Alexa ব্যাংকের মুনাফা খেয়ে নিচ্ছে খেলাপি ঋণ

ব্যাংকের মুনাফা খেয়ে নিচ্ছে খেলাপি ঋণ

মীর সাখাওয়াত সোহেল ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:০৯ ৩০ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ১৪:১৮ ৩০ জুলাই ২০১৯

অঙ্কন: আনিস মামুন

অঙ্কন: আনিস মামুন

প্রতিবছরই বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এর প্রভাবে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত মুনাফায়ও নামছে ধস। গত ছয় মাসে ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা বাড়লেও আনুষঙ্গিক দায়-দেনা ও খরচ শেষে নিট মুনাফা তেমন থাকবে না বলেই মনে করছেন ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিষয়ে সরকারকে আরো কঠোর অবস্থান নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ব্যাংক খাতের এ খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিশাল অংকের নিরাপত্তা প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এই খেলাপি ঋণ না থাকলে মুনাফার পরিমাণ আরো বাড়তো বলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

হাইকোর্টে দেয়া খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত ২০ বছরে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায়যোগ্য ঋণ ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন আদালতের আদেশে আটকে আছে ৮০ হাজার কোটি টাকা ও অবলোপন করা হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। ১০ হাজার ৪৭৬টি হিসাবের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে এই ঋণ নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এখন প্রতিযোগিতার সময়। এ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বেশ কিছু ব্যাংককে ঋণ বিতরণে আগ্রাসীভাব দেখা গেছে। কোন যাচাই বাছাই না করেই ঋণ দিয়ে দিচ্ছে। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে।

খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তা কতটা কার্যকর হবে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে বলে অভিমত দেন ড. সালেহ উদ্দিন। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ কমাতে কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জানা গেছে, ব্যাংকে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এর ফলে তারল্য সংকটও রয়েছে অনেক ব্যাংকে।  ধারাবাহিকভাবে কমছে ঋণ প্রবৃদ্ধি। আমানত ও ঋণের সুদহারেও নেই শৃঙ্খলা। ডলারের বাজারেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। এ সবকিছুর প্রভাব পড়েছে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের (জানুয়ারি-জুন) পরিচালন মুনাফায়।

দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত। প্রতি প্রান্তিকে (তিন মাস অন্তর) ব্যাংকগুলো তাদের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং দুই স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেয়। নিয়ম অনুযায়ী, স্টক এক্সচেঞ্জে জমা দেয়ার আগে ব্যাংকগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে এসব তথ্য জানাতে পারে না।

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া ব্যাংকের পরিচালন মুনাফার যে তথ্য পাওয়া গেছে তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বেড়েছে। তবে তা প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। ব্যাংক সংশ্লিষ্টদের মতে, এবার ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফার বড় অংশই এসেছে কমিশন, সার্ভিস চার্জ ও আমদানি-রফতানি আয় থেকে। ব্যাংকের আয়ের প্রধান খাত ঋণের সুদ হলেও এবার এ খাত থেকে আদায় হয়েছে খুবই কম।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের জুন মাস শেষে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে এক হাজার ২২৩ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৯৫ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ২৮১ কোটি টাকা, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ৪০৫ কোটি টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৩২০ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের ৩৩০ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ২৬৪ কোটি টাকা, সাউথ ইস্ট ব্যাংকের ৫০৫ কোটি টাকা, ডাচ্ বাংলা ব্যাংকের ৫১০ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ৩৩১ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ২৭৩ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬৮ কোটি টাকা, এনসিসি ব্যাংকের ৩৬২ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়ার ৪৬৫ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২৯৭ কোটি টাকা, যমুনা ব্যাংকের ৩১১ কোটি টাকা, মধুমতি ব্যাংকের ৯৮ কোটি টাকা, এনআরবিসি ব্যাংকের ৯০ কোটি টাকা, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের ৯০ কোটি টাকা, মিডল্যান্ড ব্যাংকের ৬৫ কোটি টাকা এবং মেঘনা ব্যাংকের ৪৫ কোটি টাকা।

ব্যাংকগুলো যে পরিচালন মুনাফা করেছে সেখান থেকে ব্যাংকের ঋণ ও খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে লোকসানে থাকার বিপরীতে প্রভিশনের পরিমাণ আরো বাড়বে। ফলে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফাও কমবে।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, দীর্ঘ দিনে বিশাল অঙ্কের এই ঋণ খেলাপি হয়েছে। ব্যাংকগুলোর যেমন ব্যর্থতা আছে, তেমনি রাজনৈতিক দায়ও আছে বলেও মনে করেন তিনি। তবে এই প্রবণতা দেশের আর্থিকখাতের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

ডেইলি বাংলাদেশ/এমআরকে/এস

Best Electronics
Best Electronics