বেশিরভাগ প্রজাপতির ভাগ্যেই মিলন জোটে না!

বেশিরভাগ প্রজাপতির ভাগ্যেই মিলন জোটে না!

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:০৪ ২৩ মে ২০২০  

ছবি: প্রজাপতি

ছবি: প্রজাপতি

প্রজাপতির কথা মনে হতেই অনেকেই গেয়ে ওঠেন- ‘প্রজাপতি, প্রজাপতি, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা? টুকটুকে লাল নীল ঝিলিমিলি আঁকাবাঁকা, কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা?’ 

সত্যিই রং বেরঙের প্রজাপতি প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় হাজারগুণ। পৃথিবীতে এদের আবির্ভাব ঘটেছিল প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছর পর্বে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় ২০ হাজার প্রজাতির প্রজাপতির দেখা পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের (আইইউসিএন) তথ্য মতে বাংলাদেশেই রয়েছে ৩০৪ প্রজাতির প্রজাপতি। 

জানেন কি? অনিন্দ্য সুন্দর এই প্রজাপতির জীবন চক্র মাত্র অল্প কিছুদিনের। এর রয়েছে নানা মজার ও আকর্ষণীয় অনেক তথ্য। যেগুলো আপনাকে মুগ্ধ করবে পতঙ্গটির রূপের মতোই। কাদা থেকে পানি পান করা, পা দিয়ে স্বাদ গ্রহণ, কম দৃষ্টিশক্তি, ঠাণ্ডায় জমে যাওয়াসহ রয়েছে মজার সব তথ্য। ডেইলি বাংলাদেশের সাতরংয়ের আয়োজনে থাকছে রঙিন এই পতঙ্গটির নানা অজানা কথাই। তবে চলুন জেনে নেয়া যাক সেসব-

প্রজাপতির জীবনচক্র খুব কম সময়েরজীবনচক্র

রঙিন এই পতঙ্গটির জীবনকাল মাত্র কিছুদিনের। প্রজাপতি কত দিন বাঁচে সেটা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে প্রজাতিভেদে প্রজাপতিরা এক সপ্তাহ থেকে এক বছরও বাঁচতে পারে। সাধারণত প্রজাপতির জীবনকাল হয়ে থাকে এক মাসেরও কম। প্রজাপতির জীবনচক্রের চারটি ধাপ রয়েছে। এগুলো হলো- ডিম, লার্ভা, পিউপা এবং পরিণত প্রজাপতি।

ডিম- স্ত্রী প্রজাপতি সাধারণত পাতার ওপর ডিম পাড়ে। এই ডিমগুলোর চারপাশে কোরিওন নামের এক ধরনের শক্ত আবরণ থাকে। আর ডিমগুলো যাতে পাতা থেকে না পড়ে যায় তার জন্য এক ধরনের আঠালো পদার্থ দিয়ে আটকানো থাকে পাতার সঙ্গে। কোনো কোনো প্রজাপতি কেবল নির্দিষ্ট কোনো গাছের পাতাতেই ডিম পাড়ে। 
আবার কোনো কোনো প্রজাপতি ডিম পাড়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট গাছকে বেছে নেয়। ডিম অবস্থায় বেশ কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় অতিবাহিত হয়। শীতের আগে আগে ডিম পাড়া হলে সেগুলোকে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রাখা হয় এবং শীত শেষ হলে বসন্তে ডিম ফোটে বাচ্চা বের হয়। অনেক প্রজাপতি আবার বসন্তে ডিম পাড়ে এবং সেগুলোর বাচ্চা ফোটে গ্রীষ্মে।

লার্ভা- প্রজাপতির ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। এগুলোকে ইংরেজিতে ক্যাটারপিলার, বাংলায় বিছা বা শুঁয়োপোকাও বলা হয়ে থাকে। এরা খুব দ্রুত বড় হয় এবং এদের বড় হওয়ার জন্য প্রচুর খাবার দরকার হয়। সাধারণত গাছের পাতা খেয়ে থাকে এরা। দুয়েকটি প্রজাপতি অবশ্য পতঙ্গও খেয়ে থাকে। লার্ভা থেকে পিউপা হওয়ার জন্য কয়েকদিন সময় লাগে। এই সময়ের শেষ ভাগেই ডানা তৈরি হয়।

রং বেরঙের ডানার প্রজাপতিপিউপা- লার্ভা বা ক্যাটারপিলার অবস্থার শেষ সময়ে বিশেষ এক ধরনের হরমোন নিঃসৃত হয় এবং লার্ভাগুলো পিউপায় পরিণত হওয়ার জন্য সাধারণত নিজেদের আকারের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বড় আকারের পাতার নিচের দিকে আশ্রয় গ্রহণ করে। এসময় এদের শরীরের চারপাশে নতুন এক ধরনের খোলস তৈরি হয় এবং এগুলো সাধারণতই নিশ্চল অবস্থায় পাতার সঙ্গে এঁটে থাকে। পিউপা অবস্থাতেই পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতির গঠন সম্পূর্ণ হয়।

প্রজাপতির জন্ম- পিউপা অবস্থায় সপ্তাহ দুয়েক সময় কাটানোর পর বাইরের খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে রঙিন প্রজাপতি। তবে শুরুতেই প্রজাপতি উড়তে পারে না। এদের ডানাগুলো ভেজা অবস্থায় থাকে। বেশিরভাগ প্রজাপতির ডানা শুকিয়ে নিতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। অনেকের ক্ষেত্রে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ও লাগতে পারে। ডানা শুকালে তবেই উড়ে বেড়ানো শুরু করে প্রজাপতি। 

প্রজাপতির রঙিন ডানার রহস্য 

প্রজাপতির বর্গ লেপিডোপ্টেরা হচ্ছে একটি ল্যাটিন শব্দ যা দুটি গ্রিক শব্দ লেপিস ও টেরন-এর সমন্বয়ে গঠিত। লেপিস অর্থ স্কেল বা আঁশ এবং টেরন অর্থ উইং বা পাখা। অর্থাৎ শাব্দিকভাবে লেপিডোপ্টেরা মানে হচ্ছে আঁশযুক্ত পাখা। কখনো প্রজাপতি হাত দিয়ে ধরে দেখেছেন? ধরলে দেখবেন আপনার হাতে এক ধরনের রঙিন কিছু লেগে গেছে। এগুলো হচ্ছে প্রজাপতির শরীরের আঁশ। 

প্রজাপতিপ্রকৃতপক্ষে প্রজাপতির পাখা হচ্ছে স্বচ্ছ, বর্ণহীন পর্দা। যাতে বিভিন্ন ধরনের আঁশ বিভিন্নভাবে সজ্জিত হয়ে আলোর ইরিডিসেন্ট ধর্মের মাধ্যমে নানা রঙের সৃষ্টি করে। একটি ছোট প্রজাপতির পাখায় ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন আঁশ থাকে। মূলত এসবের উপস্থিতির কারণেই প্রজাপতিকে বিভিন্ন রঙে দেখে থাকি। প্রজাতি ভেদে এসব আঁশের সজ্জাতে অনেক পার্থক্য দেখা যায়। 

গড়ে এ আঁশগুলো লম্বায় ১০০ মাইক্রোমিটার ও প্রস্থে ৫০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আলো যখন বিভিন্ন স্তরে সজ্জিত এসব আঁশের ওপরে এসে পড়ে তখন বিভিন্ন তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলো বিচ্ছুরণ করে। ফলে আমাদের চোখে বিভিন্ন রং এসে ধরা পড়ে। হাজারো রঙের প্রজাপতি দেখা যায়। জানেন কি? প্রজাপতির শরীরে মেলানিন বা এমন ধরনের কোনো রঞ্জকের উপস্থিতি নেই। তাহলে কেন এমন বর্ণিল হয় প্রজাপতির পাখা? 

বিজ্ঞানীদের ধারণা, বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করা, বিপরীত লিঙ্গের সদস্যকে চিনতে পারা ও শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতেই প্রজাপতির এমন বর্ণিল চেহারা। তবে দুর্ভাগ্যবশত অনেক প্রজাতির কপালেই মিলন ঘটে না। এর কারণ হতে পারে এদের সংক্ষিপ্ত জীবনকাল। বেশিরভাগ প্রজাপতি দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে এবং রাতে বিশ্রাম নেয়। এরা একা একা বা দলবদ্ধ হয়ে বাস করে। 

নীল প্রজাপতিফুলে ফুলে উড়ে মধু খাওয়ার সময় পরাগায়ন ঘটিয়ে থাকে প্রজাপতি। মাইগ্রেটরি ধরনের কিছু প্রজাপতি রয়েছে যেগুলো চার থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করে থাকে। প্রজাপতি শুনতে পায় না। তবে এরা কম্পন অনুভব করতে পারে। এরা পায়ের সাহায্যে স্বাদ গ্রহণ করে থাকে। আর এদের অ্যান্টেনা বা শুঁড়ের সাহায্যে গন্ধ পায়। এদের রঙিন ডানার মাধ্যমে এরা অন্যদের আকৃষ্ট করে। শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্যও রঙিন ডানা সহায়তা করে প্রজাপতিকে।

নানা জনের বিশ্বাসে প্রজাপতি

রঙিন ডানার এই পতঙ্গটি নিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষের রয়েছে নানা বিশ্বাস। প্রজাপতি কারো কাছে ভালোবাসার প্রতীক। আবার কারো কাছে মৃত আত্মার অন্য রূপ। গ্রিকরা বিশ্বাস করে, প্রতিটি প্রজাপতির জন্মের সঙ্গেই মানুষের আত্মার জন্ম হয়। অন্যদিকে জাপানীদের বিশ্বাস, যার ঘরে প্রজাপতি প্রবেশ করে, তার সবচেয়ে পছন্দের ব্যক্তিটি তাকে দেখতে আসে। দুইটি প্রজাপতিকে একসঙ্গে উড়তে দেখাকে চীনারা ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে মনে করে।

প্রাচীন ইউরোপিয়ানরা মনে করত মানুষের আত্মা প্রজাপতির রূপ ধারণ করে থাকে। আইরিশদের বিশ্বাস মৃত মানুষের আত্মা স্বর্গে প্রবেশের আগ পর্যন্ত প্রজাপতি হয়ে থাকে। মায়ানরা বিশ্বাস করত, মৃত যোদ্ধাদের আত্মা পৃথিবীতে প্রজাপতি হিসেবে বিচরণ করে। এই তো গেল বিশ্বের অন্যান্য দেশের মানুষের ধ্যান ধারণা। আমাদের দেশেও রয়েছে প্রজাপতি নিয়ে নানা ধরনের বিশ্বাস। দেশের অনেক জায়গায় মনে করা হয় অবিবাহিত কারো গায়ে প্রজাপতি বসলে তার বিয়ের সময় হয়েছে। এছাড়া প্রজাপতিকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করেন অনেকে। 

ফুলের মধু খাচ্ছে প্রজাপতিপ্রকৃতির সবচেয়ে রঙিন পতঙ্গ প্রজাপতি। নানা রঙে রাঙানো প্রজাপতির মূল সৌন্দর্য তাদের হাজারো রঙের ডানা। খাদ্য শৃঙ্খলার নিচের দিকের প্রাণী হওয়ায়, পাখি, মাকড়শা, টিকটিকি ও অন্যান্য আরো অনেক প্রাণীর খাদ্য তালিকাতেই প্রজাপতি রয়েছে। আত্মরক্ষার জন্য তাদের কোনো শক্তিশালী উপায় না থাকায় শিকারির হাত থেকে বাঁচতে প্রজাপতির সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছদ্মবেশ। ডানার রং ও নকশার সঙ্গে মিলিয়ে আশ্রয়স্থল নির্ণয় করতে পারলে সহজেই শিকারের নজর এড়িয়ে যেতে পারে এরা। 

অবশ্য কিছু প্রজাপতি আবার ছদ্মবেশের ঠিক বিপরীত কৌশল অবলম্বণ করে। অত্যন্ত কড়া রঙের নকশার মাধ্যমে এরা নিজেদের উপস্থিতি একরকম সগৌরবের ঘোষণা করে বেড়ায়। অত্যন্ত রঙিন কিছু পতঙ্গ বিষাক্ত হওয়ায় শিকারি প্রাণীগুলো এদের এড়িয়ে চলে, আর এ সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে কিছু প্রজাপতি। প্রজাপতিরা বিষাক্ত নয়, তবে বিষাক্ত পতঙ্গের নকশার গড়নে কিছু প্রজাপতির ডানা রাঙানো থাকলে তা আত্মরক্ষায় বেশ কাজে দেয়।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস