দূরবীনপ্রথম প্রহর

ভারতের মৌলবাদী মনোভাবের স্বাক্ষর ‘হিন্দি বলয়’

অমিত গোস্বামী
কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

গত সোমবার অর্থাৎ ৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ সকালে ২৫টি গবাদি পশুর দেহ উদ্ধার ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায় উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহরে। গো-হত্যার গুজব ছড়িয়ে পথে নামে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ হাজির হলে পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। গ্রামের বাইরে জঙ্গলের ধারে গোমাংস ছড়িয়ে রয়েছে— এমনই এক খবর ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। যে মাংস ছড়িয়ে রয়েছে, সে আদৌ গোমাংস কি না, তা যাচাই করার কোনো সুযোগ রইল না। গ্রামের বাইরে বা জঙ্গলের কাছে গোমাংসও যদি পড়ে থাকে, তা হলে কার ক্ষতি হল বা কার ধর্ম গেল, সে নিয়ে তর্ক উত্থাপনের সুযোগ রইল না। ওই তথাকথিত গোমাংস ওই এলাকায় কী ভাবে এল, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তারও অবকাশ রইল না। মুহূর্তে উত্তাল হল গোটা এলাকা। বিক্ষোভ ভেঙে পড়ল সড়কের উপরে। অবরোধ তোলার চেষ্টা হতেই পুলিশ-প্রশাসনকে প্রতিপক্ষ ভেবে নিলেন বিক্ষোভকারীরা। সংঘর্ষ শুরু হল। ইট-পাথর উড়ে গেল। গুলি চলল। একের পর এক গাড়িতে আগুন জ্বলল। থানা আক্রান্ত হল। দিনের শেষে জানা গেল, এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে। এক পুলিশকর্মী শেষ হয়ে গিয়েছেন। অবরোধ-বিক্ষোভ-প্রতিবাদ, পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর-গুলি, পাল্টা পুলিশের গুলি, থানায় ভাঙচুর, আগুন ধরানো। গো-হত্যার গুজবে সোমবার সাতসকালে এ ভাবেই উত্তপ্ত হল উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহর জেলা। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে মৃত্যু হল এক পুলিশ আধিকারিক-সহ দু’জনের। গুরুতর জখম আরও দুই পুলিশকর্মী।

এ দিন বুলন্দশহরের স্যানা মহকুমা এলাকায় মাহু গ্রামের বাইরে জঙ্গল লাগোয়া একটি মাঠে প্রায় ২৫টি গরুর মাংস পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছে বলে গুজব রটে। গো-হত্যার প্রতিবাদে সকাল ১১টা নাগাদ ওই এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। ট্র্যাক্টর-ট্রলি ভরে ওই মাংস নিয়ে রাস্তা অবরোধ করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন এলাকার প্রায় চারশো জন। খবর পেয়ে অবরোধ সরাতে সেখানে পৌঁছন ইনস্পেক্টর সুবোধ কুমার সিংহ-সহ পুলিশকর্মীরা। বিক্ষোভকারীদের ছোড়া পাথরে আহত হন সুবোধ। তাঁর চালক রাম আশরে আজ জানিয়েছেন, সুবোধকে গাড়িতে চড়িয়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় বিক্ষোভকারীরা ‘মার মার’ করে পিছনে ধাওয়া করে গাড়িটি ধরে ফেললে প্রাণভয়ে পালান তিনি। চালকের কথায়, ‘‘গাড়ির মধ্যেই স্যারকে গুলি করা হয়।’’ একটি ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গাড়ির বাইরে হেলে পড়ে রয়েছে সুবোধের দেহ। চারপাশে গুলির শব্দ। তার মধ্যেই ‘গুলি করো, গুলি করো’ বলে চিৎকার করছে কেউ। ময়না-তদন্তে জানা গিয়েছে, ভুরুর নীচে গুলি লেগে মৃত্যু হয়েছে সুবোধের। তাঁর বন্দুক ও মোবাইল ফোন চুরি গিয়েছে।

কিন্তু কে এই সুবোধ কুমার সিনহা ? একজন পুলিশ আধিকারিক উত্তরপ্রদেশের আখলাখ গণপিটুনির ঘটনার তদন্তকারী আধিকারিক ছিলেন। তার বোনের অভিযোগ, সেকারণেই পরিকল্পনা করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, দাদরির গোরক্ষক বাহিনীর হামলার তদন্ত করছিল বলেই আমার ভাইকে খুন করা হয়েছে। না-হলে ভাই পুলিশের গাড়িতে কেন একা থাকবে? অন্য অফিসার, চালক সুবোধকে ছেড়ে দিয়ে কেন চলে যাবে? আমি এর জবাব চাই। পুলিশও এই ষড়যন্ত্রে জড়িত।’’

২০১৫-র ২৮ সেপ্টেম্বর। উত্তরপ্রদেশের দাদরির বিসারা গ্রামে গুজব রটে যায়, মহম্মদ আখলাকের বাড়িতে গরুর মাংস রয়েছে। গ্রামের মানুষ হামলা চালায় আখলাকের বাড়িতে। গণপিটুনিতে মারা যান ৫২ বছরের আখলাক। সেই রাতে পুলিশ জিপ নিয়ে সুবোধকুমার সিংহই প্রথম পৌঁছেছিলেন বিসারা গ্রামে। তিনিই জিপে করে আখলাক ও তাঁর ছেলে দানিশকে হাসপাতালে নিয়ে যান। দানিশ বেঁচে গেলেও আখলাক বাঁচেননি। ওই খুনের তদন্ত শুরু করেন সুবোধই। তিনিই আখলাক-খুনের প্রথম তদন্তকারী অফিসার। সেই হিসেবে ওই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।

বেশি দিন অবশ্য আখলাক খুনের তদন্ত করতে পারেননি সুবোধ। দেড় মাসের মধ্যেই, ৯ নভেম্বর ওই তদন্ত থেকে তাঁকে সরিয়ে বদলি করে দেওয়া হয় বারাণসীতে। কিন্তু আইনজীবীদের বক্তব্য, আখলাক খুনের মামলার শুনানি শুরু হলে সুবোধ ওই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে উঠতেন। সাধারণত যে কোনও খুনের মামলার শুনানিতেই তদন্তকারী অফিসারদের ডাক পড়ে। এ ক্ষেত্রে যে অফিসার তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দায়ের করেছেন, তারই ডাক পড়ত। কিন্তু সুবোধ যে-হেতু পুলিশকর্মীদের মধ্যে প্রথম ঘটনার দিন দাদরিতে গিয়েছিলেন, তাই শুনানির সময়ে তারও ডাক পড়ত।

কারণ একাধিক। এক, তদন্তে নেমে আখলাকের বাড়ির ফ্রিজ থেকে সুবোধই নমুনা সংগ্রহ করে গ্রেটার নয়ডার পরীক্ষাগারে নিয়ে যান। যে মাংস ‘গোমাংস’ বলে অভিযোগ উঠেছিল, তা পাঁঠার মাংস বলে জানায় পরীক্ষাগার। পরে সেই নমুনা আবার মথুরার ইউনিভার্সিটি অব ভেটেরিনারি সায়েন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। মথুরার পরীক্ষাগার রিপোর্ট দেয়, ও’টি গোমাংস।

