‘বোমার ক্ষতগুলোই আমার গর্ব’

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেকের বীরত্বগাথা

‘বোমার ক্ষতগুলোই আমার গর্ব’

চয়ন বিশ্বাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৩৬ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক (ডানে)। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

নিজ বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক (ডানে)। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মুক্তিযুদ্ধের সময় কসবা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়তেন। কতই বা বয়স তখন, ১২ বছর? ওই বয়সেই দেশ মাতৃকার টানে শত্রু দমনে ঝাঁপিয়ে পড়েন অস্ত্র হাতে।

গল্পটা খেতাবপ্রাপ্ত কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেকের। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার ধরখার গ্রামের শহিদ আবুল হাসেমের ছেলে। রণাঙ্গনে সাহসী ভূমিকা রাখায় বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন আবু সালেক। ডান হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন।

চাচা হামিদুল হকের অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে বাড়ি থেকে আধা মণ ধান চুরি করে পালাই- এভাবেই গল্পটা শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক।

তিনি বলেন, যুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ নিতে হবে, যেতে হবে ভারতে। ওই বয়সে এত টাকা ছিল না আমার। বাবা-মাকে বললে তো যেতেই দেবে না। তাই কাউকে না জানিয়ে টাকা জোগারের জন্য ধান চুরি করে পালাই। ওই রাতেই চাচার সঙ্গে হেঁটে রওনা হই ভারতের ত্রিপুরায়। ওই রাজ্যের কংগ্রেস ভবনের কাছে পৌঁছে ধানগুলো মাড়াই করে ৭২ টাকায় চাল বিক্রি করি। পরে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যাই।

প্রশিক্ষণের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বয়স কম হওয়ায় আমাকে তো প্রথমে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নেয়াই হয়নি। অনেক কান্নাকাটি করে প্রশিক্ষণ শিবিরে যোগ দেই। ২০-২৫ দিন প্রশিক্ষণ শেষে গ্রেনেড ও অস্ত্র নিয়ে দেশে ফিরে যুদ্ধে যোগ দেই।

১৯৭১ সালের ২২ নভেম্বর শত্রুসেনার বোমার আঘাতে মারাত্মক আহত হন কিশোর আবু সালেক। সেই স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ওই দিনটি কোনোদিন ভুলবো না। কোরবানির ঈদের আগের দিন কসবার চন্ডিদোয়ার আর লতুয়ামোড়া এলাকায় একটি ক্যাম্পে প্রায় দেড়শ পাক সেনা ছিলো। আমরা আড়াইশ মুক্তিযোদ্ধা ওই ক্যাম্পের কাছে অবস্থান নেই। কথা ছিল ভোর ৫টা থেকে ৫টা ১০ মিনিটের মধ্যে ওই ক্যাম্পে বোমা ফেলা হবে। কিন্তু সময়মতো বম্বিং হচ্ছিল না। আমরা চিন্তায় পড়ে যাই। এক পর্যায়ে দিনের আলো ফুটতে দেখে আমরাই আক্রমণ শুরু করি। ক্যাম্পটি ছিল পাহাড়ের মধ্যে। সম্মুখযুদ্ধে অনেক পাকিস্তানী নিহত ও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। এক পর্যায়ে শুরু হয় বম্বিং। তাতে আমাদের অনেকেই শহিদ হন। আমিসহ চারজন এক বাংকারে ছিলাম। বোমার আঘাতে তিনজন মারা যান, আমি বেঁচে যাই। আহত অবস্থায় আমাকে ভারতের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাংলাদেশ-ভারতের সময়ের ব্যবধানের কারণে আধঘণ্টা দেরিতে বম্বিং শুরু হয়। ওইদিনের বোমার আঘাতে আমার সারাদেহে অসংখ্য ক্ষত সৃষ্টি হয়। ক্ষতগুলো আমার গর্ব।

অস্ত্র হাতে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক

এ কিশোর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, প্রায় চার-পাঁচ মাস ভারতের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। ১৯৭২ সালের ২৮ এপ্রিল আমাকে যশোর সামরিক হাসপাতালে এনে ভর্তি করা হয়।

রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক। সে অনুভূতি তার আজও উজ্জ্বল। তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর। দেশ স্বাধীন হওয়ার খবরে আমরা কী যে আনন্দ পাই, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সেদিন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাকে এক হাজার টাকা ও একটি রেডিও দিয়ে আসেন। একইদিন বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে পাঁচশ টাকা পাই। আমার বাবা আবুল হাসেমও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধে তিনি শহিদ হন। ৮০’র দশকে বাবার নামেই গ্রামের নাম হয় হাসেমপুর।

আরেকটি যুদ্ধস্মৃতি রোমন্থন করে মুক্তিযোদ্ধা আবু সালেক বলেন, কসবার চন্দ্রপুরে কোম্পানি কমান্ডার লে. আব্দুল আজিজের নেতৃত্বে আমরা ১৪-১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা ওৎ পেতে থাকি। ওই গ্রামে পাক বাহিনীর বড় একটা ক্যাম্প ছিলো। ক্যাম্পে অতর্কিত হামলা করাই ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু তাদের অস্ত্র ভান্ডারের সঙ্গে পেরে ওঠা খুবই দুষ্কর। তখন কমান্ডার বললেন- পাক বাহিনীকে ফাঁদে ফেলতে হবে। তার নির্দেশে আমরা রাত ১০টা থেকে সড়কের পাশে আত্মগোপন করি। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পাক বাহিনীর ১৫-২০ জনের একটা দল যাওয়ার সময় তাদের ওপর ফায়ারিং শুরু করি। ফায়ারিং চলে প্রায় দুই ঘন্টা। এরপর পরিবেশ শান্ত হয়ে যায়। রাত আড়াইটায় পাক বাহিনী পূর্ণ শক্তি নিয়ে আমাদের ওপর পুনরায় হামলা করে। ভয়াবহ হামলা সেই হামলায় আমরা হতভম্ব হয়ে পড়ি। তখন কমান্ডার বললেন, তাদের সঙ্গে আমরা পারবো না, মৃত্যু ছাড়া কোন উপায় নেই। পিছু হটলেও আমাদের মরতেই হবে। বাঁচতে হলে আমাদের মধ্যে একজনকে কভারিং ফায়ার করতে হবে। তখন আমি বলি- আমি ছোট, পাক বাহিনী কিছু বুঝতে পারবে না। কভারিং ফায়ার আমিই করবো। এরপর কমান্ডারের দেখানো বাংকারে পজিশন নিয়ে আমি পাক বাহিনীর উপর অনবরত ফায়ারিং করি। ঘন্টাখানেক পর মুক্তিযোদ্ধারা নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। ভোর সাড়ে চারটা পর্যন্ত পাক বাহিনী আছে কি না তা দেখার জন্য অপেক্ষা করি। এক পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে বাংকারেই ঘুমিয়ে পড়ি। ভোর সাড়ে ৬টায় কমান্ডারসহ বাকিরা এসে দেখে আমি অস্ত্র বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছি।

স্বাধীন দেশ-স্বাধীন পতাকা লাভের সেই আনন্দ অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহবানে ও দেশ মাতৃকার টানে আমরা যুদ্ধে গিয়েছিলাম। দেশকে শত্রুমুক্ত করেছি, স্বাধীন করেছি। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে তিন মেয়ে ও দুই ছেলের বাবা আবু সালেক। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ আমরা ভালো আছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের যথাযথ মূল্যায়ন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানের ও মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন। সাহায্য, সহযোগিতা, ভাতাসহ বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এআর