ভদ্রবেশী সিরিয়াল কিলার, শিশুসহ ১০০ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে

ভদ্রবেশী সিরিয়াল কিলার, শিশুসহ ১০০ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৫৯ ২৮ এপ্রিল ২০২০   আপডেট: ১৪:৩৯ ২৮ এপ্রিল ২০২০

ছবি: রডিন ও তার হাতে যাদের মৃত্যু ঘটে

ছবি: রডিন ও তার হাতে যাদের মৃত্যু ঘটে

হাসিখুশি একজন মানুষ। তাকে প্রথম দেখাতেই যে কোনো মেয়ে প্রেমে পড়তে বাধ্য! তার হাসি দেখেই অনেক নারীই তার ফাঁদে পা বাড়িয়েছে। অতঃপর ভদ্রবেশী চেহারার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসত তার মানসিক বিকারগ্রস্ত রূপ। একে একে ১০০ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন তিনি। তার নাম রডনি অ্যালকালা। নামকরা একজন সিরিয়াল কিলার। বর্তমানে তিনি মৃতুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার করকোরান রাজ্য কারাগারে।

১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সাল বুধবার বেশিরভাগ মানুষের জন্যই সাধারণ একটি দিন ছিল। তবে চেরিল ব্র্যাডশোর জন্য দিনটি ছিল স্মরণীয়। তিনি ডেটিং এর জন্য টিভি ম্যাচমেকিং শো দ্য ডেটিং এ গিয়েছিলেন নিজের জন্য একজন যোগ্য ব্যাচেলরের খোঁজে। সেখানে তিনি পেয়েও যান মনের মতো একজন সুদর্শন এবং বুদ্ধিমান ব্যাচেলর যুবককে। যার কথা এবং সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন চেরিল ব্র্যাডশো। তিনি লাইনআপ থেকে এক নম্বরে থাকা রডনি অ্যালকালাকে বেছে নেন। এরপর উপস্থাপক তাদের অনেক শুভকামনা জানান। 

রডনিতারপরই শুরু হয় তাদের সুন্দর মুহূর্তগুলো। একসঙ্গে ঘুরে বেরানো, বারে যাওয়া, খাওয়া-দাওয়া, একসঙ্গে সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়া চলতে থাকে তাদের মধ্যে। এ সব কিছুই ছিল টিভি শোয়ের অংশ। তবে শোয়ের শেষ পর্বে এসে রডনি চেরিলের সঙ্গে বেশ খারাপ আচরণ করতে থাকে। বারবারই তাকে যৌন হেনস্তার স্বীকার হতে হয় রডনির কাছ থেকে। এমনকি রডনির প্রস্তাব চেরিল প্রত্যাখ্যান করায় কয়েকবার মারধরেরও শিকার হন তিনি। এছাড়াও তাকে হত্যার প্রচেষ্টাও চালায় রডনি।    

২০১২ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে চেরিল এমনটাই বলেছিলেন সিডনি টেলিগ্রাফকে। চেরিল কোনো রকমে সেদিন রডনির হাত থেকে প্রাণ রক্ষা করে পালিয়ে আসেন। তবে এরপর টিভি শোয়ের কর্তৃপক্ষকে সবটাই জানান তিনি। তারাও বেশ অবাক হয়ে যান এসব শুনে। এরপরই তারা রডনি অ্যালকালের ব্যাপারে খোঁজ খবর করতে থাকেন। তদন্তে রডনির ব্যাপারে বেশ কিছু লোমহর্ষক তথ্য পান তারা। যা একেবারে সবার চোখ কপালে তুলে দিয়েছিল।

  চেরিল ব্র্যাডশোরডনি অ্যালকালা ছিলেন একজন মানসিক রোগী এবং একজন সিরিয়াল কিলার। ততদিনে সে ৫০ থেকে ১০০ জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। এমনকি তিনি একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। এর কোনো কিছুই জানতেন না ডেটিং শোয়ের কর্তৃপক্ষ। রডনি অ্যালকালার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রথম শিকার ছিল মাত্র আট বছর বয়সী এক শিশু। হত্যার পূর্বে তাকে মারধর ও ধর্ষণ করে রডনি। অন্যান্য সিরিয়াল কিলারদের মতো রডনিরও হত্যার একটি ধরণ ছিল। 

সে প্রথমে ভুক্তভুগিকে মারধর করত। অজ্ঞান না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকে মারতেই থাকত। এরপর ধর্ষণ করে শ্বাসরোধ বা গলা কেটে হত্যা করত। এফবিআইয়ের দশজন মোস্ট ওয়ান্টেড পলাতকের তালিকায় ছিলেন রডনি। তাকে ডেটিং গেম কিলার আখ্যা দেয়া হয়। ডেটিং শোটির ওই পর্বের আরেকজন প্রতিযোগী ব্যাচেলর ছিলেন অভিনেতা জেড মিলস। তিনি এলএ সাপ্তাহিককে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, রডনি বেশ শান্ত আর হাসিখুশি ছিলেন। সবার সঙ্গেই ভালো আচরণ করেছিলেন তিনি। তবে কারো চোখের দিকে তাকিয়ে সে কথা বলত না। সবসময়ই সে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলেছে।   

১৩ বছরের তালি শাপিরোটেক্সাসের সান আন্তোনিওতে ১৯৪৪ সালে রডনি অ্যালকালা জন্মগ্রহণ করেন। আট বছর বয়সে তার পুরো পরিবার মেক্সিকোতে চলে যায়। এর তিন বছর পরই রডনির বাবা তাদের ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যান। এরপর রডনির মা তাকে আর তার বোনকে নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে চলে যান। ১৭ বছর বয়সে একজন ক্লার্ক হিসেবে রডনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়। তবে কয়েক বছরের মধ্যেই মানসিক অসুস্থতার কারণে তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। এরপর রডনি ১৩৫ এর ইউসিএলএতে যোগ দেয়।   

সেখানে ১৯৬৮ সালের দিকে রডনি একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকতে শুরু করেন। তার প্রতিবেশী ১৩ বছর বয়সী তালি শাপিরোকে মারধর, ধর্ষণের পর সে হত্যার চেষ্টা চালায়। তবে শাপিরোর চিৎকার শুনে এক পথচারী এগিয়ে এলে সে প্রাণে বেঁচে যায়। পুলিশ আগমনের পূর্বেই রডনি তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে পালিয়ে যায়। বেশ কয়েক বছর সে পলাতক থাকে। 

চার্লট ল্যাম্বকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে অ্যালকালাএরপর তিনি নিউইয়র্কে চলে যান। সেখানে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম স্কুলে ভর্তির জন্য নিজের নাম বদলে ফেলেন। রডনি অ্যালকালা থেকে হয়ে যান জন বার্গার। সেখানে রোমান পোলানস্কির অধীনে তিনি পড়াশোনা করেন। এফবিআই থেকে রডনিকে ধর্ষণ এবং তালি শাপিরোর হত্যার চেষ্টা করার অপরাধী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। তারা একটি পোস্টার তৈরি করে। আর তারপরই ১৯৭১ সালে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে শুধু হামলার অভিযোগে তাকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছিল। 

শাপিরোর পরিবার তাকে শুধু হামলার জন্য দোষী করেছিল। হয়তো সবেমাত্র কৈশোরে পা দেয়া মেয়েটির ভবিষ্যতের কথা ভেবেই ধর্ষণের কথা গোপন রেখেছিল তারা। তিন বছর কারাগারে কাটিয়ে মুক্তি পায় রডনি। কর্তৃপক্ষ তাকে বিমানে নিউ ইয়র্কে যাতায়াত করতে এবং আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়। সেখানে পৌঁছানোর সাত দিনের মধ্যেই তিনি এলেন হোভার নামে এক কলেজছাত্রীকে হত্যা করেন। যিনি হলিউডের একটি জনপ্রিয় নাইটক্লাবের মালিক স্যামি ডেভিস জুনিয়র এবং ডিন মার্টিনের মেয়ে ছিলেন।

গর্ভবতী ক্রিস্টিন থর্নটনকেও ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়১৯৭৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে টাইপসেটর হিসেবে চাকরি পায় সে। এত কিছুর পরেও রডনি তার প্রকৃত নাম নিয়েই সেখানে কাজ শুরু করেন। দিনে একজন টাইপ রাইটার আর রাতের বেলা তিনি যুবতী মেয়েদের ফটোগ্রাফি করতেন। বিভিন্ন নাইট ক্লাবে গিয়ে মেয়েদের অল্প খরচে, আবার অনেক সময় ফ্রিতেই ফটোগ্রাফি করার প্রলোভন দেখাত। দ্য সানের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় এক হাজারেরও বেশি নারীর নগ্ন ছবি তুলেছেন মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ রডনি।

সেসময় ১৭ বছর বয়সী লিয়ান লিডম রডনির সঙ্গে একটি ফটোশুটে যাওয়ার জন্য রাজি হয়। এরপরের গল্প নিশ্চয় অনুমান করতে পারছেন! হ্যাঁ, সেই একই ঘটনা ঘটে লিয়ান লিডমের সঙ্গে। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই অনেকগুলো নারীকে হত্যা করেন রডনি। ১৯৭৯ সালের ২০ জুন ১২ বছর বয়সী রবিন সামসোই ক্যালিফোর্নিয়ার হান্টিংটন বিচ থেকে গায়েব হয়ে যায়। ১২ দিন পর ক্যালিফোর্নিয়ার একটি পার্কের জঙ্গল থেকে অর্ধগলিত অবস্থায় সামসোয়ের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। 

জিল বারকোম্বের দেহটি বলের ন্যায় গোল করে বেধে ফেলে দেয় রডিনসামসোয়ের বন্ধুরা জানায়, সেদিন একজন অপরিচিত ব্যক্তি সৈকতে তাদের কাছে এসেছিল। সে তাদের কাছে জিজ্ঞাসা করে, তারা কোনো ফটোশুট করতে চায় কিনা। তারা ব্যক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপর ওই ব্যক্তি সেখান থেকে চলে যায়। তার কিছুক্ষণ পর সামসো গায়েব হয়ে যায়। সামসোয়ের বন্ধুদের বর্ননা অনুযায়ী পুলিশের স্কেচ আর্টিস্ট সেই ব্যক্তির একটি ছবি আঁকেন। একজন অফিসার মুহূর্তেই মুখটি চিনে ফেলেন। 

রডনির অপরাধমূলক অতীত এবং তার সিয়াটল স্টোরেজ লকারে সামসোয়ের কানের দুল পাওয়া যায়। আর এতে পুলিশ পুরোপুরি নিশ্চিত হয় যে, সামসোইকে রডনিই হত্যা করেছে। তবে সামসোর পরিবারকে ন্যায় বিচারের পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৮০ সালে বিচার শুরু হয়। এরপরে আদালত রডনিকে  প্রথম-ডিগ্রি হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে। ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্ট জুরির পক্ষপাত হয়ে রায়টি প্রত্যাহার করে দেয়। এরপর রডনিকে আবার বিচারের মুখোমুখি করতে ছয় বছর সময় লেগেছিল। 

জর্জিয়া উইক্সটেডের মৃতদেহ তার অ্যাপার্টমেন্টেই পাওয়া যায়১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় বিচারের সময় অন্য এক জুরি তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়। ২০০৩ সালে আপিল করায় তার মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হয়। অবশেষে, ২০১০ সালে হত্যার ৩১ বছর পরে তৃতীয় বিচার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিচারের ঠিক আগে অরেঞ্জ কাউন্টির সিনিয়র ডেপুটি জেলা অ্যাটর্নি ম্যাট মারফি এলএ সাপ্তাহিককে বলেছিলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় ৭০ এর দশক যৌন হেনস্তার স্বীকার হয়েছেন অনেক নারী। রডনির মতো অনেক সিরিয়াল কিলারও সেসময় তৈরি হয়েছিল। 

কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় রডনি ‘জুরি’ নামক একটি বই প্রকাশ করে। সেখানে নিজের জীবনী লিখেন তিনি। বইতে তিনি সামসোয়ের মামলায় নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। রডনি তার তৃতীয় বিচারে নিজের আইনজীবী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। তবে সামসো হত্যার ৩১ বছর পরে এবং তার বিরূদ্ধে কয়েক দশক আগে থাকা আরো চারটি বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ ছিল। তাই তার প্রস্তাব গ্রহণ করেনি কোর্ট। 

বর্তমানে জেলেই রয়েছে অ্যালকালারাষ্ট্রপক্ষ ২০১০ সালের বিচারে রবিন সামসোয়ের সঙ্গে নতুন খুনের অভিযোগগুলো একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিল। এছাড়াও তার বিরূদ্ধে সাক্ষী দেয় শাপিরো। যিনি প্রায় ৪০ বছর আগে রডিনের দ্বারা নির্যতিত হয়েছিলেন। এই বিচারের পরে ২০১৩ সালে নিউইয়র্কে রডিনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তার নামের সঙ্গে ডেটিং গেম কিলার যুক্ত করে ফাঁসির আদেশ দেয় নিউইয়র্ক কোর্ট। তবে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রডনি অ্যালকালার ফাঁসি কার্যকর হয়নি। 

সূত্র: অলদ্যটসইন্টেরেস্টিং, ছবি- দ্য সান

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস/মাহাদী