Alexa বৃক্ষমেলাও হোক প্রাণের মেলা

নি য় মি ত ক লা ম

বৃক্ষমেলাও হোক প্রাণের মেলা

প্রকাশিত: ১২:৪৯ ২৬ জুন ২০১৯  

দৃশ্যত পরিচয়ে সাহাদাৎ রানাকে সাংবাদিক হিসেবেই চেনে সবাই। তবে শুধু সাংবাদিক তিনি নন। গল্প, কবিতা লেখা, সাংগঠনিক দক্ষতাসহ তার রয়েছে নানা গুণ। বর্তমানে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজে কর্মরত রয়েছেন। দায়িত্ব পালন করেছেন সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। জাতীয় প্রেসক্লাবের স্থায়ী সদস্য এই সাংবাদিক।

মেলা মানেই আনন্দের উপলক্ষ্য। মেলা মানেই সানন্দ উৎসব। আর বাঙালি মাত্রই আবহমানকালের মেলাপ্রেমী। বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে তাই মেলার সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। 

গত দুই দশক ধরে বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ্যে প্রায় সারা দেশেই জমে ওঠে বিভিন্ন রকমের মেলা। এর মধ্যে সবকিছুকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে জমজমাট বা প্রাণের মেলা হিসেবে যেটাকে ভাবা হয় সেটার বড় উদাহরণ অমর একুশে বইমেলা। এখন প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উপলক্ষ্যে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে সোরওয়ার্দী উদ্যানে চলে অমর একুশে বইমেলা। প্রিয় লেখকদের বই কিনতে সবাই যেখানে ভিড় করেন ছোট থেকে সব বয়সী লোকজন। দীর্ঘ পথচলায় দিনদিন এখন বইমেলা হয়ে উঠেছে সবার প্রাণের মেলা। প্রতি বছর বইমেলায় লোকসংখ্যা বৃদ্ধিই এর বড় উদাহরণ। এর জন্য মেলার পরিসর বৃদ্ধিও করতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। স্টলের সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অঙ্কের সংখ্যাটাও নেহায়েত কম নয়। নব্বই দশকের শুরতে রাজধানীবাসী আরও একটি মেলার সঙ্গে পরিচিত। যেটা বাণিজ্যমেলা। প্রতিবছর জানুয়ারি মাসজুড়ে এই মেলা নগরবাসীর উদযাপনের অংশ হয়েছে। শেরেবাংলা নগরে প্রতি বছর বাণিজ্যমেলায় ক্রেতার সংখ্যা দিনদিন বাড়ছেই। দেশি ও বিদেশি রকমারি পণ্যের বিপুল সমারোহে, আগ্রহীদের উপস্থিতিও হয় ব্যাপক। এখানেও অর্থনীতির হিসেবের অঙ্কটা অনেক বড়। নানা পণ্যের বাণিজ্যেও হয় ভাল।

অনেক দিন আগে থেকে শুরু হলেও সম্প্রতি রাজধানীবাসী আরও একটি মেলার সঙ্গে ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছে। এটি বৃক্ষমেলা। বর্তমানে বাণিজ্য মেলার স্থান আগারগাঁওয়ে প্রতি বছরই বসছে এই বৃক্ষমেলা। যেখানে বিভিন্ন গাছ-গাছালিতে ভরে উঠে মেলা প্রাঙ্গন। যদিও এই মেলাটি সেই আশির দশক থেকেই আয়োজিত হচ্ছে। আগে এর ভেন্যু ছিল পুরনো বিমানবন্দরে। যাহোক, এবারও রাজধানীর ঢাকায় শুরু হয়েছে বৃক্ষমেলা-২০১৯। মূলত প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করার সাথে সাথে শুরু হয় বৃক্ষমেলা। তবে এবার এবার ঈদুল ফিতরের কারণে কয়েকদিন পিছিয়ে ২০ জুন থেকে শুরু হয়েছে জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০১৯। এর উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বায়ুদূষণ’। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বৃক্ষমেলা উদ্বোধন করে বলেন- আগামী প্রজন্ম যেন সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, টিকে থাকতে পারে, সেজন্য শতবর্ষব্যাপী ডেল্টা প্ল্যান নিয়ে সরকার কাজ করছে। এছাড়া দেশের নাগরিকদের প্রত্যেককে কর্মস্থলে ও বাসস্থানে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর এমন আহ্বান সত্যিই সময়পোযোগী। কারণ প্রত্যাশা অনুযায়ী বৃক্ষরোপন করতে না পারলে সঙ্কটে পড়বে আগামী প্রজন্ম। এটা সত্যি, এখন আমাদের আগামী প্রজন্মকে বাসযোগ্য দেশ দিয়ে যাওয়ার জন্য বৃক্ষ রোপনের কোনো বিকল্প নেই। তাই সবাইকে বেশি বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। 

বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর সন্দর আয়োজন করছে বৃক্ষমেলাকে ঘিরে। দিনদিন আয়োজন ও স্টলের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে বৃক্ষ নিয়ে গবেষণার নানান বিষয়ে অবহিতকরণের বিষয়গুলোও। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন স্টলও রয়েছে মেলায়। কিন্তু সেই তুলনায় দর্শনার্থী সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও সেভাবে বাড়ছে না বৃক্ষ কেনার ক্রেতার সংখ্যা। শুধু কিছু সবুজপ্রেমীরাই বলতে গেলে ছুটে যান এই বৃক্ষমেলায়। যারা কিনে নেন তাদের পছন্দের বৃক্ষটি। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু আমাদের প্রয়োজনে গাছকে আরও বেশি করে ভালবাসতে হবে

লেখা শুরু করেছিলাম মেলার প্রসঙ্গ দিয়ে। আবার সেখানেই ফিরে যাই। ঢাকায় বইমেলা ও বাণিজ্যমেলা দিনদিন জমে উঠছে। এটা আমাদের জন্য আনন্দের খবর। ভবিষ্যতে বইমেলা ও বাণিজ্যমেলার প্রসার ও পরিসর আরও বাড়বে প্রত্যাশাও তেমন। তবে এক্ষেত্রে বৃক্ষমেলা নিয়ে রয়েছে কিছু হতাশা। দীর্ঘ পথ চলায় এগিয়ে চললেও সেভাবে এখনও জমে ওঠে না বৃক্ষমেলা। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর সন্দর আয়োজন করছে বৃক্ষমেলাকে ঘিরে। দিনদিন আয়োজন ও স্টলের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে বৃক্ষ নিয়ে গবেষণার নানান বিষয়ে অবহিতকরণের বিষয়গুলোও। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন স্টলও রয়েছে মেলায়। কিন্তু সেই তুলনায় দর্শনার্থী সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও সেভাবে বাড়ছে না বৃক্ষ কেনার ক্রেতার সংখ্যা। শুধু কিছু সবুজপ্রেমীরাই বলতে গেলে ছুটে যান এই বৃক্ষমেলায়। যারা কিনে নেন তাদের পছন্দের বৃক্ষটি। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু আমাদের প্রয়োজনে গাছকে আরও বেশি করে ভালবাসতে হবে। রোপন করতে প্রচুর বৃক্ষ। বৃক্ষমেলায় গিয়ে বিভিন্ন বৃক্ষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে কিনতে হবে গাছ। এরপর তা নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় বা ছাদে রোপন করতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমরা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক হুমকির সম্মূখিন হচ্ছি। আধুনিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমরা যা যা ব্যবহার করছি, তার কারণে প্রতিদিনই পরিবেশে দূষণ ছড়াচ্ছে। এর প্রতিরোধে এখন আর বৃক্ষ রোপনের কোন বিকল্প নেই। সারা দেশ, বিশেষ করে ঢাকা শহরকে আরও বেশি বৃক্ষ দিয়ে ভড়িয়ে দিতে হবে। কারণ ঢাকা শহরে প্রয়োজনের তুলনায় বৃক্ষের সংখ্যা একেবারে কম। এই কার্যকক্র অবশ্য ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে। সব সময়ের জন্য।

তবে আশার কথা, এ বিষয়ে এখন আমরা আগের তুলনায় কিছুটা সচেতন হয়েছি। তবে শুধু বনজ বৃক্ষ নয়, পাশাপাশি ফলজ, ভেষজ গাছ লাগানো প্রয়োজন, আমাদের নিশ্চিত যাপনের প্রয়োজনে। আমরা অনেকে গাছ লাগিয়ে নিজের দায়িত্ব শেষ মনে করি। কিন্তু শুধু গাছ লাগালেই হবে না, গাছের যথাযথ পরিচর্যাও করতে হবে। প্রত্যেকে নিজের এলাকায় প্রচুর গাছ লাগাতে হবে। এতে কয়েক বছর পর গাছ বিক্রি করে যেমন টাকাও পাওয়া যাবে, তেমনি বছর বছর ফল পেয়ে মনও খুশি থাকবে। তাজা ও বিষমুক্ত ফল খেতে পারবে পরিবারের সবাই। আর এই বাগান এখন যে কোন জায়গাতেই করা যায়। বিশেষ করে ছাদবাগান সবিশেষ জনপ্রিয়। এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- শুধু নিজেরা বৃক্ষ রোপন করলে হবে না। নিজেদের ছেলে-মেয়েদেরও বৃক্ষরোপণে আগ্রহী করে তুলতে হবে। বৃক্ষের প্রতি ভালবাসা শেখাতে হবে। বুঝাতে হবে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বৃক্ষের কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তি পর্যায়ের পাশাপাশি সবার আগে এক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। যদিও সরকার প্রতিনিয়ত এ বিষয়ে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। কাজ করে যাচ্ছে নিরলস ভাবে। অবশ্য শুধু বছরের নির্দিষ্ট একটি সময় নয়, সারা বছরই সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিতে রাস্তার পাশে ও জঙ্গলের আশপাশে বসবাসরত মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে, উদ্বুদ্ধ করতে হবে বৃক্ষ রোপনে। 

এখন রাজধানীসহ সারা দেশে চলছে বৃক্ষমেলা। রাজধানীর এই বৃক্ষমেলা চলবে মাসব্যাপী। আমরা যেমন বইমেলা ও বাণিজ্যমেলায় সপরিবার, সবান্ধব যাই, তেমনি বৃক্ষমেলায়ও সবাইকে নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলতে হবে। বইমেলা থেকে যেমন প্রিয়জন ও বাচ্চাদের জন্য উপহার হিসেবে বই কিনে দেই তেমনি বৃক্ষমেলায় নিয়ে তাদের উপহার হিসেবে দিতে হবে বৃক্ষ। কারণ, গাছও হতে পারে প্রিয়জনের জন্য এখন দারুণ উপহার। আশার খবর হলো- সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব এই উপহার দেয়ার রেওয়াজ অবশ্য চালুও হয়েছে। তবে এর পরিসর আরো বাড়াতে হবে ব্যাপকভাবে। এতে ব্যক্তি যেমন লাভবান হবেন তেমনি সামগ্রিকভাবে উপকৃত হবে রাষ্ট্র। আরো বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে, মঙ্গল পুরো পৃথিবীর। বইমেলার মতো এখন থেকে বৃক্ষমেলাও হোক সবার প্রাণের মেলা, প্রত্যাশা এমনটাই।   

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর