Alexa ভালো গল্পের খুবই অভাব: চঞ্চল চৌধুরী

ভালো গল্পের খুবই অভাব: চঞ্চল চৌধুরী

নাজমুল আহসান ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫৬ ২১ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫৭ ২১ জুলাই ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

অভিনেতা, মডেল ও গায়ক। তিনি টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র দুই মাধ্যমেই সমান জনপ্রিয়। যিনি চলচ্চিত্রে কখনো সোনাই, কখনো সোলাইমান, শরাফত করিম আয়না, মিসির আলি হয়ে হাজির হয়েছেন। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেছেন। আর অভিনয় নৈপুণ্যে হয়েছেন দর্শকপ্রিয় অভিনেতা। বলছি অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর কথা। নাট্ক ও চলচ্চিত্রাঙ্গন, নিজের ক্যারিয়ার, সাম্প্রতিক ব্যস্ততা নিয়ে ডেইলি বাংলাদেশের মুখোমুখি হন এই অভিনেতা। সেই কথোকপথনের বিশেষ অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন নাজমুল আহসান-

তুলনামূলক আগের চেয়ে অনেক কম নাটকে আপনাকে দেখা যায়। এর কারণ কী?
-আমিতো সব সময় এভাবেই কাজ করি। ভালো স্ক্রিপ্ট না পেলে সব কাজ করা হয় না। সবাই জানে আমি বেছে বেছে কাজ করি, অন্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করি না। আমার কাছে যখন একটি নাটকের অফার আসে গল্প পছন্দ হলে করি, না হলে সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কাজটা করি না। এই কারণে হয়তো একটু কম পাওয়া যায়।

তাহলে বলতে পারি এই সময়ে এসে ভালো চিত্রনাট্যের অভাব বোধ করছেন?
-ভালো চিত্রনাট্যের অভাব এখন না অনেকদিন ধরেই। ভালো গল্পের খুবই অভাব। এক ঘেয়েমি গল্প। এমনও হচ্ছে আমার করা অনেক পুরাতন নাটক দেখে সঙ্গে আরো কয়েকটা দেখে গড়পড়তা গল্প তৈরি করে নাটক নির্মাণ করছেন। সব কিছু মিলিয়ে একটি নাটক করার আগে এই পর্যায়ে এসে ভাবতে হবে কী কাজ করছি। তাই কাজ একটু কম করি।

একটি নাটক করার আগে প্রস্তুতি নেয়ার যে সময় পেতেন, বর্তমানে সে চর্চাটা করা সম্ভব হয়?
-সময়ের চেয়ে বলতে হবে নাটকের আগে যে বাজেট ছিল সেটা এখন অনেক কমে গেছে। বাজেট কমে যাওয়ার কারণে আগে যে সময় নিয়ে নাটক বানানো হতো এখন সেই সময় পাওয়া যায় না। আগে এক ঘণ্টার নাটকের শুটিং করা হতো পাঁচদিনে। এখন সেটা দুইদিনে শেষ করা হয়। কোনো কোনো নাটক আবার একদিনেও শুটিং শেষ হয়, আমি অবশ্য সেই কাজ করি না। একটি নাটকের ক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনদিন সময় লাগে, কিন্তু দুই দিনেই শেষ করা হচ্ছে। না হলে বাজেট মেলাতে সমস্যা হয়। যতো কাজ করছি সব দুইদিনে শেষ হচ্ছে। তাই সেভাবে প্রস্তুতি নেয়া হয় না, এটাই বাস্তবতা।

সব কিছু মিলিয়ে সাবলীল ভাবে চলছে না নাট্যাঙ্গন?
-খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই আমার দৃষ্টিতে। যেভাবে নাটক চলার কথা ছিল, যতোদিন এই ইন্ড্রাস্ট্রির বয়স, সেই জায়গায় পেশাদারিত্বের আরো উন্নতি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেভাবে পেশাদারিত্বটা আসেনি। এখনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কার সঙ্গে কার সম্পর্ক আছে সেই হিসেব করে কাজ হয়। যোগ্য অনেক মানুষ কাজ পাচ্ছে না, যোগ্য পরিচালক কাজ পাচ্ছে না, যোগ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কাজ পাচ্ছে না। বেশির ভাগ কাজ হচ্ছে রিলেশন আর কে কার সঙ্গে লিয়াজু মেইন্টেন করতে পারবে সেই হিসেব করে। ইন্ড্রাস্ট্রির জন্য মোটেও এটা ভালো না।

দর্শকদের বড় একটা অংশ নাটক সিনেমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আপনার দৃষ্টিতে কী মনে হয়?
-দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে ব্যাপারটা এ রকমও না। ভালো নাটক, খারাপ নাটক সব সময়ই ছিল। এখন ভালো কাজের চেয়ে খারাপ কাজের সংখ্যাটা বেড়েছে। আগেই বললাম যারা ভালো মেকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী তারা প্রোপার কাজের সুযোগ পাচ্ছে না। যে কারণে ভালো কাজের সংখ্যা কমে গেছে, খারাপ কাজের সংখ্যা বেড়ে গেছে। ভালো কাজও হচ্ছে কিন্তু খারাপের ভিড়ে ভালোটা হারিয়ে যাচ্ছে। ইউটিউবে ম্যাক্সিমাম নাটকই কোনটা বেশি ভিউ হবে সেই বিষয় চিন্তা করা হয়। কিন্তু ভালো নাটক বেশি ভিউ হয় না। অনেক ভালো গল্প হয়তো সেই তুলনায় ভিউ নেই। চ্যানেলও ভিউ হওয়া নাটকগুলো নিয়ে চিন্তা করছে, কাস্টিংও সেভাবেই করা হচ্ছে। আর এগুলোই দর্শক দেখছে, দর্শক মুখ ফিরিয়ে কোথায় যাবে। দর্শকদের বিনোদনের মাধ্যমই টেলিভিশন। কিন্তু কাজের ব্যস্তার জন্য ইউটিউবে দেখছে।

যে পরিমান নাটক চ্যানেলে আর ইউটিউবে প্রচারিত হচ্ছে, সংখ্যা অনুযায়ী ভালো নাটকের সংখ্যা কম। আর খারাপ নাটক করলে তো দর্শক মুখ ফিরিয়েই নেবে। কিন্তু ভালো নাটক, ভালো সিনেমা দেখে দর্শক কখনো মুখ ফিরিয়ে নেয় না। দর্শক কখনো খারাপ জিনিস চায় না। তবে দর্শকদের মধ্যেও ক্যাটাগরি আছে। রুচিশীল দর্শক যারা তাদের উদ্দেশ্যে আমি কাজ করি। যাদের নিম্নরুচি তাদের জন্য আমি কাজ করি না। ইন্ড্রাস্ট্রিও এখন হুমকির মুখে আছে, খুব একটা ভালো যাচ্ছে না।

দর্শকতো নিম্নমানের কাজ দেখে দেখে নিজেদের নিম্নরুচির করে ফেলছে, এক্ষেত্রে নাট্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ভার কতটা?
-দর্শকদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এক্ষেত্রে নাট্যসংশ্লিষ্ট থেকে দর্শক সবার দায় আছে। দর্শকদের দায় কী? ভালো জিনিসটা গ্রহণ করা আর খারাপ জিনিসটা বর্জন করা। উদাহারণ স্বরূপ- কম খেলেও স্বাস্থসম্মত খবার খাওয়া। আমাদেরটা হচ্ছে- দর্শকদের জন্য রুচিশীল কাজ করা, নির্মাতাদের রুচিশীল নাটক নির্মাণ করা। যেটা সমাজের জন্য ভালো, সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখবে। এমন কোন নাটক করা উচিত না যেটার কারণে সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। টেলিভিশন মিডিয়া তো ড্রইংরুম মিডিয়া। ড্রইংরুমে বসে বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান সবাই মিলে একসঙ্গে দেখে। সেজন্য অনুষ্ঠানটি রুচিশীল হওয়া উচিত। সেই কারণে এই দায়টা একজন লেখকের আছে, ডিরেক্টরের আছে, অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক, টেলিভিশন মালিক সবার। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায় অনেকেই এই দায়টা নেয় না, যা খুশি তাই করছি। কিন্তু এতে নাটকের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। তাই দায়বদ্ধতা সবার নেয়া উচিত।

