বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি: তদন্ত কমিটির ২০ সুপারিশ

বুড়িগঙ্গায় লঞ্চডুবি: তদন্ত কমিটির ২০ সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:১১ ৭ জুলাই ২০২০   আপডেট: ১৭:২৬ ৭ জুলাই ২০২০

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে মর্নিং বার্ড লঞ্চডুবির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি নৌ দুর্ঘটনা এড়াতে ২০ দফা সুপারিশ করেছে।

মঙ্গলবার নৌপরিবহন সচিব মোহাম্মদ মেজবাহ্ উদ্দিন চৌধুরী তদন্ত কমিটির ২০ দফা সুপারিশ  সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। 

তদন্ত কমিটির ২০ সুপারিশ হলো-

১. সদরঘাট থেকে ভাটিতে ৭/৮ কিলোমিটার ও উজানে ৩/৪ কিলোমিটার অংশে অলস বার্দিং উঠিয়ে দিতে হবে। এ অংশে পল্টুন ছাড়া নোঙ্গর করা নৌযান রাখা যাবে না। এ অংশ হতে পর্যায়ক্রমে শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড উঠিয়ে দিতে হবে।

২. সদরঘাট টার্মিনালের আশেপাশে কোনো খেয়াঘাট রাখা যাবে না। ওয়াইজঘাটের উজানে খেয়াঘাট স্থানান্তর করা যেতে পারে।

৩. লঞ্চের সামনে, পেছনে, মাস্টার ব্রিজ, ইঞ্জিনরুম, ডেকে সিসিটিভি ক্যামেরা বসাতে হবে। মাস্টারের দেখার সুবিধার জন্য ব্যাক ক্যামেরা ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও লঞ্চে পর্যায়ক্রমে ওয়াকি-টকি সিস্টেম চালু করতে হবে। 

৪. লঞ্চ ও জাহাজ ঘাট ত্যাগ করার আগে ঘাটে ভয়েজ ডিকলারেশন জমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। লঞ্চে কতজন যাত্রী বহন করা হচ্ছে, ডেক সাইডে ও ইঞ্জিনে কারা কারা কর্মরত আছে তা ভয়েজ ডিকলারেশনে উল্লেখ থাকতে হবে।

৫. ফিটনেসবিহীন লঞ্চ চলাচল বন্ধ করতে হবে। সব লঞ্চে জীবন রক্ষাকারী লাইফ জ্যাকেট ও বয়া রাখতে হবে।

৬. সব নদী পথে বিভিন্ন নৌযানের স্পিড লিমিট নির্ধারণ করে দিতে হবে। সদরঘাটে স্পিড কন্ট্রোল করার জন্য টাওয়ার স্থাপন ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

৭. লঞ্চে মেকানিক্যাল স্টিরিংয়ের পরিবর্তে ইলেক্ট্রো হাইড্রোলিক স্টিরিং প্রবর্তন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

৮. যাত্রীবাহী লঞ্চে মেইন ইঞ্জিনস লোকাল কন্ট্রোল সিস্টেমের পরিবর্তে ব্রিজ কন্ট্রোল সিস্টেম পর্যায়ক্রমে চালুর কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।

৯. সানকেন ডেক লঞ্চ পর্যায়ক্রমে উঠিয়ে দিতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীগুলোতে চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রশস্ত ও ব্যস্ত নদীতে যথাযথ সনদধারী মাস্টার ও ড্রাইভার ছাড়া নৌযান পরিচালনা করা যাবে না। এক্ষেত্রে ডিসপেনসেশন সনদ গ্রহণের প্রথা বাতিল করতে হবে।

১০. যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক লোকদের উঠা নামার সুবিধার্থে গ্যাংওয়ে/ব্রিজ স্থাপন করতে হবে।

১১. সদরঘাটে পল্টুনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।  

১২. সার্ভের মধ্যবর্তী সময়ে নৌযানের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও অন্যান্য বিষয় পরিদর্শন করার নিমিত্ত পরিদর্শকদের পরিদর্শন কার্যক্রম আরো জোরদার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

১৩. উৎসবসহ সব সময়ের জন্য প্রত্যেক লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত টিকেট বিক্রি বন্ধ করতে হবে। টিকিট প্রদর্শন ছাড়া কোনো যাত্রীকে লঞ্চে উঠতে দেয়া যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের সুযোগ বন্ধ করার জন্য কেবিন সংখ্যা ও ডেক যাত্রীর সংখ্যা নির্ধারণ করে দিয়ে এসব টিকেট অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

১৪. নৌ আইন অমান্যকারীদের শাস্তির মেয়াদ ও জরিমানার পরিমাণ যুগোপযোগী করে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

১৫. নৌকর্মীদের প্রশিক্ষণ ফলপ্রসূ করার জন্য বিআইডব্লিউটিএকে আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। নৌযানের ফিটনেস ও নৌকর্মীদের যোগ্যতা সনদ ইস্যুতে নৌপরিবহন অধিদফতরকে আরো কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। সার্ভে সনদ প্রদানকারী সংস্থা নৌপরিবহন অধিদফতরের সার্ভেয়ারের সংখ্যা ও লজিস্টিক সুবিধা বাড়াতে হবে।

১৬. ডেক অ্যান্ড ইঞ্জিন পার্সোনাল ট্রেনিং সেন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দেশে বর্তমানে প্রায় হাজার রেজিস্ট্রিকৃত জাহাজ ছাড়াও আরো অ-রেজিস্ট্রিকৃত অসংখ্য জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজে গড়ে কমপক্ষে দুইজন মাস্টার ও দুইজন ইঞ্জিন চালক নিয়োগ করতে হলে প্রায় ৫৬ হাজার প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। দেশে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে জাহাজে নিয়োগ করতে পারলে দুর্ঘটনা কিছুটা লাঘব হতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো ভিজিবল করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়াতে হবে।

১৭. নৌ দুর্ঘটনার কারণ উদঘাটনের লক্ষে দায়ী মাস্টার, ইঞ্জিন ড্রাইভারদের সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতারের ব্যবস্থা নিতে হবে। নৌ দুর্ঘটনা ও নৌযান সংক্রান্ত অপরাধের নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও আসামি গ্রেফতারের জন্য সদরঘাটে কর্মরত নৌপুলিশের জনবলের সংখ্যা নয়জন থেকে বাড়িয়ে কমপক্ষে ২৫ জন করতে হবে।

১৮. নৌযান ও নৌকর্মীদের চলাচল (মুভমেন্ট) জানার জন্য ও অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য নৌযান ও নৌকর্মীদের ডাটাবেজ তৈরি ও ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে।

১৯. নৌ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যথাযথ লজিস্টিক সুবিধা দিতে হবে। সার্চ এবং রেসকিউ প্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে।

২০. নৌ দুর্ঘটনা গবেষণার বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

এর আগে গত  ২৯ জুন বুড়িগঙ্গা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সেদিনই সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) মো. রফিকুল ইসলাম খানকে আহ্বায়ক ও বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক (নৌ নিরাপত্তা) মো. রফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে কমিটি গঠন করা হয়। 

কমিটিকে সাতদিনের মধ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়। তদন্ত কমিটি গতকাল তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/এসএইচআর/আরএইচ