বিজয়ের আনন্দ, প্রত্যাশা পূরণের প্রজ্ঞা

নি য় মি ত ক লা ম

বিজয়ের আনন্দ, প্রত্যাশা পূরণের প্রজ্ঞা

ফকির ইলিয়াস

প্রকাশিত: ১৪:৪২ ৬ জানুয়ারি ২০১৯   আপডেট: ১৪:৫৯ ৬ জানুয়ারি ২০১৯

ফকির ইলিয়াস
ফকির ইলিয়াস- কবি, প্রাবন্ধিক। স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন নিউইয়র্কে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা - ১৮। 'কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস','একাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস',' দ্যা এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল', 'আমেরিকান ইমেজ প্রেস'- এর সদস্য।

শুধু বিজয় অর্জিত হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য একান্ত প্রজ্ঞা থাকতে হয়। থাকতে হয় ভিশন। সে কথাই জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল। অনেকেই আশা করেছিলেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট ৭০/৮০ আসন পাবে। তারা তা পাননি। কেন পাননি- এর কারণ তাদের নিজেরও অজানা নয়। তারা যুদ্ধাপরাধীদের দলটিকে কোলে তুলে নিয়েছিলেন। তাদের ২৫ টি আসন দিয়েছিলেন। এই বিষয়টি তরুণ প্রজন্ম ভালো চোখে নেয়নি।

সমস্যা আরও ছিল। বিএনপি নামক দলটি বাংলাদেশে ২১ আগস্টের মতো নির্মমতার হোতা ছিল- বিষয়টি এখন খুব পরিষ্কার। তারা হত্যার রাজনীতিতে মেতেছিল।আইভি রহমানের রক্তে ভেসেছিল ঢাকার রাজপথ। মৃত্যুর কাতরতায় সেদিন যারা শেষ নিঃশ্বাস নিয়েছিলেন- এরা সবার কি দোষ ছিল? কী ছিল তাদের অপরাধ? এমন অনেক কথাই বলা যাবে।

বিএনপি গত প্রায় দশ বছরে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারেনি। বরং তারা নানা রকম জ্বালাও পোড়াওয়ের নেপথ্যে ছিল। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ নির্বাচন ঘিরে যাদের খুন করা হয়েছে- তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের। তবুও তারা সহ্য করেছে। না হয় রক্তবন্যা বয়ে যেত। কারা এই খুন উসকে দিয়েছিলেন?

গণমানুষ সেই বিচার করেছেন। তারা ব্যালটের মাধ্যমে এই রায় দিয়েছেন।

আমরা দেখেছি নির্বাচনের উত্তাপ নিয়ে একটি মধ্যস্বত্ত্বভোগী শ্রেণি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। এমন একটি হীন নষ্টের দল- সব সময়ই তৎপর থাকে। সরকার এদের দমনে কঠোর হয়েছেন- সেটা খুবই স্বস্তির কথা।

বিএনপির সমর্থকরা যা'ই বলুন না কেন, একটি প্রমাণ আমি এখানে দিতে চাই। তাহলো, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিদেশের অনেকের কাছেই তাদেরকে ক্ষমতায় বসাবার জন্য ধরনা দিয়েছিলেন।

নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তারা চেয়েও ভারতের সাহায্য পাননি!

ভারতীয় সাংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন,'আমরা হতাশ হয়েছি। এ বছরের আগস্টে আমরা বিজেপির সাধারণ সম্পাদক রাম মাধবের সঙ্গে ব্যাংককে বৈঠকের জন্য চেষ্টা করেছিলাম; ভারতীয় পক্ষ এড়িয়ে গেছে।'

তিনি বলেছেন, 'আমরা ভারতের বন্ধুত্ব চেয়েছিলাম। আর বিএনপির সম্পর্কে ভারতের যে ধারণা— আমরা মোটেও জাতিগত দাঙ্গা, মৌলবাদে বিশ্বাস করি না। আমরা ভারত-বিরোধী বলে যে প্রচারণা আছে তা পুরোপুরি মিথ্যা, এটা আওয়ামী লীগের একটি অংশের ছড়ানো মিথ্যা প্রচারণা।'

নির্বাচন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল আরো বলেছিলেন, 'এখানে কোনো নির্বাচনী প্রচার নেই। এটা সন্ত্রাসের রাজত্ব, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসেরও।'

জামায়াত প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, 'আমাদের জামায়াত নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। আমি আপনাকে বলছি, বিএনপি জামায়াত নয়। বিএনপি ইসলামী আইনে বিশ্বাস করে না, মৌলবাদে বিশ্বাস করে না। জামায়াতের প্রতি আমাদের কোনো মোহ নেই।'

তিনি বলেছিলেন, 'জামায়াতের সঙ্গে জোট করার বিষয়টি ছিল কৌশলগত। তাদের সঙ্গে নিয়ে ৫০টি আসনে আমরা সুবিধা পাই, যেসব আসনে ব্যবধান খুবই কম এবং এই আসনগুলোতে কঠিন লড়াই হয়। আমাদের বাদ দিলে তাদের আসন মাত্র তিনটি।'

আওয়ামী লীগ একটি 'ঘৃণিত' রাজনৈতিক দল এমন মন্তব্য করে ফখরুল বলেছিলেন, শুধু ভারতের কারণে আওয়ামী লীগ টিকে আছে। ভারতই আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করেছে।

কিন্তু এটা কে না জানে, বিএনপি তাদের জন্ম থেকেই ভারত বিরোধিতা করে আসছিল। আর ভারত তাদের রক্ষাকারী কেন হবে? কেন বাংলাদেশের মানুষ তাদের পাশে দাঁড়ালো না?

এখন দেখা যাচ্ছে, ঐক্যফ্রন্টেই ভাঙন শুরু হয়েছে। ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের যে দুইজন এমপি পাশ করেছেন- তারা সংসদে শপথ নেবেন। তাদের একজন মৌলভীবাজার-২ আসনের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ নির্বাচন করেছিলেন 'ধানের শীষ' প্রতীক নিয়ে। তিনি এমপি হিসেবে শপথ নিলে বিএনপি তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয় কী না, কিংবা আইনগতভাবে তার এমপি পদ খারিজ হয়ে যায় কী না- তা ও দেখার বিষয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

সব মিলিয়ে 'বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে' বলে মহাসচিব মির্জা ফখরুল যে হুংকার নোয়াখালীতে দিয়েছেন, তা কতটা আলো পাবে- তা দেখার তালিকায়ই থেকে যাচ্ছে আপাতত।

দেশ আগামী পাঁচ বছর আওয়ামী লীগের মহাজোটের হাতেই শাসিত হবে এটা এখন পুরোপুরি নিশ্চিত। কিন্তু কথা হচ্ছে বিরোধী দলবিহীন সরকারি দল ভোগে খুব বেশি মরিয়া হয়ে উঠবে না তো !

একটি কথা বলা দরকার, শক্তিশালী বিরোধী দলবিহীন রাষ্ট্রে মূলত মিডিয়াকেই সরকারের প্রধান সমালোচকের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এটাও বলা প্রয়োজন মনে করি, পাঁচ জন এমপিও সরকারি দলকে চাইলে তটস্থ রাখতে পারেন-যদি তারা জোরালো ভূমিকা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনায় সংসদে থাকেন। একটি উদাহরণ দিই- যুক্তরাষ্ট্র সরকারে টানা ১৩ দিনের আংশিক অচলাবস্থা অবসানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে বাজেট বরাদ্দ নিয়ে নতুন একটি বিল অনুমোদন পেয়েছে।

ট্রাম্পের দাবি না মিটিয়েই সরকার সচলের পথে ডেমোক্র্যাটরা। তবে প্রতিনিধি পরিষদের এই উদ্যোগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ভিটো’ দেওয়ার বিষয়টি অনেকটাই নিশ্চিত বলে জানাচ্ছে মিডিয়াগুললো।

কারণ ট্রাম্প আগেই বলে দিয়েছেন, তার প্রস্তাবিত যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণের জন্য বাজেট বরাদ্দে তহবিল নেই এমন কোনো বিল তিনি স্বাক্ষর করবেন না।

ট্রাম্পের ওই হুমকি উপেক্ষা করেই নতুন প্রতিনিধি পরিষদের প্রথম দিন সীমান্ত প্রাচীরের জন্য তহবিল না রেখে নতুন বাজেট বরাদ্দ বিল উত্থাপন এবং তা অনুমোদন পেয়েছে।সীমান্ত প্রাচীর নির্মাণের জন্য ট্রাম্প পাঁচশ কোটি মার্কিন ডলার দাবি করেছেন।

হাউস স্পিকার ডেমোক্র্যাটিক নেতা ন্যান্সি পেলোসি স্পষ্ট করেই বলেছেন, নতুন বিলে সীমান্ত প্রাচীরের জন্য কোনো তহবিল নেই।

এই অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্রকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা এই মুহূর্তেই বলা যাচ্ছে না।

এসব নিয়ে কংগ্রেস-সিনেটে আলোচনা চলছে। চলবে। এটাই রাজনৈতিক নিয়ম। জননেত্রী শেখ হাসিনা বার বার বলছেন, 'ক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়, জাতির প্রতি কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনের। তিনি বলেন, ‘কারও কাছে ক্ষমতা হচ্ছে ভোগের বস্তু, আর কারও কাছে ক্ষমতা হচ্ছে কর্তব্য পালন করা। আমাদের চিন্তা হচ্ছে জাতির প্রতি কর্তব্য পালন। দেশের প্রতি, তার মানুষের প্রতি কর্তব্য পালন করা। মানুষ যে আমাকে একটা ভোট দিল, তার বদলে সে কী পেল—এটাই তখন বিবেচ্য হয়ে দাঁড়ায়।’

শেখ হাসিনা বলছেন, ‘আমরা দেশকে উন্নত করতে চাই। সেই লক্ষ্যে নিয়েই কিন্তু আমাদের রাজনীতি। আমরা নানা ধরনের রাজনীতি অতীতে দেখেছি। কিন্তু যে দলটা একেবারে তৃণমূল থেকে মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা চিন্তা করে গঠিত হয় এবং মানুষের জন্য কাজ করতে পারে, ত্যাগ স্বীকার করতে পারে, তাদের মানুষের জন্য চিন্তাভাবনাটা অন্য রকম থাকে। হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসলে তাদের চিন্তাটা অন্য রকম।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলছেন, ‘ভোটের অধিকারটাও কিন্তু আমাদের অর্জন করতে হয়েছে—অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে। সেটাও আমাদের মনে রাখতে হবে। কাজেই আমরা সেই চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করছি বলেই আজকে যেমন মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি, মানুষের জীবনমান কিছুটা হলেও উন্নত করতে পেরেছি। আমরা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করেছিলাম—স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব মধ্যম আয়ের দেশে বাংলাদেশকে উন্নীত করে আর ২০৪১ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের এমপিদের উদ্দেশে দলীয় সভাপতি ও সংসদীয় দলের নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, জনগণ যদি সঙ্গে থাকে তাহলে কেউ আমাদের রুখতে পারবে না। আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা জনগণের সঙ্গে থাকবেন। তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন।

তিনি বলেছেন, মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, এখানে ক্ষমতাকে কেউ ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করবেন না। আমরা আজকে আছি, কিন্তু ক্ষমতা কোনোভাবেই চিরস্থায়ী নয়।

প্রধানমন্ত্রী ১৯৭৫ সাল পরবর্তী তার প্রবাস জীবনের স্মৃতিচারণ করেন বলেছেন, আমি জার্মান গেলাম ওখান থেকে ভারত আসলাম, সেখানে মিসেস গান্ধী আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, তখন আমাদের দল বলতে কিছুই ছিল না, তারপর আমি লন্ডন গিয়েছি, সেখান থেকে আস্তে আস্তে দল গোছাতে শুরু করি। লন্ডনে থাকাকালীন টাকার অভাবে জয়ের সেমিস্টার ড্রপও করতে হয়েছিল, আবার টাকা জোগাড় করে সেমিস্টার শুরু করতে হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে সেই দিন আর নেই।

এসব কথা নতুন এমপিদের মনে রাখতে হবে। এই দেশের আপামর মানুষের একটি বড় অংশ গরীব-দুঃখী। এমপিরা এই দুঃখ মোচনে ব্রত হবেন, এই প্রত্যাশাই করছে প্রজন্ম তাদের কাছে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর