Alexa বাজেট হোক জনবান্ধব

বাজেট হোক জনবান্ধব

প্রকাশিত: ১৫:১৯ ২২ জুন ২০১৯  

অাফরোজা পারভীন, কথাশিল্পী, কলাম লেখক, সম্পাদক। জন্ম ৪ ফোব্রুয়ারি ১৯৫৭, নড়াইল। সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে অবাধ পদচারণা। ছোটগল্প, উপন্যাস, শিশুতোষ, রম্য, স্মৃতিকথা, অনুবাদ, গবেষণা ক্ষেত্রে ১০১টি পুস্তক প্রণেতা। বিটিতে প্রচারিত টিয়া সমাচার, ধূসর জীবনের ছবি, গয়নাসহ অনেকগুলি নাটকের নাট্যকার। `অবিনাশী সাঈফ মীজান` প্রামাণ্যচিত্র ও হলিউডে নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য `ডিসিসড` চলচ্চিত্রের কাহিনিকার। রক্তবীজ ওয়েব পোর্টাল www.roktobij.com এর সম্পাদক ও প্রকাশক। অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব

২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আহ ম মুস্তফা কামালের এটি প্রথম বাজেট উপস্থাপন। তবে পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে গত কয়েকবছর তিনি বাজেট তৈরির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাছাড়া তিনি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (এডিপি) সরকারের সকল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

কাজেই বাজেট প্রণয়ন তার জন্য কোনো ব্যাপার নয়, ব্যাপার বাস্তবায়ন। তাছাড়া শেখ হাসিনা সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট এবং নতুন অর্থমন্ত্রীর হাতে প্রথম বাজেট। সঙ্গতকারণে সব শ্রেণির জনগণ উৎসুক এবারের বাজেটের ব্যাপারে। সংসদে বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী কিঞ্চিৎ অসুস্থতা বোধ করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অর্থমন্ত্রীর পক্ষে বাকি বাজেট উপস্থাপন করেন। এ ধরণের কাজ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগেও করেছেন। দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার, অন্যের সহায়তায় এগিয়ে আসার প্রবণতা তার  মাঝে আগেও আমরা দেখেছি। বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনেও উপস্থিত ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বাজেটের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবও দেন।  ৩০ জুন বাজেট পাশ হবে।

বরাবরের মতো সবাই বাজেট নিয়ে চিন্তা করছে। সবচেয়ে বেশি চিন্তিত দরিদ্র আর মধ্যবিত্ত শ্রেণি। তাদের মনে একটাই চিন্তা কাজ করছে- কে জানে এবার আবার জিনিসপত্রের দাম কত বাড়বে! নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়লে তো মহামুশকিল। বিলাসদ্রব্যের দাম বাড়লে না হয় ব্যবহার করা বাদ দেয়া গেল। কিন্তু চাল ডাল লবণ মাছ এসব তো বাদ  দেয়ার জিনিস নয়। শিশুখাদ্য, ওষুধ এসব তো কিনতেই হবে সে যত কষ্টই হোক। তাই তাদের একটাই চিন্তা, চাল ডাল আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেন না বাড়ে। 

বছর দুয়েক আগে টমেটোর দাম আকাশচুম্বি হয়েছিল। একদিন টমেটো নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। তখন আমার এক বান্ধবী সাফ বলেছিল, ‘টমোটোর দাম বেড়েছে তা নিয়ে অত মাথা ঘামানোর কী আছে। দাম বেড়েছে, স্রেফ খাওয়া ছেড়ে দাও। টমেটো তো আর এমন জিনিস না যে না খেলে চলবে না’ । বান্ধবী আরো বলেছিল, ‘তেলের দাম বাড়লে দু চামচের জায়গায় এক চামচ দাও । তেল কোনো ভালো জিনিস নয়। কম খেলে বরং শরীরেরই উপকার। আদার দাম বাড়লে আদা খাওয়া ছাড়ো, কথা পরিষ্কার’। সে কথাটা পরিষ্কার করেই বলেছিল সন্দেহ  নেই। তার কথার যুক্তি আছে সে ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে ছাড় শুধু সাধারণ মানুষই কেন দেবে। কেন নিত্যভোগ্য জিনিসের দাম বাড়বে আর বিলাসিতা করার জিনিসের দাম কমবে? আমি বলছি না এ বাজেটে বাড়বে বা কমবে। এটা একটা সাধারণ কথা। যাদের ক্রয়ক্ষমতা আছে তাদের বেলায় জিনিসপত্রের দাম বাড়া কমায় কিছু আসে যায় না। কিন্তু গরিবের আসে যায়। তাই যে কোনো বাজেট হওয়া দরকার গরিব বান্ধব, দুঃস্থবান্ধব, অবসরভোগী আর পেনশনারবান্ধব বাজেট। এই তো দিন কয়েক আগে ধানের দাম নিয়ে কৃষকদের কী দুরবস্থা আমরা দেখলাম। কৃষক না বাঁচলে দেশ বাঁচবে কী করে! গার্মেন্টস শিল্প, রেমিটেন্স, তথ্যপ্রযুক্তি এসব তো সাম্প্রতিক বিষয়। এ  দেশটা তো কৃষিনির্ভর। আর ইন্ডাস্ট্রি অধিকাংশই কৃষিভিত্তিক। ওদের মেরে ফেললে আমরা দেশ বাঁচাবো কী করে!

ফেসবুকে দেখলাম সঞ্চয়পত্রের উৎসে যে কর কাটা হয় সেটা নাকী বাড়িয়ে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে! এমনিতেই তো অনেক টাকা কাটা হয়। এদেশে অসংখ্য ঋণখেলাপী বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওদের খেলাপী ঋণের সামান্য অংশ উসুল করতে পারলেও তো কোটি কোটি পেনশনারের সঞ্চয়পত্রে হাত পড়ে না। বাজেটের সময় এলেই এদেশের নিম্ন বেতনভোগীরা আতঙ্কে থাকে,  এবার বুঝি সঞ্চয়পত্রের ইন্টারেস্ট কমিয়ে দেবে, উৎসে কর বুঝি বেশি কাটবে! তারা এক দুটাকা করে জমিয়ে একশ বানায়, একশ একশ করে জমিয়ে এক হাজার বানায় , এভাবে তারা একলাখ টাকা বানায়। তারপর একটা সঞ্চয়পত্র কেনে। তারপর সেই সঞ্চয়পত্রের ইন্টারেস্ট জমিয়ে আরেকটা কেনে। এভাবেই জীবন সায়াহ্নে সামান্য কিছু সেভিংস তাদের হয়। সেই সেভিংস ভাঙিয়ে তারা মেয়ের বিয়ে দেয়, ছেলেকে পড়ায়, সারা মাসের ওষুধ আর বাজার সদাই কেনে। পেনশনারদেরও একই চিত্র। তাহলে এই সম্বলহীন মানুষগুলির সামান্য টাকায় টান দেবার তো কোন প্রয়োজন নেই।
গাড়ি, কসমেটিকস, এসি এসব বিলাসদ্রব্যের দাম দু চার হাজার বাড়লে বড়লোকের কিছু আসে যায় না। সিগারেটের দাম বাড়লে দেশের কিছু লোকের ফুসফুস রক্ষা পায়। কিন্তু ওষুধের দাম বাড়লে বিনা চিকিৎসায় মানুষ মারা যায়। এসব বিষয় গুরুত্ব সহকারে ভাবা প্রয়োজন।

 এবারের বাজেটের আকার ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। জানা গেছে, সেবা খাত বিশেষত কৃষি, পর্যটন ও আবাসন খাতের উন্নয়নের উপর জোর দেয়া হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা, বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৪৪ লাখ, বিধাব ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ১৭ লাখ, ভাতাপ্রাপ্ত অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ লাখ ৪৫ হাজার, দরিদ্র মায়ের মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ৭ লাখ ৭০ হাজার করার প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। দেশের তরুণ সমাজকে উদ্যোক্তায় পরিণত করার জন্য ১০ কোটি টাকা স্টার্টআপ তহবিল সৃষ্টি করার কথাও রয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে।  ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। নতুন নতুন ধানের গুদাম নির্মাণ করা হবে। ৪ লাখ মেট্রিক টন ধান কেনা হবে এমন প্রস্তাবনাও বাজেটে রয়েছে। গ্রামকে শহরের মতো উন্নত করা হবে। ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ প্রকল্পের মাধ্যমে গ্রামে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। সেখানে ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সবরকম সুবিধা দেয়া হবে।

এবারের বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপীদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের কথা বলা হয়েছে। ঋণখেলাপী যারা তারা যে ‘অনিচ্ছাকৃত খেলাপী’ এটা প্রমাণ করা কি তাদের জন্য কঠিন নয়। কাজেই খেলাপি ঋণ আদায় কতটা হবে সেটা সত্যিই চিন্তার বিষয়। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা বাড়ানো ভালো। তারা দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। কিন্তু তার আগে তো দরকার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে ছাটাই করা। ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়ানো শুভ লক্ষণ, কিন্তু ভাতা যেন ঠিকমতো তাদের হাতে পৌঁছায় সেটা মনিটরিং করা সবচেয়ে জরুরি। একথা ঠিক, ১৬ কোটি মানুষকে চাকুরি দেয়া সম্ভব না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাটাই জরুরি। উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে পারলে তারাই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারবে। এবারও নতুন নতুন রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। তবে বছরব্যাপী খোঁড়াখুঁড়িটা বন্ধ হওয়া দরকার। 

বাজেট নিয়ে আমাদের একটাই প্রত্যাশা, বাজেট যেন হয় জন কল্যাণমুখী, জনবান্ধব। বাজেট যেন কারো হতাশ্বাসের কারণ না হয়, কারণ না হয় নিদ্রাহীনতার। 

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর
 

Best Electronics
Best Electronics