বাবুল গোমেজ থেকে যেভাবে ‘জাম্বু’

বাবুল গোমেজ থেকে যেভাবে ‘জাম্বু’

সৈয়দা সাদিয়া ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৩:৫৭ ২ মে ২০১৯  

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাবুল গোমেজ। মেথর পট্টি থেকে উঠে আসা এক ভিলেনের নাম এটি। হয়ত এই নাম বলাতে কেউ বুঝতে পারেননি, কে তিনি? কারণ বাবুল গোমেজ নামে কোন ভিলেনের নামতো কেউ শুনেনি। এই নামটি তার আসল নাম, যে নামে সিনেমায় কখনো তাকে ডাকা হয়নি। তার শরীরের রঙ কৃষ্ণবর্ণ। মাথায় একটাও চুল নেই। ঠোটের কোণে নিষ্ঠুর এক হাসি। এটুকু বর্ণনাতেই হয়ত বুঝতে পারছেন, কার কথা বলছি? যাইহোক পরিষ্কার করেই বলি, তিনি হলেন ‘জাম্বু’। যাকে সিনেমায় এক কঠিনরূপি চেহারায় দেখা গেছে বারবার। 

নিখাঁদ এক নেতিবাচক চরিত্রের গডফাদার তিনি। নিশ্চয়ই এবার সবাই চিনতে পেরেছেন তাকে। জাম্বু ঢাকার সিনেমার খুব পরিচিত একটি মুখ। টাকার বিনিময়ে কাউকে খুন করতে হবে, কাউকে উঠায় নিয়ে আসতে হবে, আবার কারো ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিতে হবে, তাহলে জাম্বু হাজির হত। একটা সময় তাকে দেখা মাত্রই চিনে ফেলতো সব দর্শক। এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, কম বেশী সব সিনেমায় পাওয়া যেত তাকে। ‘ছেড়ে দে শয়তান, ঘরে কি তোর মা বোন নেই’ – এই সংলাপটা সবচেয়ে বেশি শুনতে হয়েছে সম্ভবত এই জাম্বুকেই। এমনকি নব্বইয়ের দশকে কোন মোটা মানুষ দেখলেই বলা হত ‘জাম্বু’ বলে! এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন এই ভিলেন। তবে তার সম্পর্কে আমরা কয়জন জানি। 

তাই ডেইলি বাংলাদেশের পাঠকদের জন্য থাকছে আজ জাম্বুকে নিয়ে বিস্তারিত। যেখানে তার সম্পর্কে জানা অজানা অনেক অধ্যায় ফুটিয়ে তোলা হবে। জাম্বুর চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের সময়কাল বেশ দীর্ঘ। সাদাকালো যুগ থেকে শুরু করে রঙিন যুগ অবধি তিনি কাজ করে গেছেন। পরিচিত মুখ হলেও খুব বড় মাপের চরিত্র খুব কমই পেতেন এই ভিলেন। তবে জাম্বু সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন মূল খল-নায়কের ‘ডান হাত’, ‘বাম হাত’ বা সহকারী হিসেবে।

নায়িকাকে তুলে আনতে হবে, কে যাবে? অবশ্যই জাম্বু! বস্তি উচ্ছেদ করতে হবে? কার নিয়ন্ত্রণে যাবে? তাও জাম্বু। পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, কে যাবে? সেখানেও জাম্বু। মূলত এই ধরণের চরিত্রগুলো বেশী করতেন জাম্বু। কারণ, তার চেহারা, দৃষ্টি কিংবা কণ্ঠস্বর – সব কিছুতেই ছিল একধরণের ভয়। ফলে ভীতিকর কাজগুলো করার জন্য তার জুড়ি ছিল না সিনেমাতে। তাইতো একসময় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনবদ্য ভিলেন। কারণ বড় কোনো চরিত্র না করলেও তিনি সিনেমাগুলোতে ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ হিসেবে থাকতেন। ভিলেনের দলে জাম্বু না থাকলে যেন ভিলেনদের খুব একটা প্রতাপশালী বলে মনেই হত না। তাই তাকে কম বেশী সব সিনেমায় রাখা হত। 

এই কারণে জাম্বুর সিনেমার সংখ্যাও নেহায়ত কম নয়। খুব বেশী সিনেমায় অভিনয় করেছেন তিনি। এর মধ্যে কিছু সিনেমা হল, ‘ঘাতক’, ‘কালিয়া’, ‘বন্ধু’, ‘সাজা’, ‘দোস্ত দুশমন’, ‘রাখাল রাজা’, ‘নয়নের আলো’, ‘বজ্রপাত’, ‘খুনের বদলা’, ‘অঙ্গার’, ‘বিপ্লব’, ‘যোদ্ধা’, ‘অভিযান’, ‘উসিলা’, ‘নিষ্পাপ’, ‘অমর’, ‘মৃত্যুদণ্ড’, ‘জ্যোতি’, ‘সাথী’, ‘মূর্খ মানব’, ‘দেন মোহর’, ‘প্রেম দিওয়ানা’, ‘চাকর’, ‘ববি’, ‘রাজলক্ষী শ্রীকান্ত’, ‘দায়ী কে’, ‘মিস লংকা’, ‘সাগরিকা’, ‘নির্মম’, ‘আত্মরক্ষা’, ‘পরিবার’, ‘সন্ত্রাস’, ‘অতিক্রম’, ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’, ‘উত্থান পতন’, ‘নয়নমণি’, ‘হাবিলদার’, ‘বিজয়’, ‘ঝুমুর’, ‘গোলাবারুদ’, ‘বাঘা বাঘিনী’, ‘সমর’, ‘অপরাজিত নায়ক’, ‘আপোষ’, ‘বিজলী তুফান’, ‘মাটির ফুল’, ‘পালকি’, ‘রুবেল আমার নাম’, ‘আঁচল বন্দী’, ‘টাইগার’, ‘বনের রাজা টারজান’, ‘হিরো’, ‘রাজাবাবু’, ‘নয়া লায়লা নয়া মজনু’, ‘শিকার’, ‘শত্রু ধ্বংস’, ‘আত্মত্যাগ’,  ‘সাগর ভাসা’, ‘এক মুঠো ভাত’, ‘রক্তের দাগ’, ‘শীষনাগ’, ‘সেলিম জাভেদ’, ‘হাসান তারেক’, ‘নির্দোষ’, ‘মোহাম্মদ আলী’, ‘ধর্ম আমার মা’, ‘ডাকাত’, ‘নবাব’, ‘রাস্তা’, ‘রাস্তার রাজা’, ‘রকি’। এই ধরণের আরো অসংখ্য ছবিতে কাজ করেছিলেন জাম্বু।

জাম্বু যে ধরণের চরিত্রই করুক না কেন তার শরীর ও রাগী চেহারা তাকেই ভিলেন বলে মনে হত। কারণ ভিলেনের যে লুক থাকা দরকার, সেটা একমাত্র জাম্বুর মধ্যে ছিল। তবে উপরোক্ত সিনেমাগুলোতে জাম্বুর কাজ ছিল মূলত দুটো। এক. মূল ভিলেনের নির্দেশ মেনে কোনো একটা কাজ করা। দুই. নায়কের হাতে শুধু মার খাওয়া। প্রায়ই দেখা যেত, ভিলেনের দেওয়া অ্যাসাইনমেন্ট অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে ব্যর্থ হওয়ায় মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হচ্ছে তাকে। আসলে তার কোনো রেহাই ছিল না। হয় নায়ক মারবেন, না হয় মেইন ভিলেন- এই চলে যেত জাম্বুর সিনেমার রুল। অর্থাৎ সিনেমায় তাকে ছবি শেষের আগে মরতেই হত।

জাম্বু সবচেয়ে বেশি অভিনয় করেছেন হয়ত নায়ক জসিমের সঙ্গে (সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি)। তাই মারও বেশী খেয়েছেন তার কাছে। জসিমের মার খেয়ে জাম্বু আছড়ে পড়বেন, আর দর্শক শিষ বাজাবে – এইটাই ছিল ওই সময়ের সিনেমার মুল চমকপ্রদ বিষয়। জসিম ও জাম্বুকে এক সঙ্গে ‘হিরো’, ‘রকি’, ‘মোহাম্মদ আলী’ ইত্যাদি ছবিতে দেখা গেছে। আর সিনেমাভূবনে জাম্বুর উল্লেখ্যযোগ্য চরিত্রের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই বলতে হবে ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ছবির কথা। এখানে তিনি ছিলেন মোহাম্মদী বেগের চরিত্রে। এটি আলোচিত হয়, কারণ তার হাতেই খুন হয় স্বয়ং সিরাজউদ্দৌলা। ১৯৮৭ সালে তিনি ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’ ছবিতে অর্জুন সিংয়ের চরিত্রে কাজ করেছেন।

তবে নেতিবাচক চরিত্র থেকে বের হওয়ার চেষ্টা খুব কমই করেছেন জাম্বু। ইতিবাচক চরিত্রে তাই তার কাজ সর্বসাকুল্যে একটি। ছবির নাম ‘আত্মরক্ষা’। এই একটি ছবিতে তিনি ভালো মানুষের রুপে হাজির হয়েছিলেন। জাম্বুর জীবনের গল্পটাকে কেউ চাইলে অনুপ্রেরণা হিসেবেও নিতে পারেন। তার জন্ম ১৯৪৪ সালের, ঢাকার মানিকগঞ্জে। তিনি দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকার মেথরপট্টিতে বেড়ে উঠেছেন। এছাড়া কাজ করতেন শ্রমিকের। কাজের সন্ধানেই এসেছিলেন ঢাকায়। জীবনের নানা বাঁকে কতই না কাজ খুঁজেছেন তিনি। তবে কে জানতো, এভাবে বদলে যাবে জাম্বুর জীবন? সেই ঢাকাই এসে বাবুল গোমেজ হয়ে যান জাম্বু। বদলে যায় জীবনের প্রেক্ষাপট। এভাবেই একটা সময় তিনি হয়ে উঠলেন বাংলা সিনেমার অপরিহার্য্য এক ভিলেন।

তবে অপরিহার্য ও অবিসংবাদিত ভিলেন হলেও জাম্বুকে বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তিদের কাতারে রাখা যাবে না। কারণ, আগেই বলেছি, তিনি সিনেমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও মুল ভুমিকা, চরিত্র ও নেগেটিভ পজেটিভ এসবে ভাবতেন না। তাই তার অধিকাংশ কাজই একই ঘরানার। তবে, তিনি দক্ষ একজন অভিনেতা ছিলেন। প্রতিটা কাজে তার নিজস্ব একটা সিগনেচার থাকতো। যত অল্প সময়ই স্ক্রিনে থাকতেন, চমকে দিতে জানতেন সকলকে। আর হল মাতাতে জাম্বুর কোন বিকল্প ছিল না।

এদিকে, জাম্বু মারা যান ২০০৪ সালের, মে মাসে। এই মাসের তিন তারিখ তিনি পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যান। তবে একটা দুঃখের বিষয়, এই দিনটি আসলে চলচ্চিত্রের কারো কোন মাথা ব্যথা দেখা যায় না। তাহলে কী সকলে জাম্বুকে ভুলে গেছেন? নাকি তাকে মনে রাখার কিছুই নেই, এমন প্রশ্ন অনেকের।

ডেইলি বাংলাদেশ/টিআরএইচ