বড় দুর্দিন এখন বাংলা গানের

বড় দুর্দিন এখন বাংলা গানের

ড. তপন বাগচী ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২০:৪৮ ২ মে ২০২০   আপডেট: ১৫:২৯ ৭ মে ২০২০

অলঙ্করণ: আশিস সরকারের প্রোট্রেইট অবলম্বনে আদিল হোসেন

অলঙ্করণ: আশিস সরকারের প্রোট্রেইট অবলম্বনে আদিল হোসেন

নব্বই দশকের শীর্ষস্থানীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ড. তপন বাগচী। জন্ম ১৯৬৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাদারীপুরে। বাবা তুষ্টচরণ বাগচী ও মা জ্যোতির্ময়ী বাগচী। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এমএ-পিএইচডি। বর্তমানে বাংলা একাডেমির উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন। ‘আমার ভেতর বসত করে’, ‘কলঙ্ক অলঙ্কার হইল’, ‘দিয়েছি এই বুকের আসন’, ‘কূলের আশায় কূল হারাইছি’ এমন অনেক বিখ্যাত গানের রচয়িতা তিনি। তার উল্লেখযোগ্য কবিতাগ্রন্থ: শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি, কেতকীর প্রতি পক্ষপাত, অন্তহীন ক্ষতের গভীরে, সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল। প্রবন্ধগ্রন্থ: সাহিত্যের এদিক-সেদিক, সাহিত্যের কাছে-দূরে, চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, লোকসংস্কৃতির কতিপয় পাঠ, বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত, মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ : চন্দ্রাহত অভিমান, নির্বাচন সাংবাদিকতা, নজরুলের কবিতায় শব্দালঙ্কার, তৃণমূল সাংবাদিকতার উন্মেষ ও বিকাশ। পুরস্কার ও স্বীকৃতি: তার সময়ের সবচেয়ে বেশি পুরস্কারে ধন্য হয়েছেন তিনি। গান লিখে তিনি ৪বার পেয়েছেন স্টান্ডার্ড চার্টার্ড দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রেটিং লাইফ গীতিকার পুরস্কার (২০১৯, ২০১৬, ২০১৪, ২০১৩)। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সাহিত্য পদক (২০২০), নজরুল পুরস্কার (চুরুলিয়া, ২০১৯), নজরুল অ্যাওয়ার্ড  (মেমারি, ২০১৯) অগ্রণী ব্যাংক বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০১৮), কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার (২০১৭), সুফিসাধক আরকুম শাহ স্মৃতি পদক (২০১৭),  অনুভব বহুমুখি সমবায় সমিতি সাহিত্য পদক (২০১৩);  সাংস্কৃতিক খবর সম্মাননা (২০১২); নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার (কোলকাতা, ২০১১); ২ বার বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ফেলোশিপ (২০১২ ও ২০১০), মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার (কোলকাতা, ২০০৮); মাইকেল মধুসূদন পদক (২০০৮), এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৮); জেমকন সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮); নটসম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস স্মৃতি পদক (২০০৮); পাক্ষিক ‘মুকসুদপুর সংবাদ’ সম্মাননা (২০০৭); জসীমউদ্দীন গবেষণা পুরস্কার (১৯৯৬); (২৮) মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১)। এয়ড়া জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের আরও পদক-পুরস্কার রয়েছে তার সংগ্রহে।

তপন বাগচীকে নিয়ে সাহিত্য পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ এবং  গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। তার পঞ্চাশ বছরকে কেন্দ্র করে বীরেন মুখার্জীর ‘দৃষ্টি’, অনাদিরঞ্জন বিশ্বাসের ‘বাকপ্রতিমা’, নীলাদ্রিশেখর সরকারের ‘কথাকৃতি’ এবং রুবেল আনছারের ‘রিভিউ’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।  তার উপর রচিত হয়েছে পাঁচটি গ্রন্থ: শ্যামাপ্রসাদ ঘোষের ‘শিশুসাহিত্যে তপন বাগচী বর্ণময় আলোকদ্যুতি’, হরিদাস ঠাকুরের ‘কবি তপন বাগচীর মনন-দর্শন’, ড. অনুপম হীরা মণ্ডলের ‘সাহিত্যের তপন বাগচী- বিচিত্র বিভাকর’, মনীষা কর বাগচীর ‘মূলসন্ধির কবি তপন বাগচী- নিবিড় অনুধ্যান ও নরেশ মণ্ডলের ‘তপন বাগচীর সাহিত্য- চকিত বীক্ষণ’। তার উপর আরো কিছু গবেষণা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সমকালের আলোচিত এই সাহিত্যব্যক্তিত্বের সমৃদ্ধ ঝুলি থেকে সঞ্চয়ের প্রয়াসে মুখোমুখি হয়েছিলেন সাংবাদিক ও কথাশিল্পী রনি রেজা

 

ডেইলি বাংলাদেশ: সৃষ্টিশীল জগতে পদার্পণের গল্পটা জানতে চাই।

তপন বাগচী: গল্পটি নতুন নয়। বয়স তো কম হলো না। অনেককেই বলতে হয়েছে। অনেকবার বলতে হয়েছে। তবু বলতে খারাপ লাগে না। বাবার হাত ধরেই আসা। বাবাই আমাকে খাতা আর পেন্সিল দিয়ে বলেছিলেন কিছু একটা লিখতে। দুপুর বেলা বাবার ঘুম নষ্ট করার শাস্তি ছিল এটা। তখন জসীমউদদীনের কবিতার লাইন অনুকরণ করে ৪টি লাইন লিখেছিলাম। বাবা ধরে ফেলেছিলেন। কিন্তু খুশি হয়েছিলাম। সেই থেকে শুরু আমার লেখালেখি। তবে একটা দুঃখ আছে এখানে। আমার বাবা টুকটাক লিখতেন এরকম জানতাম। তিনি কখনো আমাকে তার লেখা পড়তে দেননি। ছাপার জন্যও বলেননি। এই দুঃখটা থেকে যাবে। তার মৃত্যুর প্রায় দশ বছর পরে তার ব্যবহৃত ট্রাংক খুলে তার লেখা কবিতা ও গানের ৯টি খাতা পাই। আমাকে বললে তো সেসব বই হিসেবে বের হতো। খাতার হস্তাক্ষর সাক্ষ্য দেয়, সত্তর দশকের শুরুতে তার লেখালেখি। আশির দশক জুড়ে লিখেছেন। বয়স বিচারে ষাচের দশকেই তার কলম ধরার কথা। তবে খাতাগুলো পড়ে মনে হলো, তিনি স্বভাবকবি। তাই হয়তো আধুনিকতার ডামাডোলে তিনি লুকিয়ে ছিলেন। এখন অবশ্য গর্ব হচ্ছে যে তুষ্টানন্দ ভণিতায় আমার বাবা একজন বড় কবি ছিলেন। তার নাম তুষ্টচরণ বাগচী হলেও গানের ভণিতায় ‘তুষ্টানন্দ’ ও ‘তুষ্টচরণ’ লিখেছেন। লেখালেখির জগতে আমার আসা এখন মনে হচ্ছে পিতার প্রতিভারই ধারাবাহিকতা।

ডেইলি বাংলাদেশ:  ছড়া, কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গবেষণামূলক; অনেক কিছুই লিখেছেন। কোনটার প্রতি বেশি পক্ষপাত? কেন?

তপন বাগচী: আমার প্রথম কবিতাগ্রন্থের নাম ‘কেতকীর প্রতি পক্ষপাত’। তার আগে ছড়া ও কিশোর গল্পের বই বের হলেও কবিতার প্রতিই আমার চিরপক্ষপাত। আমি যা কিছু লি্রেক লিখেছি তা ওই কবিতাচিন্তারই সম্প্রসারণ! সব কথা তো আর কবিতার আকারে বলা যায় না, তাই প্রকরণ বদল করতে হয়। আর এভাবে কবিতাকে কেন্দ্রে রেখে সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় বিচরণ করেছি। তবে তীব্রভাবে সনাক্ত করা যায় কবিতা, প্রবন্ধ আর শিশুসাহিত্য। ছড়া ও গান রচনাকে আমি কবিতাচর্চারই অঙ্গ বিবেচনা করি। 

ডেইলি বাংলাদেশ:  অনেক বিখ্যাতদের নিয়েই আপনার গান রয়েছে। বঙ্গবন্ধু, লালন, আবদুল হামিদ খাঁ ভাসানী, শেখ হাসিনা, মণি সিংহ, ভূপেন হাজারিকা, ভাষাসংগ্রামী আবদুল মতিন, তারামন বিবি, মহাশ্বেতা দেবী, ইলা মিত্রের মতো অনেক চরিত্রই আপনার গানে এসেছে। এই ব্যক্তিবন্দনাকেন্দ্রিক গান লেখার পেছনে বিশেষ কোনো কারণ আছে কি?

তপন বাগচী: প্রধান কারণ হলো মনীষীতুল্য ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। এর প্রায় সকল গানই এদের জন্ম কিংবা মৃত্যর দিনে গীত হয়েছে। বেশিরভাগ গানেরই সুরকার ও শিল্পী ফকির আলমগীর। আরো বিশদ করে বলা যায় যে বেশির ভাগ গানই তার অনুরোধে রচিত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা গানেও তিনি কণ্ঠ দিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে যারা প্রয়াত হয়েছেন তাদের নিয়ে লেখা গানগুলো শহিদমিনারে নাগরিক শোকসভায় গাওয়া হয়েছে। বিশেষত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুচিত্র সেন, আবদুল মতিন ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে নিয়ে লেখা গানগুলো এই উদ্দেশ্যেই রচিত। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে গানটি লেখা হয়েছিল ফরিদপুরে হুমায়ূনমেলার উদ্বোধনী সংগীত হিসেবে গাওয়ার জন্য মফিজ ইমাম মিলনের অনুরোধে। কিন্তু তাদের আয়োজন এতই ব্যাপক ছিল যে উদ্বোধনী গানটিই বাদ রাখতে হয়। হাহাহা…। আবার অনেকের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গাওয়ার জন্যও রচিত হয়েছে কিছু গান। ওয়াহিদুল হক, কামাল লোহানী, মামুনুর রশীদ, আসাদুজ্জামান নূর, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা প্রমুখকে নিয়ে গানগুলো গেয়েছেন ফকির আলমগীর তাঁদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই এই গানগুলো রচিত।

ডেইলি বাংলাদেশ: বর্তমান সময়ের বাংলা গান নিয়ে আপনার বক্তব্য কী?

তপন বাগচী: বর্তমান সময়ে তো গানের কোনো কমতি দেখছি না। ভুল বাণী, ভুল সুর, অচর্চিত কণ্ঠের গানে তো ভরপুর। বাংলাদেশ বেতার আর টেলিভিশন কিছু মান রক্ষার চেষ্টা করছে। আর তো কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যার যার মতো লিখছে, সুর করছে, গাইছে। ছন্দ জানে না, জীবনের এক চরণ কবিতা লেখেননি, তিনিও নামকরা গীতিকার এখন। একটি রাগ চিনতে পারেন না, তিনিও ইউটিউব থেকে সুর চুরি করে সুরকার। আর নোটেশন চেনে না এমন শিল্পীদের এখন জয়জয়কার দেখছি। বড় দুর্দিন এখন বাংলা গানের। তবে আশার কথা হলো এখনো ভালো গান রচিত হয়, এখনো ভালো সুরের মানুষ আছেন, এখনো ভাল শিল্পী রয়েছেন। রসজ্ঞ শ্রোতা তাদের ঠিকই খুঁজে বের করেন। এরা আছেন বলেই আশাহত হইনি।

ডেইলি বাংলাদেশ: প্রায়ই বাংলাগানে সুর নকলের অভিযোগ পাওয়া যায়। আবার দেখা যায় এসব নকল গানই জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। এর কারণ কী?

তপন বাগচী: কেবল সুর নয়, বাণীও চুরির ঘটনা আছে প্রচুর। কেউ তো এসব দেখার নেই। মজার ব্যাপার হলো, ধরা পড়গার পরেও এদের লজ্জা হয় না। এরাই আবার মিডিয়ায় গলাবাজি করে। আর জনপ্রিয়তা কখনোই শিল্পের মাপকাঠি নয়। রাষ্ট্র চালাতে জনপ্রিয়তা দরকার, গণতন্ত্রে জনপ্রিয়তা দরকার। কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে দরকার সমঝদার শ্রোতা ও রসজ্ঞ পৃষ্ঠপোষক। তাদের সংখ্যা সকল সমাজেই কম থাকে। জনপ্রিয় গানই নকল করা হয় নকল গান জনপ্রিয় হয়। আর এরা তো রুচিমান শ্রোতা নন। এদের সংখ্যাই তো বেশি। এই জনপ্রিয়তা স্থায়ী হয় না। আরেকটা নকল গান বাজারে এলে আগের নকলটি সকলে ভুলে যায়।

ডেইলি বাংলাদেশ: এ থেকে উত্তরণের উপায়?

তপন বাগচী: এ থেকে উত্তরণের একটাই উপায় বিচার ও সাজার ব্যবস্থা তৈরি হওয়া। কপি রাইট আইনের আওতায় সাজার সুযোগ কম। আর একটা উপায় হতে পারে, চুরির অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকলে গণমাধ্যম তাকে ঘোষণা দিয়ে বয়কট করা। বেতার টেলিভিশনের তালিকাভুক্তি থেকে বাদ দেওয়া যেতে পারে। গীতিকার হয়তো চুরি করলেন বা নকল গান নিয়ে গেলেন সুরকারের কাছে। সুরকার সেটি বুঝতে পারলে তা বর্জন করা উচিত। পরেও যদি জানা যায় তবে ওই গীতিকারের গান বর্জন করা যেতে পারে। আর সুর নকল করে গান তৈরি করে যারা, তাদের গান কোনো শিল্পী কণ্ঠে তুলে না নিলেই পারেন। আর শ্রোতারা এই চক্রকে সামাজিকভাবে বর্জন করতে পারেন। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন গণমাধ্যম। নকল ও চুরিকে চিহ্নিত করা তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

চলবে...

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর/এমআর