‘বিয়ের চেয়েও বড় কিছু করব’ বলেই এভারেস্টে চড়লেন অতঃপর...

‘বিয়ের চেয়েও বড় কিছু করব’ বলেই এভারেস্টে চড়লেন অতঃপর...

সাতরঙ ডেস্ক ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৪:০১ ১৪ মে ২০২০  

ছবি: তেসওয়াং পালজোর মৃতদেহ

ছবি: তেসওয়াং পালজোর মৃতদেহ

এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন প্রতিটি পর্বতারোহীরই রয়েছে। তারা উন্মুখ হয়ে থাকেন এই সুযোগটির আশায়। আট হাজার ৮৪৮ মিটার উচ্চতায় যেন তাদের স্বপ্ন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এই সুযোগ আর ইচ্ছা পাশ কাটানোর সাধ্য কোনো পর্বতারোহীরই নেই। 

এই স্বপ্নের হাতছানিতে সাড়া দিতে অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন। রয়ে গেছেন স্বপ্নের এভারেস্টে। তেমনই একজন শেরপা ভারতের ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশের সদস্য তেসোয়াং পালজোর। যিনি ১৯৯৬ সালে আরো তিনজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে এভারেস্ট শৃঙ্গ পাড়ি দিতে বেরিয়েছিলেন। পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ জয়ের নেশায় এতই মত্ত ছিলেন তারা যে জীবনের মায়াও ভুলে গিয়েছিলেন। 

১৯৬৮ সালের ১০ এপ্রিল জন্মেছিলেন তেসওয়াং পালজোর। তিনি ৩৮০০ মিটার উচ্চতায় থাকা লাদাখি এক গ্রাম সাকতিতে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। বছরের বেশিরভাগ রাতেই সেখানকার তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। বার্লি চাষের ক্ষেত আর পপলার গাছের ভিড়ে ঢাকা উপত্যকার গ্রামটির ছোট্ট দোতলা বাড়িটি ছিল পালজোরদের। 

চারদিকে তিব্বতীয়দের ধর্মীয় পতাকা। পালজোরের মা তাসি আঙ্গমো ও ছয় ভাইবোনের বসতি ছিল ওই বাড়িতে। ভাইবোনের মধ্যে বড় ছিলেন পালজোর। সারা গ্রামে নম্র ও বিনয়ী হিসেবে তার সুনাম ছিল। দেখতে সুন্দর হলেও বান্ধবী ছিলো না, এতোটাই লাজুক ছিলেন তিনি। পালজোর তার ভাইদের বলতেন, বিয়ের চেয়ে বড় কিছু করতে চাই। আর তাই সে খুব কম বয়সেই যোগ দেয় আইটিবিপি। 

তেসওয়াং পালজোরসেখানে যোগদানের পর, পাহাড়ে চড়ার নেশা পেয়ে বসেছিল পালজোরকে। তার মা ছেলের চাকরি পাওয়ায় খুশি হলেও, পাহাড়ে চড়া নিয়ে খুশি ছিলেন না। তাই  ‘মিশন এভারেস্ট’-এ নির্বাচিত হয়েও মাকে জানাননি পালজোর। পরে বন্ধুরা তার মাকে জানিয়ে দিয়েছিলেন।  ১৯৯৬ সালের ১০ মে, সকালে হেড- কনস্টেবল তেসোয়াং পালজোর সঙ্গে ছিল সুবেদার তেসোয়াং সামানলা, ল্যান্সনায়েক দোরজে মোরাপ এবং টিমের ডেপুটি লিডার ইন্সপেক্টর হরভজন সিং।

শৃঙ্গ জয়ের জন্য টিমটি বের হয় সকাল ৮ টায়। যদিও তাদের বের হওয়ার কথা ছিল ভোর সাড়ে ৩টায়। তবে আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণে তাদের বের হতে দেরি হয়ে যায়। তারা ক্যাম্প ভিআই থেকে এভারেষ্ট শৃঙ্গ জয়ের জন্য রওনা হয়। প্রথম তিনজন লাদাখি যুবক, তারা পাহাড়ে চড়তেও বেশ দক্ষ। এমনিতেই তাদের সাড়ে চার ঘণ্টা দেরি হয়েছিল। তাই সদস্যরা ঠিক ক রেন শৃঙ্গ আরোহণের ঝুঁকি না নিয়ে, দ্রুত ডেথ জোনে ফিক্সড রোপ লাগিয়ে ফিরে আসবেন। এভারেস্টে আজ পর্যন্ত যত মৃত্যু ঘটেছে তার ৫০ শতাংশ ঘটেছে এই ডেথ জোনে। তাই আইটিবিপি টিম তাদের ফেরাটা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। 

শুরুটা দেরিতে হলেও তারা খুব তাড়াতাড়ি আর খুব সহজেই এগিয়ে চলছিল শৃঙ্গের দিকে। অ্যাডভান্স বেসক্যাম্পে অপেক্ষারত অভিযানের লিডার মহিন্দর সিং-এর কঠোর নির্দেশ ছিল বেলা আড়াইটা থেকে ৩টার মধ্যে দলের সদস্যরা যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, ফেরার পথ ধরবে। এদিকে বরফ কেটে তারা এগিয়ে চলেছে স্বপ্নের দিকে। 

হঠাৎই প্রচণ্ড বাতাস বইতে শুরু করে। তিন লাদাখি যুবকের অনেক পিছনে ছিলেন ডেপুটি লিডার হরভজন সিং। ঘড়িতে আড়াইটা বাজতেই হরভজন উপরের তিন জনকে সিগন্যাল দেখালেন ফেরার জন্য। তবে তিন লাদাখি আরোহী হয় তার সিগন্যাল দেখেননি বা দেখেও  উপেক্ষা করেছিলেন। ডেপুটি লিডারের কথা না শুনেই তিনজন দ্রুতগতিতে উপরে উঠে যাচ্ছিল।

এদিকে ফ্রস্ট বাইটে আক্রান্ত হয়ে হরভজন সিংয়ের খারাপ অবস্থা। সে দলনেতার নির্দেশ মেনে ক্যাম্প ভিআই এ ফেরার পথ ধরলেন। এদিকে অ্যাডভান্স বেসক্যাম্পে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন দলনেতা মহিন্দর সিং। বারবার তাকাচ্ছিলেন ওয়াকি টকি সেটের দিকে। বিকেল ৩টায় হঠাৎ যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল সেটি। 

তারা পর্বতের উপরে উঠতে থাকেসুবেদার তেসোয়াং সামানলার কন্ঠস্বর ভেসে আসে তখন- ‘স্যার, আমরা আর প্রায় এভারেস্টের চূড়ায় উঠে পড়েছি। আবহওয়া প্রচণ্ড খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর সামিট দেখতে পাচ্ছি, এক ঘণ্টাও লাগবে না, আমরা তিনজন ফিট আছি।’ এবার দলনেতা মহিন্দর সিং বললেন, ওভার কনফিডেন্ট হয়ো না। প্লিজ আমার কথা শোনো। নেমে এসো ক্যাম্প ভিআই এ। সূর্য অস্ত গেলে বিপদে পড়বে।

সুবেদার তেসোয়াং সামানলা কথা শোনেননি বরং ওয়াকি টকি ধরিয়ে দিয়েছিলেন হেড-কনস্টেবল তেসোয়াং পালজোরের হাতে। আত্মবিশ্বাস আর শৃঙ্গ জয়ের উত্তেজনা ছিল পালজোরের গলায়। পালজোর তাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইলেন। দলনেতা কিছু বলার আগেই আচমকা কেটে গেছিল ফোনটা। অ্যাডভান্স বেসক্যাম্পে থমথমে মুখে বসে রইলেন লিডার মহিন্দর সিং। যেন অশনিসঙ্কেত দেখতে পাচ্ছেন অভিজ্ঞ ক্লাইম্বার মহিন্দর। 

বিকেল পাঁচটা ৪৫ মিনিট। আবার ওয়াকি টকিতে সুবেদার তেসোয়াংয়ের গলার আওয়াজ ভেসে এলো। তিনি জানালেন, পালজোর, মোরুপ এবং তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এভারেস্টের শৃঙ্গে। উত্তর দিক থেকে অবশেষে এভারেস্ট জয় করলেন ভারতীয়রা। অ্যাডভান্স বেস ক্যাম্পে খুশির হুল্লোড় শুরু হয়ে গেল। লিডার মহিন্দর সিং তার টিমের শৃঙ্গ জয়ের খবর দিল্লিতে পাঠাতে বসলেন। তবে এখনো তিনি নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। কারণ আবহাওয়া ক্রমেই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। 

তাদের শৃঙ্গ জয়ের খবরে সারা ভারতের সেনাবাহিনী ও পর্বতারোহী মহলে উৎসব শুরু হয়ে গেল। তবে এই খুশি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ঠিক এক ঘণ্টা পরেই ভয়াবহ গতিতে বরফ আর বাতাস বইতে লাগল। ১৯৯৬ সালের সেই কুখ্যাত তুষারঝড় বা ব্লিজার্ড হানা দেয়। মুখ শুকিয়ে আসে নিচে থাকা টিমের সদস্যদের। লিডার মহিন্দর সিং মুখে সাহস দেন, এই তিনজন এর আগেও এরকম ভয়ঙ্কর অবস্থায় পড়েছেন এবং বেরিয়ে এসেছেন। 

তারা এভারেস্ট জয় করে ঠিকই কিন্তু আবহাওয়া প্রচণ্ড খারাপ হয়ে যায়তাই সমস্যা হলেও তারা মাঝরাতের মধ্যে ক্যাম্প ভিআই এ ঠিক নেমে আসবেন। তবে তিনি নিজেও জানতেন এভারেস্টের ডেথ জোনের উপরে এরকম ভয়াবহ মাত্রার তুষারঝড়ের সম্মুখীন হওয়া সামান্য কথা নয়! আরোহীদের ফিরে আসার সম্ভবনা খুবই কম। দলনেতা মহিন্দর সিং ঠিক করলেন, ফুরোকাওয়া থেকে আসা একটি পেশাদার জাপানি টিমকে সাহায্য করতে বলবেন। তার সামনেই জাপানি টিমটির দলনেতা কোজি ইয়াদার ক্যাম্প। 

তিনি রাত আটটায় জাপানি অভিযাত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। সবকিছু জানালেন তিনি। কোজি ইয়াদা মহিন্দর সিংকে আশ্বস্ত করলেন, জাপানি আরোহীরা শৃঙ্গ জয়ের পথে পালজোরদের দেখতে পেলে সবরকম সাহায্য করবেন। জাপানিরা এটিকে নিজেদের দলের দুর্ঘটনা বলে গ্রহণ করেছেন। লিডার মহিন্দর সিং জাপানি দলনেতার এই আপদকালীন অবস্থায় সাহায্য করার মানসিকতা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

পরদিন খুব ভোরেই জাপানি দল ক্যাম্প ভিআই থেকে শৃঙ্গের দিকে রওনা হয়। সকাল ৯টা, জাপানি টিমের লিডার কোজি, চিন্তিত মহিন্দর সিংকে জানালেন, তার দলের দুই অভিযাত্রী হিরোশি হানাদা, এইসুকি শিগেকাওয়া ও শেরপারা দোরজে মোরুপকে দেখতে পেয়েছেন। মারাত্মক ফ্রস্ট বাইটে আক্রান্ত অবস্থায় বরফে শুয়ে আছেন মোরুপ। জাপানি আরোহীরা মোরুপকে ফিক্সড রোপের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে সামিটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। লিডার মহিন্দর সিং হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন জাপানি দলনেতার দিকে। 

মরে গিয়েও সবাইকে পথ দেখাচ্ছেন তিনিব্লিজার্ড অনেক আগেই থেমে গিয়েছিল। এখন আবহাওয়া পরিষ্কার ও ঝকঝকে। সকাল ১১টার দিকে জাপানি দলের দুই আরোহী ও তিন শেরপা দেখতে পেলন সামানলা আর পালজোরকে। বরফের মধ্যে অচেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন। তবে তারা সাহায্য না করেই এগিয়ে গেলেন শৃঙ্গের পথে। এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত দিলেন না মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ দুটির মুখে। হেড-কনস্টেবল তেসোয়াং পালজোর, সুবেদার তেসোয়াং সামানলা, ল্যান্সনায়েক দোরজে মোরাপ চিরতরে হারিয়ে গেলেন এভারেস্টের ডেথ জোনে। ২২ বছর ধরে এখনো এভারেস্টের বরফের মধ্যে রয়ে গেছেন তারা। পথ দেখাচ্ছেন অন্যান্য পর্বতারোহীদের। 

এভারেস্টের উত্তর দিক বা তিব্বতের দিক থেকে এভারেস্টে ওঠার পথে, সাড়ে আট হাজার মিটার (২৭ হাজার ৯০০ ফুট) উঁচুতে আছে চুনাপাথরের ছোট্ট এক গুহা। যেটি সবার কাছে গ্রিন বুট কেভ নামেই পরিচিত। কারণ গুহার ভিতর বাম পাশ ফিরে ঘুমিয়ে রয়েছেন এক পর্বতারোহী। এভারেস্ট শৃঙ্গের দিকে মুখ ফেরানো। তিনিই নন ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশের জওয়ান তেসোয়াং পালজোর। এভাবেই শুয়ে আছেন ২২ বছর ধরে। 

ফরাসি ক্লাইম্বার পিয়ের প্যপেরন, ২০০১ সালের ২১ মে, এভারেস্ট শৃঙ্গের কাছে লাইমস্টোনের গুহায় আবিষ্কার করেন একটি দেহ। তাকে আকর্ষণ করে দেহটির পায়ে থাকা গ্রিন বুট। তিনি জানতেন না দেহটি কার। তাই তিনি ভিডিওতে গ্রিন বুট নামে সম্বোধন করেন। দেহটির পোশাক দেখে সনাক্ত করা হয় পালজোরকে। অভিশপ্ত সেই দিনটিতে একমাত্র তার পায়েই ছিল এই গ্রিন বুট। লিডার মহিন্দর সিং লিখেছিলেন, জাপানিরা আমাদের আশাহত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গেলেন। কোথায় গেল মাউণ্টেন এথিকস?

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস