বিলুপ্তির পথে ১০ লাখ প্রাণী, সৌজন্যে মনুষ্য সভ্যতা!

বিলুপ্তির পথে ১০ লাখ প্রাণী, সৌজন্যে মনুষ্য সভ্যতা!

অনন্যা চৈ ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১০:০৫ ১৮ মে ২০১৯   আপডেট: ১০:০৬ ১৮ মে ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

দশ লাখেরও বেশি প্রজাতির পশুপাখি বিলুপ্তির মুখে। সৌজন্যে মনুষ্য সভ্যতা! ক’দিন আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের একটি রিপোর্টে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। তবে মাস ছয়েক আগে রাষ্ট্রপুঞ্জেরই অন্য একটি রিপোর্ট শুনে কপালে ভাঁজ পড়েছিল পুরো বিশ্বের। সেখানে বলা হয়েছিল, আর মাত্র এক যুগ বাকি। এভাবে মনুষ্য সভ্যতা বাড়তে থাকলে এক যুগ পরে বিশ্ব উষ্ণায়ন অসহনীয় হয়ে উঠবে। সেই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই আবারো নয়া এই রিপোর্ট চমকে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে।

মূলত এবারের রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের ‘ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স-পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভার্সিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস’ (আইপিবিইএস)। প্রায় ৫০টি দেশের ১৪৫ জন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত কমিটি এই রিপোর্ট তৈরি করেছে বলে সেখানে দাবি করা হয়েছে। সেই রিপোর্টে আরো বলা হয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বেপরোয়াভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের ফলে বিপন্ন হচ্ছে এই সব প্রজাতি। বছর খানেক আগের তুলনায় দশ থেকে একশ গুণ দ্রুত গতিতে নিশ্চিহ্ন হচ্ছে এরা।

তবে এর মূল যে কারণ সনাক্ত করা হয়েছে, তা হলো- বাসস্থান কমছে, অপব্যবহার হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদের, সেই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন এবং দূষণ। আর এই সব কিছুর পিছনে শুধুই মানুষ। বিপদে ৪০ শতাংশেরও বেশি উভচর, ৩৩ শতাংশেরও বেশি প্রবাল প্রাচীর। নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। 

এই প্রসঙ্গে আইপিবিইএস-এর অন্যতম বিশেষজ্ঞ রবার্ট ওয়াটসন বলেন, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। আমরা বাস্তুতন্ত্রের ওপরে নির্ভরশীল। ফলে ভুগতে হবে আমাদেরও। আজ আমরা তাদের ক্ষতি করে চলেছি তবে একসময় এর ক্ষতিপূরণ আমাদেরই গুনতে হবে। যেমন, চোরাশিকারিদের তাণ্ডবে শেষ হতে বসেছে কালো গন্ডার (ব্ল্যাক রাইনো)। 

এদিকে, ২০১৪ সালে ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৪০ বছরে পৃথিবীতে এদের সংখ্যা কমে অর্ধেক হয়ে গেছে। ভয়াবহভাবে বিপন্ন ‘হকসবিল সি টার্টল’। জঙ্গলের গভীরে মানুষের অনুপ্রবেশে মৃতপ্রায় দশা পাহাড়ি গোরিলাদের। রাশিয়া ও চীন সীমান্তে বাস আমুর লেপার্ড (বিরল প্রজাতির চিতাবাঘ)-এর। সংখ্যায় খুবই কমে গিয়েছে এই প্রজাতি। খননকাজ, পাম ও গোলমরিচ চাষের জন্য ক্রমশ বাসস্থান হারাচ্ছে সুমাত্রার ওরাংওটাং। ‘সাউথ চায়না টাইগার’কে অবলুপ্ত প্রজাতি বলেই ধরা হয় এখন। গত ২৫ বছরেও তাদের দেখা মেলেনি। সব মিলিয়ে এই ধরনের অনেক প্রাণী এখন হারিয়েছি আমরা।  

মূলত জীব বৈচিত্র ধ্বংসের নেপথ্যে মানুষ। ভূখণ্ডের ৭৫ শতাংশের প্রকৃতি বদলে গেছে এদের কারণে। সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ৬৬ শতাংশ ভেঙে পড়েছে মানুষের জন্য। আর এই সবটা হয়েছে শিল্পবিপ্লবের পরে। এর পিছনেও একটা বড় কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। এই রিপোর্টে আরো দাবি করা হয়েছে, গত ৫০ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে। এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি হয়ে প্রায় ৩৭০ কোটি থেকে ৭৬০ কোটি হয়ে গেছে। 

এই রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে, এই পরিমাণ জনসংখ্যার মধ্যে ভারতে মোট বসবাস করছে ১২৮ কোটি মানুষ। চিন প্রথম স্থানে, ১৪২ কোটি। চাষবাস ও পশুপালনের জন্যই ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ এবং স্বচ্ছ জলের ৭৫ শতাংশ ব্যবহার হয়ে যায়। রিপোর্টের সহ-লেখক স্যান্ড্রা ডিয়াজ়ের কথায়, এ গ্রহের সামান্য কিছু অংশ এখনো মানুষের হাতে পড়েনি। তাই বাকি প্রজাতি এখনো অক্ষত রয়েছে। 

এদিকে গবেষকরা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের মধ্যে সামুদ্রিক খাদ্য উৎসের এক-তৃতীয়াংশ শেষ করে ফেলেছে মানুষ। গাছ কাটা দ্বিগুণ হয়ে গেছে, এর মধ্যে বেশিটাই বেআইনিভাবে। ১৯৮০ সালের পর থেকে সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণ দশ গুণ বেড়েছে। প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ কোটি টন বর্জ্য মিশছে জলে। সমুদ্রে তৈরি হয়েছে ৪০০ ‘মৃত্যু এলাকা’। এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞানীরা বলছেন, সবটা একত্রিত করলে ব্রিটেনের থেকেও বড় হবে। 

তবে এত কিছুর পরেও হাল ছাড়তে রাজি নন বিজ্ঞানীরা। ওয়াটসনের কথায়, এখনো সময় আছে। তবে তার দেয়া মতামত হলো, অবিলম্বে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সর্বোপরি সামাজিক চিন্তাধারা বদলাতে হবে। জোরদার পদক্ষেপ করতে হবে রাষ্ট্রগুলোকে। সবুজ এমনভাবে বাড়াতে হবে, যাতে তা বিভিন্ন প্রাণীর বাসস্থানের ব্যবস্থা করে। একই সঙ্গে মানুষকে খাদ্যের জোগান দিতে হবে। দূষণ থেকে বাঁচাতে হবে সমুদ্রকে। 

তবে ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্র বাঁচাতে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রকৃতিবিজ্ঞানী রেচেল ওয়ারেন। তিনি বলেন, বন্যা রুখতে হবে, জল এবং বায়ুদূষণ বন্ধ করতে হবে। এগুলো তো মানুষের হাতেই। ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড’-এর আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র নীতির ডিরেক্টর গুন্টার মিটলাচের বলেন, আমরাই বোধ হয় প্রথম প্রজন্ম, যারা যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়েছি। আবার আমরাই শেষ প্রজন্ম, যারা এখনো চাইলে সব কিছু ঠিক করে দিতে পারি। অর্থাৎ মানুষই নায়ক আবার মানুষই খলনায়ক!

ডেইলি বাংলাদেশ/এসআই