দুই, পুলিশ সূত্রের বক্তব্য, আখলাকের মৃত্যুর পরেও সুবোধ নিয়মিত বিসারা গ্রামে গিয়ে গুজব ধামাচাপা দিয়ে শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। হিন্দু-মুসলমান, দুই সম্প্রদায়ের সঙ্গেই বৈঠক করেছিলেন তিনি। যাতে আর উত্তেজনা না ছড়ায়। ফলে কী ভাবে, কারা গ্রামে গুজব রটিয়েছিল, কী ভাবে আখলাকের বাড়িতে হামলা হয়েছিল, তা তাঁর জানা। নরেন্দ্র মোদী সরকারের জমানায় আখলাকের হত্যার পরেই দেশ জুড়ে অসহিষ্ণুতার অভিযোগ ওঠে। কিন্তু তিন বছর কাটলেও আখলাক-খুনে কারও শাস্তি হয়নি। সুবোধের পরেও আর এক জন তদন্তকারী অফিসার বদলি হয়েছেন। তৃতীয় তদন্তকারী অফিসার চার্জশিট দায়ের করেছেন। কিন্তু আদালতে এখনও চার্জ গঠন হয়নি। ১৮ জন অভিযুক্তের সকলেই জামিন পেয়ে গিয়েছেন। যাঁদের মধ্যে স্থানীয় বিজেপি নেতার আত্মীয়ও রয়েছেন। পুলিশ বলছে, আরও তথ্যপ্রমাণ দেওয়া বাকি।

দু’দিন আগেই খবরের শিরোনামে এসেছিল বুলন্দশহর। সংখ্যালঘুদের তিন দিনের ধার্মিক অনুষ্ঠান ‘ইজতেমা’র জন্য লক্ষ লোকের ভিড় হয়েছে শহরে। আর নমাজের জন্য শনি মন্দির খুলে দিয়েছেন হিন্দুরা। সম্প্রীতির বাতাবরণ বয়ে যাচ্ছিল তামাম এলাকায়। এই ঘটনা তারপরের। গ্রামবাসীরা বলছেন, ক’দিন আগে সম্প্রীতির নজির গড়া বুলন্দশহরে আচমকাই গবাদি পশুর মৃতদেহ ঘিরে হাঙ্গামা শুরু হয়। থানায় অভিযোগ দায়ের করে বিষয় থিতিয়েও গিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টা পরে হঠাৎ গ্রামের বাইরে থেকে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সদস্যরা এসে তাণ্ডব শুরু করে। তাতেই প্রাণ হারান পুলিশ অফিসার সুবোধ কুমার সিংহ।

সোমবার বুলন্দশহরে গোহত্যার গুজবের জেরে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের তাণ্ডবে সেই সুবোধই খুন হয়ে যাওয়ার পরে প্রশ্ন উঠেছে, এর পিছনে কি কোনও ষড়যন্ত্র রয়েছে? সুবোধকে তাঁরই সার্ভিস পিস্তল দিয়ে গুলি করে মারা হয়েছে বলে পুলিশের অনুমান। আরও প্রশ্ন উঠেছে, আখলাক-খুনের মামলা ভেস্তে দিতেই কি পরিকল্পিত ভাবে তাণ্ডব বাধিয়ে সুবোধকে খুন করা হল? অথচ সোমবার বুলন্দশহর যখন জ্বলছিল, তখন লেজ়ার-শো দেখছিলেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ! গত কালের তাণ্ডবের জন্য অভিযোগের আঙুল উঠছে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ এবং বিজেপির দিকে। অভিযোগ, তাণ্ডবের পাণ্ডা বজরং দলের যোগেশ রাজ। কিন্তু এফআইআর-এ কোনও সংগঠনের নাম নেই। গেরুয়াধারী এক সন্ন্যাসী আজ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। গোটা দেশের কাছে এখন হিন্দুত্ববাদের সবচেয়ে কট্টর মুখ তিনি। তাঁর ভাষণ সম্ভবত ধর্মীয় মেরুকরণের সবচেয়ে বড় সংঘটক এই মুহূর্তে। কিন্তু সেই যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসনের উপরেও ভরসা রাখল না ক্ষিপ্ত জনতা। গোমাংস গুজব ছড়াতেই পুলিশ-প্রশাসন-আইন-সরকার-সহ গোটা ব্যবস্থাকে প্রতিপক্ষ ভেবে নিলেন এলাকাবাসী। দুঃস্বপ্নের কবলে চলে গেল বুলন্দশহর জেলার বেশ খানিকটা এলাকা।

কট্টরবাদকে অনর্গল ইন্ধন জুগিয়ে যাওয়ার ফলটা টের পাওয়া যাচ্ছে এ বার? দেশের জনসংখ্যার মাঝে স্পষ্ট বিভাজনরেখা এঁকে দিয়ে এবং তীব্র মেরুকরণে সওয়ার হয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে কিছু সাফল্য মেলে ঠিকই। কিন্তু সে সাফল্য সাময়িক। আর তার বিনিময়ে একটা গোটা জাতি যে সাংঘাতিক নৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে, সেই ক্ষতিটা স্থায়ী। যে কোনও কট্টরবাদই গণতন্ত্রের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। বার বার সতর্কবার্তা শোনা যাচ্ছিল নানা প্রান্ত থেকে। অসহিষ্ণুতার সূচকগুলো সাংঘাতিক ভাবে চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। কিন্তু কট্টরবাদের আগুনে অঢেল অক্সিজেন জোগানোর কর্মকাণ্ড কিছুতেই বন্ধ হল না। অবিশ্বাস, বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা মিলেমিশে দানবের চেহারা নিল। সে দানব আজ স্রষ্টাকেই মানতে চায় না আর। প্রকাশ্য স্থানে গোমাংস ছড়িয়ে রেখে যাওয়ার মতো ঘটনা কেউ যদি সত্যিই ঘটিয়ে থাকেন, তা হলে যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন যে তাঁকে কিছুতেই ছেড়ে কথা বলবে না, এ বিশ্বাস গোমাংস-বিদ্বেষীদের মধ্যে অন্তত থাকা উচিত ছিল। কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ বলছে, বিদ্বেষ আজ লাগামহীন। আক্রোশ আজ কোনও অঘটন বা দুর্ঘটনার বিহিত চেয়ে মাথা তুলছে না। আক্রোশ আজ শুধুমাত্র ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠার সুযোগ খুঁজছে। সেই অন্বেষণের কোনও দিশা নেই, কোনও নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, কোনও নির্দিষ্ট উৎস নেই, কোনও নির্ধারিত অন্ত নেই। কে জন্ম দিয়েছিল, কে লালন করেছিল, কে প্রশ্রয় জুগিয়েছিল— সব ভুলে গিয়েছে দেশের বিস্তীর্ণ পরিসরে চারিয়ে যাওয়া বিদ্বেষ তথা আক্রোশটা। নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে পরিস্থিতি ক্রমশ।

রাজনীতির ময়দানে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ যে দেশের বর্তমান শাসককুলের হাতিয়ার হয়ে ওঠে বার বার, সে কথা অস্বীকার করার উপায় কম। সেই মেরুকরণের রাশ কি এ বার শাসকদলের হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে? হ্যাঁ যাচ্ছে। আর সেটা যখন পূর্ণরূপ নেবে তখন স্বপ্ন দিয়ে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা এ দেশ হয়ে উঠবে হিন্দু মৌলবাদের আঁতুর ঘর। ‘সাহিত্য সমালোচনা’য় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘‘আমাদের হিন্দু-সমাজে গোহত্যা পাপ বলে গণ্য, অথচ সেই উপলক্ষে মানুষ-হত্যা তত দূর পাপ বলে মনে করি না।’ কোথায় রবি ঠাকুর! এদেশের বামেরা পর্যন্ত রামের দিকে ঝুঁকে পড়ছে গ্রামে ও প্রান্তরে। কাজেই হিন্দু মৌলবাদ ক্রমশই গ্রাস করে নিচ্ছ গণতান্ত্রিক চেতনা। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি অন্ধকারের দিকে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর