‘ভাল্লাগছে ভায়া’ ‘খাইতে মুঞ্চায়’, এ কেমন বাংলা ভাষা

‘ভাল্লাগছে ভায়া’ ‘খাইতে মুঞ্চায়’, এ কেমন বাংলা ভাষা

তুহিন সাইফুল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ০৯:০২ ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

যেকোন ভাষার কাজ হলো গতিময় নদী প্রবাহের মতো বয়ে চলা। চর্চার ওপর ভাষার সমৃদ্ধি নির্ভর করে। চর্চা না থাকলে বা বিকৃতি ঢুকে গেলে ভাষা দ্রুত বিলুপ্ত হতে থাকে। পৃথিবীতে ভাষা বিলুপ্তির অনেক উদাহরণ আছে। আবার এমন অনেক ভাষা আছে যেগুলো হারিয়ে যাওয়ার পরও নতুন করে চর্চার মাধ্যমে পুরনো রূপে ফিরে এসেছে।  

বিকৃতি ও ভাষার ব্যবহারে অসচেতনতা আর শব্দের অপব্যবহারের কারণে ভাষা বিলুপ্ত হতে থাকে। এছাড়া বিদেশি ভাষার আগ্রাসন তো আছেই!

বাঙালির নাগরিক জীবন চর্চায় বিগত বছরগুলোর তুলনায় সাম্প্রতিক কালে ভাষা বিকৃতি আশংকাজনক হারে বেড়ে গেছে। সাধারণ সম্বোধন কিংবা কুশলবিনিময় করার ছোট্ট বাক্য অনেকে উচ্চারণ করছেন বিকৃত শব্দ-বাক্য ও স্বরে। বিকৃত এসব শব্দ-বাক্যের মধ্যে ‘হেই ব্রো’, ‘কিয়েক্টাবস্তা’, ‘ভাল্লাগছে ভায়া’, ‘মামা কোপ’, ‘খাইতে মুঞ্চায়’, ‘জটিলস’- এর মতো শব্দগুলো রীতিমতো সবার মুখে মুখে পৌঁছে গেছে। 

ভাষা বিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবেই বাংলা ভাষার সঙ্গে বিচিত্র বিদেশি শব্দ ঢুকে আমাদের ভাষাকে দূষিত ও বিকৃত করছে। এর দায় গণমাধ্যমের হলেও ভাষা বিকৃতির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে সম্প্রতি আবির্ভূত হয়েছে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও। এসব মাধ্যমে লেখালেখির সূত্র ধরে বেড়েছে বিকৃতি। ফলে এসব বিকৃতির প্রভাব দ্রুত ছড়াচ্ছে সর্বত্র। 

অথচ বাংলা ভাষার দূষণ ও বিকৃতি রোধে হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৪ সালে হাইকোর্টই সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর আদেশ দেন। কিন্তু ওইসব আদেশ, আইন ও বিধিনিষেধের পরও সর্বত্র বাংলা ভাষার দূষণ চলছেই। 

ভাষার বিকৃতি প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, ভাষা দূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী। আমাদেরকে নিজেদের ভাষার যত্ন নিতে হবে। এর যেন কোনরূপ বিকৃতি সাধন না হয়। কারণ এই ভাষাই হলো আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিচয়। 

তিনি বলেন, আমরা কথ্য ভাষা বলব ঠিক আছে। দয়া করে আমাদের ভাষার যে প্রচলিত ধারা সেটাকে এভাবে বিকৃত করে বাংরেজি বলে ফেলছি; এটা যেন আর না হয়। 

এদিকে আবার ভাষার চলমান গতিপ্রবাহ আটকে রাখার অভিযোগে চলমান বিকৃতির পক্ষেও কথা বলেন অনেকে! তাদের মত, ভাষা চলবে ভাষার মতো। এর ব্যবহার ও প্রয়োগে পরিবর্তন আসবে ভাষা ব্যবহারকারীদের প্রকাশের প্রয়োজন মেপে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। এই একটি ভাষায় কথা বলা মানুষরাই শুধুমাত্র রক্ত দিয়ে নিজেদের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন আর কোন ঘটনা নেই। ভাষাকে নদীর সঙ্গে তুলনা করে ভাষানদীকে দূষিত করে ফেললে চলবে না। তাকে জীবন্ত রাখতে হবে।

বাংলা ভাষার বিকৃততা রুখতে ২০১২ সালে হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বেশ কয়েক দফা নির্দেশনা দেন। একইসঙ্গে রেডিও ও টেলিভিশনে ‘বিকৃত উচ্চারণ’ এবং ‘ভাষা ব্যঙ্গ’ করে কোনো ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেয়া হয়। 

ওই আদেশে আদালত বলেন, বাংলা ভাষার পবিত্রতা রক্ষা করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা করতে হবে। এই ভাষার প্রতি আর কোনো আঘাত যাতে না আসে, সে বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। এছাড়া আদালত বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা কথন, সঠিক শব্দ চয়ন না করা এবং বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সে বিষয়ে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। ওই নির্দেশে ২০১২ সালের ২৮ মার্চ ভাষাদূষণ ও বিকৃতি রোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে। 
ওই কমিটি ৯ দফা সুপারিশও করে। সুপারিশে বলা হয়, ভাষাদূষণ রোধে আইন তৈরি করে বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল এবং দেশি বেতার ও টেলিভিশন নিয়ন্ত্রণ; বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলকভাবে প্রমিত বাংলা ভাষার একটি কোর্স চালু এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পঠন-পাঠন প্রবর্তনের উদ্যোগ; বেতার ও টেলিভিশনে প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত এবং ভাষায় বিদেশি শব্দের অকারণ মিশ্রণ দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ; সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাষার বিকার ও দূষণ রোধে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস রেগুলেটরি কমিশনের ব্যবস্থা গ্রহণ; বেতার ও টেলিভিশনে ভাষাদূষণ রোধ।

সুপারিশে আরো বলা হয়, প্রমিত বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে। ওই কমিটি বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত অনুষ্ঠান পরিবীক্ষণ করে মতামত, উপদেশ ও নির্দেশ প্রদান করবে। মুদ্রণ ও অনলাইন মাধ্যমের ক্ষেত্রেও প্রমিত ভাষা ব্যবহারে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ভাষাদূষণ রোধের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয় অনুরূপ একটি কমিটি গঠন করতে পারে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডকে চলচ্চিত্রে ভাষাদূষণ রোধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা দেয়া যেতে পারে। এছাড়া মোবাইল ফোনের কলার টিউনে বাংলা ছাড়া অন্য ভাষার ব্যবহার নিরুৎসাহ করার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।

এরপর এক রিটে ২০১৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বরপ্লেট ও বিভিন্ন দফতরের নামফলকে বাংলা ব্যবহার করতে বলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৪ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্টের বোর্ডগুলোকে আদেশটি কার্যকর করতে বলে।

এ প্রসঙ্গে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, আমি দায়িত্ব নেয়ার পর ইংরেজি লেখা অনেক সাইনবোর্ড নামিয়েছি। এখনও কাজ করে যাচ্ছি। বাংলা ভাষা নিয়ে আমি অনেক স্বপ্ন দেখি। ফলে এই ভাষার দূষণ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না।

ভাষাদূষণ এর ব্যাপারে জানতে চাইলে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বলেন, বাংলা ভাষাকে বদলে দেয়ার একটা চেষ্টা অনেক বছর ধরেই চলছে। বিদেশি ভাষার আগ্রাসনের কারণেই এমনটা হচ্ছে। ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন পরিকল্পনা করে সেভাবে কাজ করতে হবে। না হলে ভাষা পরিবর্তন আটকে রাখা সম্ভব হবে না। 

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