বায়ুদূষণের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ জরুরি

বায়ুদূষণের ভয়াবহতা থেকে উত্তরণ জরুরি

প্রকাশিত: ১৫:৪৪ ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

নব্বইয়ের দশকের অন্যতম কবি বীরেন মুখার্জী। পেশা: সাংবাদিকতা। পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস রাজনৈতিক কলাম লিখে চলেছেন একাধারে।  তার আগ্রহের অন্যতম বিষয় ‘মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ‘লোকঐতিহ্য’। সম্প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাণে। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ঘোর’ বেশ প্রশংসিত হয়েছে।

এ বছর বিশ্বের দূষিত বায়ুর নগরীর তালিকায় শীর্ষের দিকে অবস্থান ছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার। এবার বায়ু দূষণে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও উঠে এসেছে।

সম্প্রতি গ্রিন পিসের ‘বিষাক্ত বায়ু : জীবাশ্ম জ্বালানির খেসারত’ শীর্ষক বৈশ্বিক এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, বায়ুদূষণে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি সোয়া লাখ কোটি টাকা। প্রথমবারের মতোই বায়ুদূষণে আর্থিক ক্ষতির আনুমানিক এই হিসাব তুলে ধরল সংস্থাটি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ক্ষতির পরিমাণ জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রায় ৫ শতাংশ। বায়ুদূষণজনিত রোগে শিশুর অকালমৃত্যুর একটি হিসাবও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদন মতে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৯৬ হাজার শিশুর অকালমৃত্যু হয়েছে। বায়ুদূষণজনিত সামগ্রিক এই ক্ষতি অত্যন্ত উদ্বেগের। 

জানা যায়, বায়ু দূষণের কারণে এক দিনে বিশ্বের মোট আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার। আর  বাংলাদেশে বছরে ক্ষতি ১ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে বিশ্বে ৪০ লাখ শিশু তাদের পঞ্চম জন্মদিনের আগেই মারা গেছে। বছরে ৪০ লাখ মানুষ অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আসছে চিকিৎসা নিতে। গ্রিন পিসের প্রতিবেদন তৈরির সঙ্গে যুক্ত ঢাকার স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মজুমদার গণমাধ্যমে বলেছেন, বায়ুদূষণের আর্থিক ক্ষতি বলতে চিকিৎসা খরচ, কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া, কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো আমলে নেওয়া হয়েছে। আর গ্রিন পিসের এই প্রতিবেদনে বিশ্বের বায়ুদূষণের প্রধান কারণ বা উৎস হিসেবে জীবাশ্ম জ্বালানিকে দায়ী করা হয়েছে। মূলত বিদ্যুৎ ও অন্যান্য শক্তি উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে কয়লা ও তেল ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব জ্বালানি যানবাহন, শিল্পকারখানাসহ অন্যান্য কাজেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব জ্বালানি থেকে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর সূ² বস্তুকণা পিএমÑ২.৫ ও পিএম-১০ বের হচ্ছে। একই সঙ্গে ভারী বস্তুকণাও বাতাসে গিয়ে মিশছে।

উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৯ সালের শেষভাগের মতো ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থা ইপিএর প্রতিবেদনে বিশ্বের দূষিত বায়ুর দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত একযুগে ৫৪ ধাপ নিচে নেমেছে, এমন উদ্বেগের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছিল। আমরা দেখেছি, এরপর সরকারের পক্ষ থেকে বায়ুদূষণ রোধে নানান পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। বায়ুদূষণের উৎসগুলোও বন্ধের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটা ঠিক যে, অনেক ইটভাটা বন্ধ করা হয়েছে। বায়ুদূষণের কারণগুলোর মধ্যে ইটভাটার পরই রয়েছে ধুলাবালি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ভবন। কিন্তু এসব স্থাপনা তৈরির সময় মানা হচ্ছে না ইমারত নির্মাণবিধি। ভবন তৈরির সময় সেগুলো কোনো কিছু দিয়ে ঢেকে দেওয়া বা পানি ছিটিয়ে কাজ করার প্রবণতা একদম নেই। এসব তদারকের কার্যকর ব্যবস্থা বা নীতিমালার অভাবও লক্ষণীয়। ফলে ধুলো উড়ছে বাতাসে। দূষিত হচ্ছে বায়ু। এ ছাড়া ফুটপাতের উন্নয়ন, ইউলুপ ও উড়ালসেতু নির্মাণ, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য খোঁড়াখুঁড়ি তো চলছেই। আবার সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো ময়লা বহনের সময় অধিকাংশ সময় না ঢেকেই বহন করে, ফলে বায়ুদূষণ হয়।

দূষিত বায়ু জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধূলিকণা মানবদেহের ভেতরে ঢুকে ফুসফুসে গেঁথে থাকে এবং একনাগাড়ে এসব উপাদানের ভেতর দিয়ে চলাচল করলে হৃদ্রোগ, হাঁপানি ও ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বায়ুদূষণের পেছনে যেসব কারণ রয়েছে তা সংশ্লিষ্টদের অজানা নয়। সুতরাং বায়ু দূষণ রোধে একটি সামগ্রিক চিন্তা ও পরিকল্পনা জরুরি। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ ও কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে বায়ু দূষণ রোধে যথাযথ উদ্যোগ নিতে না পারলে পরিস্থিতি সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, এমন আশঙ্কা অমূলক হতে পারে না। 

এই বায়ু দূষণের হাত থেকে বাঁচতে হলে যেসব সুনির্দিষ্ট কারণে বায়ুরদূষণ হচ্ছে, দূষণ রোধে সে সব দিকে মনোযোগ দেওয়ার বিকল্প থাকা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্রজন্ম যদি দীর্ঘসময় বায়ু দূষণের মধ্যে কাটিয়ে দেয়, তার মারাত্মক প্রভাব পড়ে পরবর্তী প্রজন্মের ওপর। বায়ু দূষণের কারণে সৃষ্ট রোগ-ব্যাধির কথাও কারো অজানা নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় বায়ুতে ক্ষতিকর বস্তুকণার পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বেঁধে দেয়া সীমার দশগুণের বেশি। এ তথ্য আঁতকে ওঠার জন্য যথেষ্ট নয় কি? গবেষকরা মনে করেন, অপরিকল্পিতভাবে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠা, ঢাকার মতো বড় শহরের চারপাশে ইটভাটা, শহরের মধ্যে নানা কারখানা স্থাপন বায়ু দূষণের অন্যতম একটি কারণ। সেই সঙ্গে শহরের প্রচুর ধুলা এবং নির্মাণ কাজেও বায়ু দূষণ ঘটছে। ট্রাফিক জ্যামের কারণে গাড়িগুলো রাস্তায় অতিরিক্ত সময় ধরে চলছে, সেগুলো অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ করছে, এসবও বায়ু দূষণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আবার বায়ু দূষণের কারণে পরিবেশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ায় তা ঠাণ্ডা করতে মানুষ অতিরিক্ত এসি ব্যবহার করছে; এতে বায় দূষণ আরো বাড়ছে। 

গত বছর বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, বায়ু দূষণ কমানো গেলে বাংলাদেশ ৫ ভাবে উপকৃত হবে। ১. গড় আয়ু: স্টেট অব গ্লোবাল এয়ারের মতে, বায়ু দূষণ রোধ করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষের গয় আয়ু বাড়বে এক বছর তিন মাসের বেশি। ২. জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা: বায়ু দূষণ রোধ করা গেলে সবচেয়ে বড় উপকারটি হবে ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সহায়তা’। বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রকোপ রোধে বায়ু দূষণ রোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৩. রোগ সংক্রমণ থেকে রক্ষা: বায়ু দূষণের জন্য মানুষের শরীরে যেসব রোগের সংক্রমণ বেড়ে যাচ্ছে, সেগুলো থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। ৪. প্রতিবন্ধী সমস্যা : প্রতিবন্ধী শিশু জন্ম নেওয়ার সংখ্যা কমে যাবে, তেমনি শিশু ও মানুষের গড় আয়ু বাড়বে। ৫. অর্থনৈতিক সুবিধা : বায়ু দূষণ কমানো গেলে একদিকে যেমন মানুষের অসুস্থতা কমবে, গড় আয়ু বাড়বে, সময় সাশ্রয় হবে, পাশাপাশি বেড়ে যাবে জিডিপিও। যে কারণে বায়ুদূষণে আর্থিক ক্ষতি সংক্রান্ত গ্রিন পিসের এ প্রতিবেদনটি সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। বায়ু দূষণ রোধে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো জরুরি। সচেতনতামূলক কার্যক্রমও গ্রহণ করতে হবে। আর এটি করতে হবে সরকারকেই। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর