Alexa বালিহাঁসে হাসছে আলতাদিঘি

বালিহাঁসে হাসছে আলতাদিঘি

তরিকুল ইসলাম জেন্টু, নওগাঁ প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৩৪ ১৯ জানুয়ারি ২০২০  

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি : ডেইলি বাংলাদেশ

শালবনের সারি সারি গাছ আর পড়ে থাকা শুকনো পাতার শব্দে মন জুড়িয়ে যায়। মেঘেরা হারিয়ে যায় অগণিত শালগাছের আড়ালে। দূর থেকে চোখে পড়ে জংলি ফুল। অচেনা ফুলের ঘ্রাণে জেগে ওঠে প্রেম। নাম না জানা অচেনা পাখি আর কোকিলের ডাকে নিমেষেই যেন নেমে আসে বসন্ত। প্রকৃতিও যেন নিজেকে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে। শালবনঘেরা নিরিবিলি এই পরিবেশ যে কাউকে বিমোহিত করে।

এমন দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের শালবনঘেরা নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলার আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যানের কথাই মনে করিয়ে দেয়। 

একটি দিঘিকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে সুবিশাল বনভূমি। শালবন এবং বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদে পরিপূর্ণ ২৬৪ হেক্টর জমির এই বনভূমির ঠিক মাঝখানেই রয়েছে প্রায় ৪৩ একর আয়তনের এই বিশাল দিঘি। এর জলসীমার দৈর্ঘ্য ১ দশমিক ২০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ শূন্য দশমিক ২০ কিলোমিটার। শীত মৌসুমে প্রতিবছরের মতো এ বছরও বালিহাঁসসহ নাম না জানা অনেক অতিথি পাখির কলকাকলিতে যেন হাসছে এই দিঘি।

আনুমানিক ১৪০০ সালে এ অঞ্চলে রাজা বিশ্বনাথ জগদ্দল রাজত্ব করতেন। আবহমানকাল থেকেই রুক্ষ এই বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির অভাব ছিল। রাজা বিশ্বনাথের রাজত্বকালে এই পানির অভাব প্রকট হয়। মাঠঘাট শুকিয়ে চৌচির হওয়ায় আবাদি জমিতে ফসল ফলানোও অসম্ভব হয়ে পড়ে। হঠাৎ একদিন রানি স্বপ্নে দেখেন, পানি সমস্যা সমাধানে এলাকায় খনন করতে হবে একটি দিঘি। সে অনুযায়ী রানি রাজাকে বললেন, যতক্ষণ পর্যন্ত না পা ফেটে রক্ত বের হবে, ততক্ষণ তিনি হাঁটতে থাকবেন এবং যেখানে গিয়ে পা ফেটে রক্ত বের হবে ততদূর পর্যন্ত একটি দিঘি খনন করে দিতে হবে। 

পাইক-পেয়াদা, লোক-লস্করসহ রানি হাঁটা শুরু করলেন। অনেক দূর হাঁটার পর রানি যখন থামছিলেন না, তখন পাইক-পেয়াদারা ভাবলেন এত বড় দিঘি খনন করা রাজার পক্ষে সম্ভব হবে না। সে কারণে তাদের একজন রানির পায়ে আলতা ঢেলে দিয়ে চিৎকার করে বললেন, রানি-মা আপনার পা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। এ কথা শুনে রানি সেখানেই বসে পড়েন। তখন রাজা বিশ্বনাথ ওই স্থান পর্যন্ত একটি দিঘি খনন করে দেন। এর পর অলৌকিকভাবে মুহূর্তেই বিশুদ্ধ পানিতে ভরে ওঠে দিঘি। রানির পায়ে আলতা ঢেলে দেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দিঘিটির নামকরণ করা হয় আলতাদিঘি।

২০১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আলতাদিঘিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। একসময় এই বনে প্রচুর মেছোবাঘ থাকলেও তা নেমে এসেছিল শূন্যের কোঠায়। সম্প্রতি পর্যটক টানতে আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যানটিতে মেছোবাঘ, অজগর, বিরল প্রজাতির গন্ধগোকুল, তক্ষক, বনবিড়াল, কালিম পাখি অবমুক্ত করা হয়। 

বনে পর্যটকরা অজগর দেখতে না পেলেও মেছোবাঘ ও তক্ষক দেখেছেন একাধিকবার। তবে অজগর অবমুক্ত করার কিছু দিন পরই শালবনে অজগরের শেয়াল খাওয়ার দৃশ্য স্থানীয় মোল্লা পাড়ার বাসিন্দা অনিল টুডু দেখতে পেয়েছিলেন। সেই সময় এই খবর আঞ্চলিক ও জাতীয় দৈনিকগুলোয় প্রকাশিত হয়েছিল। 

বনের মাঝে রয়েছে ছোট-বড় অনেকগুলো উইপোকার ঢিবি। বনবিভাগের দাবি, অবমুক্ত করা এসব প্রাণী আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যান এলাকায় বসবাস করছে।

আলতাদিঘি সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান জানান, দিঘির চারধারে ছোট ছোট সিমেন্টের ঢালাই চেয়ার বসানো হলেও পর্যটকদের জন্য নেই তেমন কোনো ব্যবস্থা। মূলত জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের একমাত্র ভরসা স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের দিনের বেলায় বিশ্রাম, মানসম্মত খাবার, পিকনিক স্পট ও রাতে থাকার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ভোগে পড়তে হয়। 

আলতাদিঘিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সংস্কারের অভাবে আশানুরূপ পর্যটক আসেন না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করে পর্যটক আকর্ষণে এই উদ্যানকে আরো আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

বনবিট কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানান, সম্প্রতি ধামইরহাটে বন ও পরিবেশমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন পরিদর্শন করেছেন। তিনি আলতাদিঘি খনন, অবকাঠামো নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণ, মিনি চিড়িয়াখানা, শোভাবর্ধনে গাছ রোপণ, শিশুদের জন্য দোলনা স্থাপন, শালবনে পর্যটকদের ঘোরাঘুরির জন্য ফুট্রেল নির্মাণ, গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা এবং ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণের বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। শিগগির বাস্তবায়ন করা হবে এসব প্রকল্প।

ইউএনও গণপতি রায় জানান, আলতাদিঘি জাতীয় উদ্যানকে আরো আধুনিক করে গড়ে তুলতে যে অবকাঠামো প্রয়োজন, তা বাস্তবায়ন করা হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএইচ