বিরিয়ানির ইতিহাস নিয়ে যত কথা

বিরিয়ানির ইতিহাস নিয়ে যত কথা

মেজর মাহমুদ (অব:) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ২১:৪৬ ৩০ মার্চ ২০২০   আপডেট: ২১:৪৭ ৩০ মার্চ ২০২০

যেকোনো উৎসবের খাবারের আয়োজন বিরিয়ানি ছাড়া যেন অপূর্ণ থাকে

যেকোনো উৎসবের খাবারের আয়োজন বিরিয়ানি ছাড়া যেন অপূর্ণ থাকে

বিরিয়ানি—এটা এমন এক খাবার, যার পরিচয়ে অন্য কোনো বিশেষণ লাগে না। ঐতিহ্যবাহী এই খাবারের আবেদন যে এখনও অটুট আছে, তা এর জনপ্রিয়তা দেখলেই বোঝা যায়। বিশেষ করে ঈদসহ যেকোনো উৎসবের খাবারের আয়োজন বিরিয়ানি ছাড়া যেন অপূর্ণ থাকে। তুলতুলে মাংসের টুকরো আর সুসিদ্ধ আলু সমেত বিরিয়ানি পাতে নিয়ে নিজেকে নিজেই হয়তো প্রশ্ন করে বসতে পারেন, এই খাবারের জন্ম কীভাবে? এনিয়ে অনেক গল্প শোনা যায়। তবে সব গল্পের মাঝে যে মিলটা দেখা যায় তা হলো- বিরিয়ানির উৎপত্তি হয়েছে এশিয়ার পশ্চিমাংশ থেকে। এসব হাজারো গল্পের মাঝে তিনটি গল্পই সবচেয়ে বেশি ঐতিহ্যবাহী ও প্রচলিত।

ধারণা করা হয়, তুর্কি মঙ্গল বিজয়ী তৈমুর বিন তারাগাই বারলাস ১৩৯৮ সালে বিরিয়ানিকে ভারতবর্ষের সীমানায় নিয়ে আসেন। সেসময়ে একটা বিশাল মাটির হাঁড়িতে চাল, মসলা মাখা মাংস ও ঘি একসঙ্গে দিয়ে ঢাকনাটা ভালোভাবে লাগিয়ে দেয়া হতো। এরপর গনগনে গরম গর্তে হাঁড়িটি মাটি চাপা দিয়ে রাখা হতো সবকিছু সেদ্ধ হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর হাঁড়িটি বের করে তৈমুরের সেনাবাহিনীকে খাওয়ানো হতো। সেটিই এখন বিশ্বজুড়ে বিরিয়ানি নামে পরিচিত।

আরব ব্যবসায়ীদের হাত ধরে ভারতবর্ষে বিরিয়ানি আসার গল্পটাও বেশ প্রচলিত। ভারতবর্ষে বিশেষ করে মালাবারের দক্ষিণ উপকূলে তুরস্ক ও আরব ব্যবসায়ীদের বেশ আনাগোনা ছিল। তাদের কাছ থেকেই নাকি বিরিয়ানির উৎপত্তি হয়েছে। তবে পুস্তকে এই ঘটনার ব্যাখ্যা তেমন একটা পাওয়া যায়নি।

বিরিয়ানি নিয়ে মুঘল সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের গল্পটিই সবচেয়ে বিখ্যাত ও সমাদৃত

মুঘল সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের গল্পটিই সবচেয়ে বিখ্যাত ও সমাদৃত। কম-বেশি সবারই জানা, সম্রাট শাহাজাহানের তাজমহল তৈরির অনুপ্রেরণা হলো তার অনিন্দ্য সুন্দরী স্ত্রী মমতাজ মহল। কিন্তু তার আরো একটি পরিচয় আছে। ইতিহাস বলে, ভারতবর্ষে বিরিয়ানির সূচনাটা নাকি তার হাত ধরেই। একদিন মমতাজ মহল অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে সৈন্যদের ব্যারাকে যান। গিয়ে দেখেন, সৈন্যদের অবস্থা  খুবই করুণ। তাদের ভগ্ন স্বাস্থ্য তাকে এতটাই ভাবিয়ে তুললো যে তিনি তৎক্ষনাৎ সৈন্যদের বাবুর্চিকে ডেকে আনলেন। আর নির্দেশ দিলেন চাল ও মাংস দিয়ে এমন একটা খাবার তৈরি করতে, যা সৈন্যদের পুষ্টি দেবে ও স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনবে।

সম্রাজ্ঞীর নির্দেশ বলে কথা! নির্দেশনা অনুযায়ী চাল ও মাংস একসঙ্গে করা হলো একটি হাঁড়িতে। সঙ্গে যোগ করা হলো হরেক রকমের মসলা। সেই হাঁড়িকে আগুনের মধ্যে রাখা হলো কয়েক ঘণ্টা। তারপর যে খাবারটা তৈরি হলো, সেটাই আজকে বিরিয়ানি নামে পরিচিত। এরপরের ঘটনা সবারই জানা, এই খাবারের জায়গা হলো মুঘলদের খাবারের পাতে। আর মুঘলরা ভারতের যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই বিরিয়ানিকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এরপর সেখান থেকেই একেক স্থানে বিরিয়ানি পেয়েছে একেক মাত্রা। একারণে বিরিয়ানিতে আজ এত বৈচিত্র , এত রকমভেদ!

অতুলনীয় স্বাদের রহস্য

আপনাকে কেউ যদি প্রশ্ন করে, বিরিয়ানি কত প্রকার? সঠিক উত্তর দেয়া সম্ভব হবে না বোধহয়। কারণ নামে-বেনামে পৃথিবীতে কয়েকশ' রকমের বিরিয়ানি আছে। ভিন্ন স্বাদের বিরিয়ানির বিচিত্র সব নাম। এই সব বিরিয়ানির স্বাদে যতই বৈচিত্রতা থাকুক না কেন, রান্নার পদ্ধতিতে আসলে তেমন কোনো বড় ফারাক নেই। আসল বৈচিত্র লুকিয়ে আছে মসলার ব্যবহারে। বিরিয়ানির অতুলনীয় স্বাদের মূল কারণ হলো ‘দম’ এ রান্না হওয়া, আর মশলার স্বাদ তো আছেই।

কোলকাতা কাচ্চি; ছবি- ডেইলি বাংলাদেশ

বিরিয়ানি যে হাঁড়িতে রান্না করা হয় তাতে ঢাকনাটা ময়দার তাল বা ডো (dough) দিয়ে এমনভাবে আটকে দেয়া হয় যেন ভেতরের বাষ্প কোনভাবেই না বেরোতে পারে। অল্প আচেঁ হাঁড়িটা বসিয়ে, ধীরে ধীরে বিরিয়ানিটা রান্না হওয়ার পদ্ধতিকেই ‘দম পোক্ত’ বা দমে রান্না হওয়া বলে। আর এই দমে রান্না হয় বলেই, সুগন্ধি চাল, ঘি, জাফরান, গোলাপজল, কেওড়াজল আর বিভিন্ন মসলার স্বাদ ও সুঘ্রাণ সবকিছুই মিশে একাকার হয়ে যায়। সবিশেষে বিরিয়ানি পায় তার অতুলনীয় স্বাদ।

কাচ্চি বিরিয়ানি

আমাদের দেশে বিরিয়ানি মানেই যেন কাচ্চি। পুরান ঢাকার মানুষের কাছে কাচ্চির সমাদরটাই যেন খানিকটা বেশি। পুরান ঢাকার কিছু দোকানের কাচ্চি যেমন ঐতিহ্যবাহী, ঠিক তেমনি বিশ্ববিখ্যাত। কাচ্চি শব্দটা এসেছে উর্দু শব্দ ‘কাচ্চা’ থেকে যার অর্থ কাঁচা। বিরিয়ানি মূলত দু-ধরনের হয়ে থাকে, কাচ্চি আর পাক্কি। উর্দু শব্দ পাক্কির অর্থ হলো রান্না করা বা পাঁক করা।

কাচ্চি বিরিয়ানি রান্নার সময়, হাড়িতে চাল ও কাঁচা আলুর ওপর টকদই ও মশলায় মেখে রাখা কাঁচা মাংসের আস্তরণ দেয়া হয়। তারপর ভালো করে ঢাকা চাপা দিয়ে দমে রান্না করা হয়। মূলত খাসি বা পাঠার মাংস দিয়েই কাচ্চিা রান্না হয়। মশলা মাখা মাংস, সুগন্ধি চাল, ঘি, জাফরান, গোলাপজল সবকিছুর স্বাদ ও সুঘ্রাণ একসঙ্গে হয়ে দমে রান্না হতে হতে তৈরি হয় অতুলনীয় স্বাদের কাচ্চি। আর অন্যদিকে পাক্কি বিরিয়ানি রান্নার ক্ষেত্রে, মাংসটাকে আলাদা কষিয়ে রান্না করা হয়। আর চালটাকে আগে থেকেই ঘিয়ে ভেজে আধা সেদ্ধ করে নেয়া হয়। এরপর সব একসঙ্গে মিশিয়ে দমে দিয়ে রান্না করা হয়।

তেহারি; ছবি কৃতজ্ঞতা- উইথ অ্যা স্পিন

তেহারি ও বিরিয়ানির পার্থক্য

পুরান ঢাকার বিরিয়ানি যেমন বিখ্যাত, তেমনি সমান জনপ্রিয় তেহারি। তেহারি আসলে বিরিয়ানিরই একটা পরিমার্জিত রূপ। তেহারি বিরিয়ানির চেয়ে অনেক মসলাদার এবং ঝাল হয়। তবে তেহারির বিশেষত্ব হলো এতে প্রচুর পরিমাণ গরুর মাংস এবং কাঁচা মরিচ ব্যবহার করা হয়। এটা মূলত এক ধরনের পাক্কি বিরিয়ানি। তেহারিতে গরুর গোশতের ছোট ছোট টুকরা ব্যবহার করা হয়; আর বিরিয়ানির চেয়ে মাংসের পরিমাণটাও কিছু কম থাকে। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চড়া দামের কারণে খরচ বাঁচাতে এই খাবারের উৎপত্তি হয়েছিল। পুরান ঢাকার তেহারির বিশেষত্ব হলো, পুরো তেহারিটাই সরিষার তেলে রান্না করা হয়। আর এই সরিষার কড়া ঝাঁঝ তেহারিকে করে তোলে অনন্য।

পুরো পৃথিবী তো দূরের কথা কেবল এই ভারতবর্ষেই কত প্রকার বিরিয়ানি আছে, তার কোনো ইয়াত্তা নেই। তবে এর মাঝে ঢাকাই, হায়দ্রাবাদি, সিন্ধি, লখনৌই, বোম্বাই, থালেশ্বরী, কোলকাতাই, মালাবারি ইত্যাদি বিরিয়ানি উল্লেখযোগ্য।

ঢাকাই বিরিয়ানির ঐতিহ্য

এবার ঢাকাই বিরিয়ানির ঐতিহ্যের কথা আসা যাক! ‘ঢাকাই কাচ্চি’ রাজধানীর অন্যতম একটি ট্রেডমার্ক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। মুঘলদের হাত ধরে যেসব মোগলাই খাবার ঢাকা শহরে এসেছে, তার মাঝে বিরিয়ানিই যে সেরা তা কিন্তু বলাই যায়। ঢাকায় বিরিয়ানির কথা বললেই যে নামটি সবার আগে আসে তা হলো ‘হাজীর বিরিয়ানি’। ১৯৩৯ সালে হাজী গোলাম হোসেন সাহেবের হাত ধরেই শুরু হয় এ বিরিয়ানির পথচলা; যার কদর এখনো মোটেও কমেনি।

বলা যায়, হাজীর বিরিয়ানি থেকেই ঢাকায় শুরু হয় এই বিরিয়ানি শিল্প। ধীরে ধীরে ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি, চানখারপুলের হাজী নান্নার বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনুর বিরিয়ানি ইত্যাদি হয়ে উঠেছে সেই শিল্পেরই অংশ। আর এখন কেবল নতুন ও পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে নয়; দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকাই বিরিয়ানির জৌলুস এখন ছড়িয়ে গিয়েছে সুদূর প্রবাসেও।

বিয়ে কিংবা যে কোন অনুষ্ঠান বা আয়োজনে বিরিয়ানি সবসময়ই আমাদের প্রথম পছন্দ। আসলে বিরিয়ানি কে-না ভালোবাসে বলেন? আমার বিশ্বাস, আপনি বিরিয়ানির দারুণ ভক্ত বলেই এই লেখার শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছেন। এবার আপনি নিজেই নিজের জরিপ করে ফেলুন, কোথাকার বিরিয়ানি আপনার কাছে সেরা মনে হয় বা কার হাতের বিরিয়ানি আপনার সবচেয়ে প্রিয়!

সূত্র: দ্য বেটার ইন্ডিয়া, দেশি ব্লিটজ, উইথ অ্যা স্পিন, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও রোর বাংলা

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে