Alexa বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোমন্দ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোমন্দ

প্রকাশিত: ১৫:৫৯ ৬ নভেম্বর ২০১৯  

ড. ফারজানা আলম, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলদেশের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং সহযোগী অধ্যাপক। তিনি যুক্তরাজ্য থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা করছেন। তার গবেষণার অন্যতম ক্ষেত্র- ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে সমজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ উন্নয়ন।

শেখার কোনো বয়স নেই, জানার কোনো শেষ নেই। কিন্তু যে শিক্ষা সম্পন্ন করার পর সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, তার জন্য মূল্য পরিশোধ করতে হয়। 

সরকারি  বিশ্ববিদ্যালয়ে  উচ্চশিক্ষা নিলে সেই ছাত্রের পেছনে বিনিয়োগ করে সরকার, তাই খুব স্বল্প খরচে মানসম্পন্ন পড়াশোনা করা যায়। কিন্তু সুযোগ পাওয়া সহজ নয়। এবারে পাশ করেছে প্রায় দশ লাখের মত ছাত্র-ছাত্রী। তার বিপরীতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট আসন সংখ্যা মাত্র পঞ্চাশ হাজারের মত! বাকি থাকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। যতই দিন যাচ্ছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দিনে দিনে ততই জৌলুস হারাচ্ছে। তাদের সার্টিফিকেটের মান কমে যাচ্ছে। তখন উচ্চশিক্ষা নেবার একমাত্র যে রাস্তা খোলা থাকে তা হলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পার্থক্য হলো এখানে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যক্তিগত ভাবে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। তাই খরচটা বেশি মনে হয়। যেকোন উচ্চশিক্ষাই ব্যয়বহুল। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারের দেয়া ভর্তুকিটা চোখে পড়ে না বলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যয়বহুল মনে হয়। কিন্তু এটাও ঠিক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে বলেই এদেশে গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যা বাড়ছে। তা না হলে তরুণ সমাজকে হতাশা এবং বেকারত্ব আরো গ্রাস করে নিতো। দেশে প্রায় শ’খানেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় আড়াই লক্ষ ছেলেমেয়ে প্রতি বছর ভর্তি হচ্ছে যা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের বার্ষিক ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের ৫৫ শতাংশের মত। দেশে শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের ভূমিকা আসলে কি এবং কতোটুকু? একটু ঝালাই করে নেয়া যাক।

বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়: 
আগে সামর্থ্যবান মেধাবীরা মান সম্পন্ন উচ্চশিক্ষার জন্যে অনেকেই বিদেশে চলে যেতো, ২০১৩ সালের এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, কেবল Tuition fee বাবদ ৩৫ কোটি টাকা আর Tuition fee, আবাসন এবং অন্যান্য খরচ হিসেবে কমপক্ষে ২৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়েছে দেশের মানসম্পন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বদৌলতে।

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান: 
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পকেটের টাকায় Tuition fee দিতে হয় বিধায় ছাত্র-ছাত্রী এবং তাদের পরিবার নিজেরাই পড়াশোনা এবং রেজাল্টের ব্যাপারে সতর্ক থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ব্যক্তি মালিকানায় হওয়ায় সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজি, দখলদারী জনিত ছোটখাট সমস্যা হলেও কর্তৃপক্ষ নিজেদের সুনাম রক্ষায় অত্যন্ত দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে সমস্যা গুলো দমন করে থাকে।

র‌্যাগিং এর বিষমুক্ত: 
সিনিয়রদের দুষ্ট প্রভাব নেই, নেই “র‌্যাগিং” এর মতো অপসংস্কৃতি বা অপরাধের দৌরাত্ম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শুরু থেকেই ছাত্র-ছাত্রীরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে ছাত্র জীবন শুরু করে।

Credit Transfer: 
যেকোন গ্র্যাজুয়েশনের মেয়াদই প্রায় ৪ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বহু শিক্ষার্থীরই নানাবিধ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বা স্থান পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে। এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের Credit Transfe এর কাজটি সহজ সাধ্য ব্যাপার। তাই ঝরে পড়ার হার কম, অনায়াসেই তারা গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতে পারছে।

চাকরির বাজারে চাহিদা সম্পন্ন ডিগ্রী: 
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সবসময় চেষ্টা করে চাকরীর বাজারে চাহিদা আছে এমন সব ডিগ্রী প্রোগ্রামগুলো চালু করতে। উচ্চ বেতনে চাকরীর সম্ভাব্যময় Hybrid Course গুলো অফার করার ব্যাপারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বরাবরই বেশি। এ ধরনের কোর্সগুলোর মধ্যে রয়েছে BBA, MBA, BSc in Civil, EEE, CSE, Telecommunication, MIPE, Mechatronix Engineering, Textile, Fashion Engineering, Petro Chemical Engineering ইত্যাদি।

বছরব্যাপী পরীক্ষার ব্যবস্থা:
সমস্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার ভিত্তিক লেখাপড়া হয় বছরে ৩টি বা ২টি সেমিস্টার। প্রতি সেমিস্টারে Class test, Quiz, Tutorial, Assignment, Presentation, Mid terms, Term final ইত্যাদি নানান পরীক্ষা সারাবছরই ছাত্র-ছাত্রীদেরকে লেখাপড়া নিয়েই ব্যস্ত রাখে। প্রতি মাসে অন্যূন একটি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ই ফলে পরীক্ষার চাপ সারাবছরই মৃদুমন্দ ভাবে ছড়িয়ে থাকে, তাই ছাত্রজীবনটা হয় ঠিক ছাত্রজীবনের মতোই।

নিয়মিত পরীক্ষা:
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরীক্ষা নেয়ার ব্যাপারে অত্যান্ত নিয়মিত এবং পরীক্ষার ফলাফলও ঘোষণা করা হয় সময় মত। সেশন জটের অভিশাপ মুক্ত প্রতিষ্ঠান।

পৌনঃপুনিক প্রতিযোগিতা
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফলাফল ঘোষণা হয় নিয়মিত, পরীক্ষা শেষ হওয়ার ২ সপ্তাহের মধ্যে। প্রতি সেমিস্টারেই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যে নানান Award এর ব্যবস্থা রাখা হয়। নিজের অবস্থা যাচাই করার জন্য বা নিজেকে তৈরি করার জন্য ছাত্র-ছাত্রীরা বছরে বেশ কয়েকবার সুযোগ পায়। এই প্রতিযোগিতা গুলোই উৎসাহের আরেক নাম।

সাংস্কৃতিক চর্চা: 
প্রতি সেমিস্টারেই নতুন ছাত্র-ছাত্রীরা আসে, বিদায় নেয়। নিয়মিত নবীনবরণ, বিদায় সংবর্ধনা, নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রতিযোগিতা, ক্লাব ভিত্ত্বিক ইভেন্ট ইত্যাদি সুস্থ্য সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যহত রাখার জন্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একটি আদর্শ জায়গা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এখন বিশ্বব্যাপী নিজেদের তুলে ধরছে, সম্মান পাচ্ছে, সম্মান আনছে। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর