Alexa ব্রাজিল নয়, আমাজনে ক্ষতি পুরো বিশ্বের

ব্রাজিল নয়, আমাজনে ক্ষতি পুরো বিশ্বের

প্রকাশিত: ১৪:৪৫ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯  

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত আমাজনের আগুন প্রায় নিভে গেলেও এর ক্ষতির উত্তাপ এখনো কমেনি। বরং যতই দিন যাবে সেই উত্তাপ বাড়তে থাকবে ক্রমেই। কারণ আমাজন পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেনের জোগান দেয়। 

সেই অক্সিজেনের অভাব আমাদের প্রতিনিয়ত ভোগাবে আরো বেশি। তাই সেই বনের এমন পুড়ে যাওয়া বিশ্ববাসীর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এখন প্রশ্ন হলো এই ক্ষতি কিভাবে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। আপত দৃষ্টিতে কঠিন হলেও একেবারে অসম্ভব নয়।

দুস্প্রাপ্য সব গাছপালার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, কীটপতঙ্গ ও সরীসৃপে ভরপুর আমাজন বনাঞ্চলটি। এর আয়তন প্রায় সাড়ে পাঁচ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার। পুরো বনটি অত্যন্ত দুর্গম। এখানে রয়েছে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং ধন-রত্নের বিপুল সমাহার। যার খোঁজে বিভিন্ন সময়ে মানুষ এখানে আসতো। এখনো সেটি অব্যাহত আছে। এখানে আছে ১২০ ফুট উঁচু গাছ। রয়েছে প্রায় ৪০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ। পাশাপাশি ২ দশিক ৫ মিলিয়ন প্রজাতির কীট-পতঙ্গ। আর ১ হাজার ২৯৪ প্রজাতির পাখি। এয়ড়া ৩৮৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ৪৪৬ প্রজাতির উভচর এবং ৪৩৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণীসহ নাম না জানা হাজারো প্রজাতির অসংখ্য জীব ও অণুজীব। এছাড়া আমাজন নিয়ে রয়েছে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। বিশেষ করে এখানে আছে ৩ হাজার বিভিন্ন প্রকারের ফল। তবে মজার বিষয় হুলো খাওয়ার উপযোগী ফলের সংখ্যা মাত্র ২০০ প্রকারের।  

এখানে আমাজন সম্পর্কে এতো তথ্য তুলে ধরার মূল কারণ আমাজন বন আমাদের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বুঝার জন্য। এতো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পরও আমাদের জন্য অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে এই বনটি জ্বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও ব্রাজিলের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ‘ইনপে’র সচিত্র সমীক্ষার মতে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বনটিতে ৭২ হাজার ৮৪৩টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। মানে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২৯০টির বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আর গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এই হার ৮৩ শতাংশ বেশি। এমন একটি বনকে ধংস করার জন্য এর চেয়ে আর বেশি কিছুর প্রয়োজন হয় না। 

এখানে শঙ্কা বা সঙ্কটের জায়গা হলো আমাজনে নিয়মিত আগুন লাগার ঘটনা মোটেও স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক নয়। এখানে দুটি কারণে মূলত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। একটি প্রাকৃতিক, অন্যটি মনুষ্যসৃষ্ট যার পেছনে থাকে পরিকল্পনা। এখানে অগ্নিকাণ্ডের সময় সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো প্রতি মিনিটে একটি ফুটবল মাঠের সমান বনাঞ্চল পুড়ে যায়। এখানে যে শুধু আগুনে ক্ষতি হয় তা কিন্তু নয়। আগুনে সৃষ্ট ঘন কালো ধোঁয়া ও ছাইয়ের কারণে চার পাশের কয়েক কিলোমিটার জুড়ে সৃষ্টি হয় ধোঁয়া। যা পুরো বিশ্বের আবহাওয়া ও জলবায়ুর জন্য হুমকিস্বরূপ। 

এমনিতেই বর্তমানে পুরো বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি। তার উপর আমাজনের সাম্প্রতিক সময়ে এতো বড় অগ্নিকাণ্ড নতুন করে আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। আরো ভাবিয়ে তুলেছে আমাজনের অগ্নিকাণ্ড নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়টি যখন সামনে এসেছে। আগুন লাগার বিষয়ে ব্রাজিলের ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইরা বোলসোনেরোর দিকে তীর পরিবেশবিদদের। অন্যদিকে, ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট সরাসরি দোষারোপ করেছেন দেশটির এনজিওসহ কৃষকদের। দুই পক্ষের এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগ বিশ্বের শত কোটি মানুষের জন্য দুখঃজনক। 

বিশ্ব যখন প্রতিনিয়ত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করছে সে সময় এমন পাল্টাপাল্টি অভিযোগ প্রমাণ করে আমরা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে খুব একটা ভাবছি না। কেননা, এখানে দুই পক্ষের যদি কোনো এক পক্ষের অভিযোগ সত্য হয় তবে সঙ্কট আরো বাড়বে। অবশ্য এরইমধ্যে জি-৭ সম্মেলনের উদ্যোক্তা হিসেবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বলেছেন আমাজন নিয়ে বিশ্বের অবশ্যই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। সদস্য রাষ্ট্রগুলোরও উচিত হবে আমাজনের এই জরুরি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে এর সমাধানে যথাসাধ্য ভূমিকা রাখা। 

আমাজানের আগুন নিভে গেলেও সারা বিশ্বের মানুষ আজ শঙ্কিত। শঙ্কিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণও রয়েছে। কারণ, জীব বৈচিত্রে ভরপুর আমাজন বন আকারে গোটা ইউরোপীয় মহাদেশের দুই-তৃতীয়াংশ। এই বিশাল বনভূমি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার অর্থ হলো পুরো বিশ্বের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হওয়া। আমাজন বন প্রতিবছর ২০০ কোটি মেট্রিক টন কার্বনডাই অক্সাইড শোষণ করে। আর এ কারণেই মূলত ‘পৃথিবীর ফুসফুস’ বলা হয় আমাজনকে। একজন মানুষ তখনই বেচে থাকেন, যখন তার ফুসফুস কাজ করে। ফুসফুস কাজ না করলে মানুষের পক্ষে বেচে থাকা সম্ভব নয়। তাই পৃথিবীর ফুসফুস যখন পুড়ে যায় তখন আমাদের জন্য বেচে থাকা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে।  

আমাজনের এই অগ্নিকান্ডে সবচেয়ে ক্ষতির সম্মুখিন দরিদ্র দেশগুলো। কারণ আমরা সবসময় দেখেছি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলোর বেশিরভাগই দরিদ্র। এটা অবশ্য কারো মনগড়া তথ্য নয়, এই ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে জার্মানভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জার্মানি ওয়াচের ‘ক্লাইমেট রিক্স ইনডেক্স-২০১৮’র প্রতিবেদনে। এখন আমাজনের অগ্নিকান্ড নতুন করে সেই সঙ্কট আরো ঘনিভূত করবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে এ থেকে উত্তরণের পথ রয়েছে মানুষের হাতেই। এখন বিশ্বব্যাপী সবুজের বিকল্প নেই। কেননা, ব্যাপক বনায়ন পারে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে বিশ্বকে অনেকটা রক্ষা করতে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষায় নীতি নির্ধারকদের টেকসই কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্বের নেতৃবৃন্দকে এক সাথে কাজ করতে হবে এক্ষেত্রে। কারণ সবার সমিম্মিল আন্তরিক প্রয়াসই পারে ভবিষ্যতের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহতা থেকে নিরাপদ রাখতে পারে।

 ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর