বিশ্বের সবথেকে বিস্ময়কর সংযুক্ত যমজ মানুষ!

বিশ্বের সবথেকে বিস্ময়কর সংযুক্ত যমজ মানুষ!

কানিছ সুলতানা কেয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:০৫ ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯  

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

প্রতি দুই লাখ জন্ম নেয়া যমজ শিশুর মধ্যে একজোড়া শিশু যেকোনো অঙ্গ একসঙ্গে যুক্তভাবে জন্ম নেয়। আর এদের মধ্যে ৭০ শতাংশই কন্যা শিশু। তবে বেশির ভাগেরই জীবনাবসান ঘটে জন্মের পর পর বা শিশুকালেই। তবে বিশ্বের সবথেকে বিস্ময়কর সংযুক্ত যমজ মানুষের মধ্যে রনি ও ডনি গ্যালিওন দীর্ঘকাল বেঁচে আছেন।  

২০০৯ সালের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুসারে, গ্যালিওনরা বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ বয়সী যমজ সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘকালীন জীবন্ত গোষ্ঠী। এছাড়াও তাদের ২৯ অক্টোবর ২০১৪ তারিখে ইতিহাসের দীর্ঘতম বেঁচে থাকা যুগলদের বিশ্ব রেকর্ড রয়েছে। এমনকি তারা পূর্বের রেকর্ডধারীদের গিয়াকোমোকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং জিওভান্নি বটিস্টা টোকিকেও।

রোনাল্ড গ্যালিওন ও দোনাল্ড গ্যালিওন মা-বাবার সঙ্গে১৯৫১ সালের ২৮ অক্টোবর আইলিন ডোনি ওহাইওর ডেটনের সেন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে জন্ম দেন রনি ও ডনিকে। তাদের হার্ট, পেট, মাথাসহ হাত পা সবই আলাদা ছিল। কিন্তু তাদের বুকের নিচ থেকে কোমরের নিচ পর্যন্ত একসঙ্গে লাগানো ছিল। আর এভাবেই গত ৬৭ বছর ধরে তারা এভাবেই জীবন যাপন করছেন। তাদের জন্মের পরে, ডাক্তাররা রনি এবং ডনিকে দু'বছর ধরে হাসপাতালে রেখেছিলেন। ডাক্তাররা তাদেরকে নিরাপদে আলাদা করা যায় এমন উপায় খুঁজছিলেন। তবে রনি ও ডনির বেঁচে থাকার ভরসা দিতে পারছিলেন না। তাই আইলিন এবং ওয়েসলি তাতে রাজি হননি।

রনি ও ডনির আসল নাম রোনাল্ড গ্যালিওন ও দোনাল্ড গ্যালিওন। রনি ও ডনি প্রতিবছরই নিজেদের জন্মদিন তাদের বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খুব মজা করেই পালন করেন। তারা যেখানেই গেছেন সেখানে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। রনি, ডনি তাদের চার বছর বয়সে প্রথম তাদের বাবার সঙ্গে ভ্রমনে বের হন। তারা কখনো স্কুলে যেতে পারেননি। তাদের স্কুলে যাবার বয়স হলে আইলিন এবং ওয়েসলি দম্পতি তাদের স্কুলে ভর্তি করাতে চান। কিন্তু স্কুল কতৃপক্ষ অন্যান্য বাচ্চাদের মধ্যে থেকে তারা বিভ্রান্তি বোধ করবে ভেবে তাদের ভর্তি করাননি।

রোনাল্ড গ্যালিওন ও দোনাল্ড গ্যালিওনতবে রনি এবং ডনি তাদের সময় কাটাতে বিভিন্ন কার্নিভালে যোগ দিতেন। সেখানে তাদের অনেক বন্ধু জুটে যায়। এরমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মানুষ পিটের সঙ্গে তার ভালো বন্ধুত্ব হয়। এছাড়াও অন্যান্য কার্নিভাল সদস্য এবং খাদ্য বুথ চালানো শ্রমিকদের সঙ্গেও তাদের ঘনিষ্ঠতা হয়।

রনি বলেছিলেন- আমরা যখন রাস্তায় ছিলাম, তখন আমরা সবাই মিলে একটি বড় পরিবারের মতো ছিলাম।

রনি এবং ডনি ছাড়াও আইলিন এবং ওয়েসলির দম্পতির মোট নয়টি সন্তান ছিল। তাদেরকে লালন পালনের মতো তাদের সামর্থ্য ছিল না। তাই রনি এবং ডনিকে তার বাবা ওয়েসলি রাস্তায় প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন। এ থেকে তাদের উপার্জন হতো। এমনকি ছেলেদের পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং পরে লাতিন আমেরিকায় প্রদর্শন করেছিলেন। তাদের এ ভ্রমণ তাদের বিখ্যাত ব্যক্তি হিসাবে তৈরি করেছিল এবং একটি উপার্জনের পথ তৈরি করে দিয়েছিল। যা তারা তাদের পরিবারকে সমর্থন যুগিয়েছে। এছাড়াও তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উপায় ছিল রুটি তৈরি করা। তবে ১৯৭০ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সব কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তখন গ্যালিওন ভাইরা দক্ষিণ এবং মধ্য আমেরিকা চলে যান।

রোনাল্ড গ্যালিওন ও দোনাল্ড গ্যালিওনরনি এবং ডনি একটা সময় সেনাবাহিনীতে যোগদানের চেষ্টা করেছিল, তবে তাদের স্থান ছিল ৪-এফ। এরপর তারা উপার্জনের জন্য বিভিন্ন শিরোনামে অভিনয় শুরু করেন। এর পাশাপাশি তারা যাদুও দেখাতেন। এতে তাদের দিন দিন বেশ খ্যাতি বাড়তে থাকে। রনি, ডনির ছোট ভাই জিম জানিয়েছিলেন, কর্মক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে অন্যরা রক স্টারের মতো আচরণ করত। তারা যেখানেই যেতেন সবাই তাদেরকে দেখতো কথা বলতে আসত। অনেক সময় কোনো রেস্তোরায় খেতে গেলে অন্যরা তাদের বিল পরিশোধ করত।

তবে তারা অভিনয়শিল্পী হিসাবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। এর অর্থ এই নয় যে তাদের জীবন সহজ ছিল। তাদেরকে সারা জীবন অনেক উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। স্কুল থেকে বিতারিত হওয়া থেকে শুরু করে গভীর রাতে বিরক্তিকর ফোনকল। অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েছেন রনি এবং ডনি। ১৯৯১ সালে সিডো শো সার্কিট থেকে অবসর নেন তারা। এরপর তাদের উপার্জিত অর্থ দিয়ে ওহিওর ডেটনে একটি বাড়ি কিনেছিল। সেখানে তারা স্বাধীনভাবে বসবাস করতে থাকেন। একটি কাস্টম ডাবল হুইলচেয়ার মাধ্যমে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতেন। এখানেও স্থানীয় কিশোররা তাদের জানালায় উঁকি মারত এবং কাঁচের উপরে থুথু দিতো।

তারা এক পর্যায়ে এতোটা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল যে পুলিশের দারস্ত হতে হয়েছিল। পুলিশ তারেদ আশ্বস্ত করেছিল যে যারা তাদের সঙ্গে এমনটা করছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

রনি এবং ডনি শো ব্যবসা থেকে অবসর নেয়ার পরও তারা অসংখ্য টেলিভিশনে উপস্থিত হয়েছেন। তারা ১৯৯৭ সালে দ্য জেরি স্প্রিংগার শো, ১৯৯৮ সালে একটি আবিষ্কারের চ্যানেল ডকুমেন্টারি এবং ২০০৯ সালে একটি চ্যানেল ফাইভ ডকুমেন্টারিতে উপস্থিত হয়েছিলেন।

রোনাল্ড গ্যালিওন ও দোনাল্ড গ্যালিওন মজার ব্যাপার হলো রনি এবং ডনি মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যেও মারামারিতে জড়িয়ে যেতেন। অনেক সময় তা রক্তারক্তিতে গিয়ে দাঁড়াত। এরপর তারা দুর্বল অনুভব করতেন। পরবর্তিতে তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে শারীরিক লড়াই তাদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। অবশ্য যমজরা একে অপরের সঙ্গে ঝগড়া করলেও তারা একে অপরের সেরা বন্ধু। বছরের পর বছর ডাক্তাররা তাদের আলাদা করতে অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা সবসময়ই তা প্রত্যাখান করেছেন।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভয়ংকর ঘটনাটি ২০০৯ এবং ২০১০ সালে ঘটেছিল। ২০০৯ সালে, রনি তার ফুসফুসে একটি প্রাণঘাতী সংক্রমণের শিকার হন। এর ফলে রনির ফুসফুসে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এটি ডনিকেও প্রভাবিত করেছিল এবং তারা উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়েন। পরে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এ সময় তাদের অনেক যত্নের প্রয়োজন ছিল।

সে সময়টাতে তাদের পাশে ছিল তাদের ছোট ভাই জিম এবং তার স্ত্রী মেরি। রনি এবং ডনিকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়ার পর জিম এবং তার স্ত্রী মেরি তাদের দেখাশোনা করতেন। তবে তাদের জন্য এটা এতোটাও সহজ ছিল না। কারণ সমাজের এধরনের বিশেষ মানুষদের জন্য সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায় বা স্বেচ্ছাসেবীরা রয়েছে। তাদের অনুমতির পরই জিম এবং মেরি রনি, ডনির দেখাশোনা করা শুরু করে।

রনি, ডনি নিয়মিত এখন ডাক্তারদের পরামর্শ মতো খাওয়া থেকে শুরু করে চলাফেরায় এনেছেন পরিবর্তন। ২০০৯ সালে তাদের বন্ধু গ্লেন কোয়েট বলেছিলেন, "তাদের লক্ষ্য সর্বকালের সর্বাধিক জীবিত সংযুক্ত যমজ হয়ে বেঁচে থাকা।" ২০১৪ সালে ৬২ বছর আট মাস ৮ দিন বয়সে চ্যাং এবং ইঞ্জি বুঙ্কারকে ছাড়িয়ে ইতিহাসের দীর্ঘতম বেঁচে থাকা যুগল হয়ে উঠেন। এ উপলক্ষে তারা তাদের বন্ধুদের নিয়ে একটি পার্টির আয়োজন করেন। বর্তমানে তাদের বয়স ৬৭ বছর। তারাই পৃথিবীর যমজ ত্রুটিযুক্ত এবং সংযুক্ত মানুষ। যারা সবার থেকে বেশিদিন বেঁচে আছেন।

ডেইলি বাংলাদেশ/এএ