ইতিহাস ভাষাসংগ্রামী মমতাজ বেগম। 

ভাষা আন্দোলনের অপরাধে মমতাজ বেগমকে তালাক দিয়েছিলেন তার স্বামী। অথচ ভালোবাসার জন্য হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে হয়েছিলেন মুসলমান। ভালোবাসার টানে কলকাতা থেকে তিনি চলে এসেছিলেন বাংলাদেশে। 

মমতাজ বেগমের পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজশাহীর রঘুন্দনপুরের জমিদার। মা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ প্রমথনাথ বিশীরের বোন স্কুলশিক্ষিকা মাখন মতি দেবী। মামা প্রমথনাথ বিশীরের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা কল্যাণী রায় চৌধুরী রক্ষণশীলতার শিকল ভেঙে ভালোবেসে ফেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র গোপালগঞ্জের আবদুল মান্নাফকে। কল্যাণী ছিলেন হিন্দু আর মান্নাফ মুসলিম। দুই ধর্মের ভেতরে সে সময় বিয়ের কথা চিন্তা করাটাও ছিল বিপজ্জনক। কিন্তু ভালোবাসা ধর্মের বিভেদের দেয়াল মানে না। সবকিছু ফেলে পালিয়ে এলেন কল্যাণী রায় চৌধুরী। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর হয়ে গেলেন মমতাজ বেগম। তার ধনী বাবা, জাত, সমস্ত অতীত পেছনে ফেলে চলে আসেন স্বামী মান্নাফের সঙ্গে।  

সময়টা ১৯৪৬ সাল। তখন পুরো ভারত জুড়ে চলছে দাঙ্গা। তারা হাওড়া থেকে চলে এলেন গোয়ালন্দে, সেখান থেকে নারায়ণগঞ্জ। সেখানেই থেকে গেলেন স্বামী-স্ত্রী। দুজনে মিলে বানিয়ে নিলেন সুখের সংসার। এর মধ্যে কোল জুড়ে চলে এলো একটি শিশুকন্যা। নাম রাখেন খুকু। মমতাজ বেগম চাকরি করেন মর্গান গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে। সেখানেও বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

এরপরে চলে এলো ১৯৫২। ভীষণ আবেগে দেশের ছাত্র-শিক্ষক সবাই ভাষার জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছে। ঢাকার একদম কাছে নারায়ণগঞ্জেও ভাষা আন্দোলনের আগুন লেগে গেলো।

ঢাকা থেকে খবর এলো ২১ ফেব্রুয়ারিতে মিছিল, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ছাত্ররা মিছিলে যাবে। রহমতউল্লা মুসলিম ইনস্টিটিউটের সামনে তখন সভা চলছে। সভা চলাকালীন তারা জানতে পারলেন, ঢাকায় বহু ছাত্র মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের গুলি খেয়েছে। ছাত্রদের ওপর পুলিশের বর্বর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে কর্তৃপক্ষের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মর্গান হাইস্কুলের ৩০০ ছাত্রী নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লেন স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মমতাজ বেগম। চাষাঢ়া মাঠে এক বিশাল প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে মর্গান স্কুলের ৩০০ ছাত্রী, শিক্ষিকা ও নারীদের একটি বিরাট মিছিল শোভাযাত্রাসহ সভায় এসে যোগ দেয়। 

ভাষা আন্দোলনে সে সময় যারা যুক্ত ছিলেন তাদের মধ্যে মমতাজ বেগম এবং তার ছাত্রীদের ভূমিকা গোটা দেশকে আলোড়িত করে। নারায়ণগঞ্জের আগুন চাপা দেয়ার জন্য মুসলিম লীগ এবং তাদের দোসররা তখন নানা রকম পাঁয়তারা শুরু করে। তারা বুঝতে পারে নারায়ণগঞ্জের আন্দোলন থামাতে হলে মমতাজ বেগমকে থামাতে হবে।

২৭ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনকে নির্দেশ দেয়া হয় মমতাজ বেগমকে গ্রেফতার করার। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়, বলা হয় স্কুলের তহবিল আত্মসাৎ করেছেন তিনি। ২৯ তারিখ গ্রেফতার করা হলো মমতাজ বেগমকে। তার কন্যাটি তখন চার বছরের শিশু। বিভিন্ন মিথ্যা বানোয়াট অভিযোগে তাকে চাকুরিচ্যুত করা হলো।

মর্গ্যান হাইস্কুলের শিক্ষক এবং ছাত্রীরা স্কুল বয়কট করলো। মিছিল করে তারা কোর্টে হাজির হলো। হাজার হাজার মানুষ তখন ঘিরে ফেলে নারায়ণগঞ্জ থানা। মানুষের ভীড়ে বন্ধ হয়ে যায় রাস্তাঘাট। তার জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হলে ক্ষোভে ফেঁটে পড়ে মানুষ। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের পথে বড় বড় ১৬০টি গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে ছাত্রছাত্রীরা। একপর্যায়ে শুরু হলো পুলিশের নির্মম অত্যাচার। নারী এবং ছাত্রীদেরও ছাড়েনি পুলিশ। ট্রাকের পর ট্রাক পুলিশ এসে ঢাকার কারাগারে নিয়ে যায় মমতাজকে।

এরপর মমতাজকে সরকার ক্ষমাপ্রার্থণা এবং মুচলেকার মাধ্যমে মুক্তির প্রস্তাব দেয়। মমতাজ বেগম তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তার স্বামী ঢাকার খাদ্য পরিদর্শক আবদুল মান্নাফ তাকে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানালে তিনি তাতেও অস্বীকৃতি জানান।

একপর্যায়ে স্বামী আবদুল মান্নাফ মমতাজ বেগমের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন করবেন বলে হুমকি দেন। কিন্তু সেই হুমকিও ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন অসীম সাহসী মমতাজ বেগম। যে মানুষটির জন্য একদিন নিজের ঘর, নিজের পরিবার, নিজের সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিলেন, ভাষার প্রতি মমতার জন্য, নিজের আত্মসম্মান রক্ষার জন্য সেটুকুও বিলিয়ে দেন মমতাজ বেগম। স্বামী আবদুল মান্নাফ তখন সব সম্পর্ক ছিন্ন করে তালাক দেন মমতাজ বেগমকে। ১৯৫৩ সালের শেষদিকে দেড় বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান মমতাজ বেগম।

এরপর ঢাকাতেই আনন্দময়ী গার্লস স্কুল ও আহমেদ বাওয়ানী একাডেমিতে শিক্ষকতা শুরু করলেন। প্রচণ্ড অর্থকষ্টে আর রোগশোকে ভুগতে লাগলেন। এক সময় তার স্থান হলো ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ১৯৬৭ সালের ৩০ মার্চ সেখানেই মৃত্যু হয় তার। কন্যা খুকু তখন পশ্চিম পাকিস্তানে, স্বামীর সংসারে। তাকে কবর দেয়া হলো আজিমপুর কবরস্থানে। কেউ জানলো না কোন কবরটি তার। হারিয়ে গেলেন মমতাজ বেগম কোনো চিহ্ন না রেখেই।

দীর্ঘ ৬০ বছর পর ২০১২ সালে ভাষা আন্দোলনে স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের মর্গান হাইস্কুলের সামনের সড়কটি তার নামানুসারে ‘ভাষাসৈনিক মমতাজ বেগম সড়ক’ নামে নামকরণ করা হয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসসি/এসআই