দেশের নাট্যাঙ্গন বা সিনেমাঙ্গন যে পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে এই সময়ে নতুন একজন ছেলে বা মেয়ের ক্ষেত্রে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়ার মতো অবস্থা আছে?
-এই মিডিয়াতে যেমন অনেক ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী রয়েছে, তেমনি অভাবও রয়েছে। কোয়ালিটি নিয়ে যে আসবে তারই ভালো করার সুযোগ আছে। নতুন বলতে হুট করে এসে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে তো হবে না। সে যদি যোগ্যতা অর্জন করে এখানে আসে, অভিনয়টা শিখে আসে সেক্ষেত্রে অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়ার অনেক সুযোগ আছে। এটা হচ্ছে চলমান প্রক্রিয়া।

নতুনরা আসবে তারা জায়গা করবে তাদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে। জায়গা সবসময়ই আছে, ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী অনেক আছে, তারপরেও সংকট। শুধু ভালো অভিনয় করলেই হয় না। রুচির জায়গাটা মাপতে হয়, দায়বদ্ধতার জায়গাটা মাপতে হবে। আমি অনেক ভালো অভিনেতা কিন্তু দায়বদ্ধতা নেই, যা খুশি তাই করলাম তাহলে তো হবে না। নতুন একজন এখানে এসে দাঁড়াতে পারবে কিনা সেটা নির্ভর করছে সে আসছে কতটা যোগ্যতা নিয়ে। আগে যোগ্যতাটা অর্জন করতে হবে। দুই-একটা বিজ্ঞাপনে কাজ করে পরিচিত পেয়ে গেলাম আর নাটক বা সিনেমায় প্রধান চরিত্রে কাজ শুরু করে দিলাম। কিন্তু অভিনয়ের কিছু জানলাম না তার জন্যতো অবশ্যই দাঁড়ানোটা কঠিন। যখন থিয়েটার করে স্ট্রাগল করে অভিনয়টা শিখে আসবে তখনই অভিনয়ের জায়গা তৈরি করতে পারবে। এখন যারা নতুন আসছে তাদের অধিকাংশ’র অভিনয়ের ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। কোনো প্রিপারেশন নিয়ে আসে না। অভিনয় শেখারও তেমন আগ্রহ নেই। আসছে কাজ করছে, স্ক্রিনে একই চরিত্র করছে বারবার।

আপনিতো ১৯৯৬ সাল থেকে মঞ্চে অভিনয় করছেন। এখনো আরণ্যকের সঙ্গে যুক্ত আছেন?
-এখনো আরণ্যকের সঙ্গেই আছি। এখনো মঞ্চে সময় দেই। কিন্তু শেষ দুই বছর সেভাবে শো করতে পারছি না। এখন সব নতুন প্রোডাকশন, নতুন প্রোডাকশনে কাজ করতে গেলে অনেক সময় দিতে হয়। টেলিভিশন নাটকের কারণে সেটা সম্ভব হয় না। গ্রুপতো ছাড়ার জিনিস না, আরণ্যকের সঙ্গে আছি, মঞ্চ নাটকের সঙ্গে আছি।

মনপুরা, টেলিভিশন, আয়নাবাজি ও সবশেষ দেবীতে আপনার অভিনয় নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছেন অসংখ্য দর্শক। নতুন সিনেমায় কবে দেখবে দর্শক?
-নতুন সিনেমা নিয়ে কাজের আলোচনা চলছে। এখনো তেমন কিছু হয়নি। এই বছরে আরেকটি কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে। যখন কাজটি চূড়ান্ত হবে তখন সংবাদ সম্মেলন করে জানাবো।

বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?
-ঈদের কাজ নিয়ে ব্যস্ততা চলছে। তবে কয়টি নাটক প্রচার হবে এসব কখনো হিসাব করি না, আর সংখ্যাটাও আমি উল্লেখ করতে চাই না। আমি হয়তো সবার মতো পঞ্চাশ, ষাটটা নাটক করি না। আমার দরকার ভালো গল্প। ভালো গল্পের পাঁচটা পেলে পাঁচটা, দশটা পেলে দশটা করি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনএ/এমআরকে/এস