100611 বিশ্বে সন্ত্রাসী তাণ্ডব ও মানবতার ঐক্য
Best Electronics

বিশ্বে সন্ত্রাসী তাণ্ডব ও মানবতার ঐক্য

প্রকাশিত: ১২:১৫ ২৭ এপ্রিল ২০১৯  

ফকির-ইলিয়াস--কবি-প্রাবন্ধিক-স্থায়ীভাবে-বসবাস-করছেন-নিউইয়র্কে-প্রকাশিত-গ্রন্থসংখ্যা---১৮-কমিটি-টু-প্রটেক্ট-জার্নালিস্টসএকাডেমি-অব-আমেরিকান-পোয়েটস-দ্যা-এমনেস্টি-ইন্টারন্যাশনাল-আমেরিকান-ইমেজ-প্রেস--এর-সদস্য

আবারও সন্ত্রাসী হামলায় কেঁপে উঠেছে শ্রীলঙ্কা। ইস্টার সানডে'র দিনে সেখানে কয়েকটি গীর্জা ও হোটেলে বোমা হামলা করা হয়েছে।মানুষের রক্তে ভেসে গেছে প্রার্থণালয়। কী বিষাদ ঘিরেছে আজ পৃথিবী! কয়েক সপ্তাহ আগেই নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চের দুটি মসজিদে নির্বিচারে গুলি করে মানুষ খুন করা হয়েছিল। দীর্ঘ ২৬ বছর গৃহযুদ্ধ হয়েছে এই দেশটিতে। ক্রমশ শান্তি ফিরেছিল শ্রীলঙ্কায়। সেই শান্তির মাঝেই অশান্তির ঢংকা!রক্তাক্ত শিশুরা আর্তনাদ করেছে এই প্রার্থনার দিনে।

গোটা বিশ্বেই এখন রাজনৈতিক স্বার্থের খেলাটা প্রকট আকার ধারণ করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের না না মনগড়া কথাবার্তা উসকে দিচ্ছে সন্ত্রাসবাদ।

ধরা যাক বাংলাদেশের কথা। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার যে রেওয়াজটি ছিল- তা অনেকেই এখানে ভুলে যেতে বসেছেন। অনেকেই ভুলে যেতে বসেছেন, এই দেশে ১৯৫২, ’৬৯, ’৭০, ’৭১ সাধিত হয়েছিল। অনেকেই ভুলে যেতে বসেছেন, বাঙালি জাতির উজ্জ্বল গৌরবের কথা। এর কারণ কী? কারণ একটাই শাসনের মোহ ও রাজনৈতিক দাম্ভিকতা। এই ক্ষমতা এখন মানুষের জন্য আর থাকছে না। হয়ে যাচ্ছে, কেবলই দলের। কেবলই নিজেদের। আর এর জন্য যা যা করা দরকার- সেটাই করছেন রাজনীতিকরা। মনে রাখা দরকার, অপরাজনীতির সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা চাইছে সামাজিক কাঠামোতে ভাঙন ধরিয়ে চতুর কৌশলে মানবসমাজে বিভাজন সৃষ্টি করা। সভ্য মানুষেরা মনে করেন, সংস্কার কিংবা আচার আচরণের মূলে কুঠারাঘাত দিয়ে ভয়াল বিপর্যয় ঘটানো যায়। নিত্যনতুন নির্মম সন্ত্রাস, গুম, অরাজক পরিস্থিতিতে অসহনীয় পরিবেশ তৈরি করা যায়। যাতে নাগরিক মানুষের মনে সন্দেহ, সংশয়, আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টি হয়। সুসভ্য সমাজে স্বাধীনতা ও সাধারণ মানুষের বাঞ্ছিত জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয়।সামাজিক পরিবেশ জুড়ে নেমে আসতে পারে মৃত্যুশীতল বিপর্যয়।

সমাজবদ্ধ মানুষের সুস্থ চেতনাই মানব সভ্যতাকে এগিয়ে দেয় কল্যাণের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দিকে। মানুষকে করে তোলে মানবিক গুণাবলির আদর্শের ধারক। মানুষকে করে তোলে অমলিন মনুষ্যত্ব বিকাশের অনির্বাণ বাহক। এতে বাধা দেয়াই বিশ্বে এখন সন্ত্রাসবাদের অন্যতম লক্ষ্য।

জঙ্গি প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি অর্জন, তাদের পরিপুষ্টি লাভের পেছনে সবসময়ই রাষ্ট্রের ভেতরের শক্তির সমর্থনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমর্থনও থাকে। আরও আসল কথা হলো, দখলের মোহ নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ইচ্ছে থেকেই বিশ্বে বিভিন্নভাবে ছোট ছোট জঙ্গি সংগঠনের জন্ম হচ্ছে।
বেদনার কথা হচ্ছে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিয়ে তা সমর্থন করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও।
জঙ্গিবাদ রাজনৈতিক আন্দোলন কিংবা আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য লক্ষ্যে পৌঁছনোর একটি মোক্ষম অস্ত্র বলেও বিবেচিত হচ্ছে এই সময়ে। যা ছায়াযুদ্ধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সরাসরি সৈন্য নামিয়ে যুদ্ধ ঘোষণার পরিবর্তে। যেমনটি নিউজিল্যান্ড কিংবা শ্রীলঙ্কায় ঘটেছে।

বিজ্ঞান ও নব্য প্রযুক্তির নিত্য নতুন দিক উন্মোচনের পাশাপাশি জঙ্গিদের জঙ্গিত্ব সৃষ্টির অভিনব সব কৌশলপদ্ধতিও চালাচ্ছে তারা। বায়োটেকনোলজি, রোবটিক, নিউরোসায়েন্স,  জেনিটিক, মেট্রোক্যামিকেলিক আবিষ্কার যেমন অব্যাহত রয়েছে, তেমনি আধুনিক প্রযুক্তির সদ্ব্যবহারে আন্ডারগ্রাউন্ডে সন্ত্রাসীরাও তাদের জঙ্গিবাদে জাগিয়ে তুলছে নতুন সৃষ্টির উন্মাদনা।

আরও শংবার কথা হচ্ছে, আধুনিক জঙ্গিরা নিত্যনতুন প্রযুক্তির ফসল ব্যবহারে যতখানি সিদ্ধহস্ত, উৎসাহী ও সফলকাম, সমাজের বুদ্ধিদীপ্ত সাধারণ মানুষ তার চেয়ে অনেক বেশি পিছিয়ে।

জঙ্গীরা তাদের আয়ের উৎস জমাতে আরও অনেক অবৈধ কাজে জড়াচ্ছে নিজেদের। কোনো কোনো জঙ্গী নেতার বিরুদ্ধে বড় বড় ড্রাগ চালানেরও অভিযোগ রয়েছে। গোটা বিশ্বে এখন জঙ্গীবাদের যে মহড়া চলছে- তা হলো, মানুষকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা। রাজনৈতিক প্রতারণা করা।

যেমন দেখা যাচ্ছে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণ করতে গিয়ে মূর্তি কিংবা ভাস্কর্য ভাঙার হুমকি দিয়েছে সন্ত্রাসীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তারা তা ভেঙেছেও। আমরা বিশ্বের দিকে তাকালে দেখব, বিশ্বে অনেকগুলো ভাস্কর্য ভেঙেছে আইসিস। খ্রিস্টপূর্ব ৯০০ থেকে ৬০০ সালের মধ্যে প্রাচীন পৃথিবীর একটি বিশাল অংশ ছিল অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের অধীনে। গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছিল এই সাম্রাজ্যের অন্তর্গত। আজকের ইরাকের উত্তরাংশে নির্মিত বিভিন্ন শহর বিভিন্ন সময়ে ছিল এই সাম্রাজ্যের রাজধানী। সম্রাট সেনাশেরিবের আমলে নিনেভাহ ছিল তেমনই এক রাজধানী। খ্রিস্টপূর্ব ৬১২ সালে পরিত্যক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত অন্তত ৫০ বছর ধরে এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শহর। পৃথিবীর বিভিন্ন জাদুঘরে এই শহরের ধ্বংসাবশেষের নমুনা সংরক্ষিত আছে। এটি আইসিসের দখলে আসে ২০১৪ সালে। এরপর এখানে অবস্থিত অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় তারা। শহরের প্রাচীন প্রবেশদ্বারে অবস্থিত বিশাল মূর্তি বৈদ্যুতিক ড্রিল মেশিন ও হাতুড়ি দিয়ে ভাঙার দৃশ্য দেখা যায় আইসিসের প্রকাশিত ভিডিওতে। নিনেভা শহরের ধ্বংসাবশেষের ওপর গড়ে তোলা হয়েছিল ইউনুস নবীর মসজিদ। মসুলের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মসজিদগুলোর একটি ছিল এটি। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে আইসিস বাহিনী মসজিদটি গুঁড়িয়ে দেয়। গোটা ইরাকজুড়ে আইসিস আরো গুঁড়িয়ে দেয় আল-কুব্বা হুসেইনিয়া মসজিদ, অটোমান আমলের হামু কাদো মসজিদ, জাওয়াদ হুসেইনিয়া মসজিদ, আল আরবাইন মসজিদ, খুদর মসজিদ।

ইউফ্রেটিস নদীর তীরে প্রায় ৩০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা এক শহর ছিল দুরা-ইউরোপোস। এই শহরের অমূল্য সম্পদগুলোর কারণে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে লুটতরাজ হয়েছে প্রচুর পরিমাণে। আইসিস বাহিনী এখানকার প্রাচীন নিদর্শনগুলো লুট করে বিক্রি করে দেয় তাদের যুদ্ধের ফান্ডের অর্থের জন্য। রোমের বিরুদ্ধে পালমিরার বিদ্রোহের পর ২৭৩ সালে রোমান সম্রাট অরেলিয়ান এই শহর ধ্বংস করে ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে সম্রাট ডায়োক্লেটিয়ান এটি আবার নির্মাণ করেন, তবে একটু ছোট আকারে। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে পালমিরার অধিবাসীরা খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়। এরপর পঞ্চম শতাব্দী থেকে প্রথম সহস্রাব্দের মধ্যে তারা ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। সে সময় শহরে প্রচলিত পালমিরিয়ান ও গ্রিক ভাষার বদলে শুরু হয় আরবি ভাষার প্রচলন। ১৪০০ সালে এসে আবার ধ্বংসের শিকার হয় পালমিরা, এবারে তৈমুর লংয়ের বাহিনীর হাতে। সেই ধ্বংসযজ্ঞের পর এটি পরিণত হয় একটি ছোট গ্রামে। অবশেষে ১৯৩২ সালে শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়, এর অধিবাসীরা সরে যায় অন্যত্র। দীর্ঘ আট দশক পর আধুনিক যুগের আরেক বর্বর বাহিনীর হাতে পড়ল পালমিরা। ইউনেস্কো ঘোষিত এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটটি ২০১৫ সালে দখলে নেয় আইসিস।

শ্রীলঙ্কার সন্ত্রাসী হামলা বাংলাদেশের জন্য ভাবার বিষয় তো বটেই! বাংলাদেশে এক শ্রেণির রাজনীতিক আছেন- যারা মুখে বলেন তারা মৌলবাদকে প্রশ্রয় দেন না। তারা বলেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক। কিন্তু আমরা দেখি, তারা তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য প্রকারান্তরে এসব মৌলবাদী কালো শক্তিকেই মদদ দেন। যেমনটি দেয়া হয়েছিল, বাংলাভাই, শায়খ রহমান, মুফতি হান্নানকে। এরা ক্ষমতার জন্য সবই পারে। তারা এই কাজে সিদ্ধহস্ত। তা এই ২০১৭ সালেও দেখাচ্ছে তারা। আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের দিকে তাকাতে পারি। সংবিধান বলছে-
* বিশেষ শৈল্পিক কিংবা ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন বা তাৎপর্যমণ্ডিত স্মৃতি নিদর্শন, বস্তু বা স্থানসমূহকে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করিবার জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন
জাতীয় সংস্কৃতি-
* রাষ্ট্র জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার রক্ষণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলাসমূহের এমন পরিপোষণ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন, যাহাতে সর্বস্তরের জনগণ জাতীয় সংস্কৃতির সমৃদ্ধিতে অবদান রাখিবার ও অংশগ্রহণ করিবার সুযোগ লাভ করিতে পারেন
ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা-

* ধর্মনিরপেক্ষতা নীতি বাস্তবায়নের জন্য

(ক) সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িকতা,
(খ) রাষ্ট্র কর্তৃক কোনো ধর্মকে রাজনৈতিক মর্যাদা দান,
(গ) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অপব্যবহার,

(ঘ) কোনো বিশেষ ধর্ম পালনকারী ব্যক্তির প্রতি বৈষম্য বা তাহার উপর নিপীড়ন, বিলোপ করা হইবে। আমাদের আজ বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। সরকার শান্তি চাইছে। নীতিনির্ধারকরা বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নীতি প্রণয়ন করছেন। কিন্তু আমাদের সমসাময়িক বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে। প্রজন্মকে জানাতে হবে সত্য ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। রাজনীতি যদি নখর দেখায়, তখন মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। মানুষের উপলব্ধিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বীজ সমুন্নত রাখতে চাইলে সেই আলোকেই রাষ্ট্রকে শিরদাঁড়া উঁচু করে স্থির থাকতে হবে। বিশ্বে সন্ত্রাসের যে তাণ্ডব চলছে- তার বিরুদ্ধে কথা বলে যেতেই হবে। এর প্রতিবাদ করে যেতেই হবে। এই সন্ত্রাসীরা মানবতার শত্রু। এরা কারও মিত্র নয়। কথাটি আমাদের সবাইকেই মনে রাখতে হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics