Alexa বাঙ্কেরাম থেকে প্রফেসর জিয়াউর রহমান আজমি হয়ে উঠার গল্প 

ঈমানজাগানিয়া সাক্ষাৎকার

বাঙ্কেরাম থেকে প্রফেসর জিয়াউর রহমান আজমি হয়ে উঠার গল্প 

পর্ব-১

জাকের আজমি নদবি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৭:২৫ ১১ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৯:২৫ ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

ইসলামের সত্যতা যখন একজন কৃষ্ণকালো হাবশি ক্রীতদাস বেলালেরর অন্তরে নিবাসিত হয় তখন সেই বেলাল বনে যান সম্ভ্রান্ত আরবদের কাছে সাইয়েদুনা বিলাল আমাদের নেতা বেলাল। 

পারস্যের অগ্নিপূজারী সালমানের জীবনে যখন প্রস্ফুটিত হয় ইসলামের সৌন্দর্য তখন তার পরিচয় হয় আহলে বাইতের মহান সদস্য হিসেবে। এর কারণ হলো, একদিকে ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথিবীবাসীর সামনে তাঁর জীবনের রঙে রাঙিয়ে তুলেছিলেন ইসলামি সাম্যের রোগ। অন্যদিকে বিদায় হজের ভাষণে তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘কোনো আরব কোনো অনারবের চাইতে শ্রেষ্ঠ নয়। কোনো আজমি শ্রেষ্ঠ নয় কোনো আরবের চাইতে। কোনো সাদা কোনো কালোর চাইতে উত্তম নয়। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি তাকওয়া’। মানবতার পৃথিবীতে বংশ, বর্ণ, জাতপাত এবং কৃত্রিম বিভাজনের সকল সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন তিনি। 

যারা ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন, আমরা যাদেরকে নও মুসলিম বলি আমাদের ইতিহাসে তাদের ঘটনাবলির অভাব নেই। সত্য সন্ধানে তাদের সাধনার আলো বরাবর জন্ম দিয়ে চলেছে অবাক করা বিচিত্র ইতিহাস। এর ভেতর দিয়েও এমন কিছু ভাগ্যবান শুভপ্রাণ ব্যক্তির উদয় ঘটেছে ইসলামের ইতিহাসে যারা তাদের ব্যক্তিগত জীবন সৌন্দর্যের দ্বারা এমন ইতিহাস রচনা করে গেছেন যা দেখে আমাদের মতো জন্মগত মুসলমানগণ ঈর্ষাকাতর না হয়ে পারেন না। the road mokkah- এর রচয়িতা বিংশ শতাব্দীর আলোচিত মনীষী ইহুদি বংশোদ্ভূত পণ্ডিত আল্লামা মুহাম্মদ আসাদ এর কথাই বলি কিংবা বলি ইহুদি ঘরানার আমেরিকান নও মুসলিম মারিয়াম জামিলার কথা তারা তাদের অবদানের দ্বারা আমাদের যুব সম্প্রদায়কে প্রচন্ডভাবে নাড়া দিয়েছেন। ইসলামি শিক্ষা ও সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরবার জন্যে বিলিয়ে দিয়েছেন পুরো জীবন। পৃথিবীর সামনে পেশ করেছেন western civilization condemns Itself এর মতো গবেষণাকর্ম। ইসলামের বিরুদ্ধে কথিত প্রাচ্যবিদদের প্রোপাগান্ডাকে রুখে দিয়েছেন। বাধ্য করেছেন নিজমুখী হয়ে নিজেদের ইতিহাস তালাশ করতে। ভাগ্যবান এই সোনালি ধারার এক মহান ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. জিয়াউর রহমান আজমি। আজ আমরা তার সম্পর্কেই কিছু বলতে চাচ্ছি।

ষোল সতের বছর বয়সে তিনি হাকিম মুহাম্মদ আইয়ুব নদবি রহ. এর আচরণ ও কর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ঝুঁকেছিলেন ইসলামের দিকে। মনীষাপ্রসবিনী বিখ্যাত অঞ্চল আজমগড়ে তার জন্ম। আজমগড় যে মাটি জন্ম দিয়েছে শিবলি, ফারাহি, মুহাদ্দিসে কাবির, হাবিবুর রহমান আজমি এবং আর রাহিকুল মাখতুম এর লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরীর মতো ব্যক্তিকে। মহান সম্ভ্রান্ত ইতিহাস আলোকরা এই মনীষীদেরই একজন প্রফেসর জিয়াউর রহমান আজমি। 

গত সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমার মদিনা সফর হয়েছিল। আমি যখন এমফিল করি তখন ‘দিরাসাত ফিল ইয়াহুদিয়্যাতি ওয়াল মাসিয়্যিতি ওয়া আদইয়ানিল হিন্দ’ গ্রন্থটি বেশ মনোযোগ সহকারে পড়ি। আমার থিসিস রচনায় ওই গ্রন্থ থেকে পর্যাপ্ত উপকরণ সংগ্রহ করি। তখন থেকেই মূলত এর লেখকের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের একটা বাসনা আমার অন্তরে বাসা বাঁধতে থাকে। সৌদি আরব যাওয়ার পর বন্ধু আম্মার আজমাল এসলাহিকে বিষয়টি অবগত করি। আমি তার প্রতি অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞ তিনি এই মহান ব্যক্তির সঙ্গে আমাকে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। 

প্রফেসর জিয়াউর রহমান আজমির সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয়। জানতে চাই তিনি কীভাবে মুসলমান হলেন? প্রফেসর সাহেব ইসলাম গ্রহণের সুদীর্ঘ ইতিহাস অতি সংক্ষেপে আমাদের সামনে তুলে ধরেন। এবার শুনুন সরাসরি তার ভাষায়-

১৯৫৫ সাল। আমার বয়স তখন হয়তো ১৫ বছর হবে। আমি গ্রীষ্মের ছুটি কাটাতে গিয়েছি বলরিয়া গঞ্জে। ওইখানে আমার বন্ধু মাস্টার জুনাইদ সাহেব থাকতেন। আমরা তখন আজমগড় শিবলি কলেজে পড়ি। একদিন বন্ধু জুনাইদ বললেন, চলো! হেকিম আইয়ুব সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আসি। আমি ভাবলাম হেকিম সাহেব ব্যস্ত থাকবেন রোগী নিয়ে। আমরা কেন অযথা দেখা করে তাকে কষ্ট দিতে যাব। কিন্তু আমার বন্ধু জুনাইদ নাছোড়বান্দা। আমাকে পীড়াপীড়ি করে তার দাওয়াখানায় নিয়েই ছাড়লেন।

আমি এর আগেও হেকিম সাহেবকে দেখেছি। কিন্তু আজ তাকে প্রথম সাক্ষাতেই একেবারেই অন্যরকম মনে হলো। দেখতে যেমন অসাধারণ, আচরণও অনন্য। দাঁড়ি পূর্ণ, নূরানি চেহারা, অন্তরে রক্ষিত স্নেহ মমতা যেন তার আচরণে এসে আছড়ে পড়ছে। দেখা মাত্র পরিচয়হীনতার ভীতি কর্পুরের মতো উড়ে গেল। জুনাইদ আমার পরিচয় দিলেন, তারপর হেকিম সাহেবকে বললেন আমার এ বন্ধুকে পড়ার জন্য হিন্দি কোনো বই দিন। গ্রীষ্মের পুরো ছুটি সে বলরিয়া গঞ্জেই কাটাবে।

কার জানা আছে জীবনের কোন মুহূর্তে এসে আকাশের অধিপতি তার সামনে রহমতের দরজা খুলে দেবেন। হেকিম সাহেবের সঙ্গে ওই প্রথম সাক্ষাতের প্রভাব এখনো আমার অন্তরে সবুজ। আমানত মনে করে পরম যতনে ধরে রেখেছি ওই স্মৃতি। 

তোমার প্রথম দৃষ্টি আহা সেকী শানিত ছিল আজো অন্তরে তার ঘা অনুভব করি একান্তে। তার কথার মাধুর্য এবং কমনীয় ভঙ্গি যেন আমার রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে প্রতি মুহূর্তে। ভালোবাসা বুঝবার আগে ডাক এল তার ভালোবাসার হৃদয়খানা শূন্য পেয়ে বসলো জেঁকে সমারোহে।

হাকিম সাহেব তখন আমার হাতে হিন্দি ভাষায় লেখা ‘সত্য ধর্ম’ একটি বই তুলে দেন। ওই বইয়ের কাছে তখন পুরো পৃথিবীটা, পৃথিবীর সমুদয় সম্পদ অতিশয় তুচ্ছ মনে হতে থাকে। আমি এমনিতেই ছিলাম বইপোঁকা ধরনের মানুষ। এই বই হাতে পাওয়ার পর আমি পরম আগ্রহে পড়তে থাকি। এই পাঠ আমার হৃদয়জগৎ বদলে দেয়। আমার কাছে মনে হতে থাকে আমি যেন এতদিন পর্যন্ত এক ভয়ঙ্কর অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলাম। বইয়ের একেকটি পাতা পড়ছি আর অন্ধকারের একেকটি ভাঁজ খুলে যাচ্ছে। জীবনে এই প্রথম যেন আমি চোখের সামনে আলো দেখতে পাচ্ছি। এই বই পড়ার পর এই আলোকরশ্মিকে ধরবার জন্যে আমার ভেতর এক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। আমি বইটি কয়েকবার পড়ি। যতই পড়ি আমার আগ্রহের উষ্ণতা ততই বাড়তে থাকে। আমি সিদ্ধান্ত নিই এই লেখকের হিন্দিতে অনূদিত সব বই সংগ্রহ করে পড়ব। 

আমি হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে এর আগে যথারীতি কোনো তালিম নিইনি। তবে আমার জন্ম একটি বনেদি হিন্দু পরিবারে। আমার পরিবার কঠোরভাবে ধর্ম মেনে চলে। ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে হিন্দু ধর্মের বিশ্বাসাবলি এবং পালিত রেওয়াজগুলো সম্পর্কে আমি ভালোই অবগত ছিলাম। বলব প্রভাবিতও ছিলাম। বরং বললে ভালো হয় আমার অন্তরে হিন্দু ধর্মের প্রতি শক্ত সাম্প্রদায়িক বোধ বপিত ছিল। হিন্দু ধর্ম ছাড়া পৃথিবীর অন্যকোনো ধর্মকে আমি সত্য মনে করতাম না। যখন আমি ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পড়া শুরু করলাম তখন ইসলামের এই দাবি আমার সামনে এসে দাঁড়াল ‘আল্লাহ তায়ালার কাছে ইসলামই একমাত্র ধর্ম’। এর মানে হচ্ছে ইসলামই একমাত্র সত্য ধর্ম। 

আমি এই ঘটনার পর পুনরায় হিন্দু ধর্ম সম্পর্কে মনোযোগী হই। এই উদ্দেশ্যে আমি কলেজে সংস্কৃতির লেকচারারের শরণাপন্ন হই। তিনি গীতা এবং বেদ গ্রন্থের মানিত পণ্ডিত। তার সঙ্গে এ বিষয়ে দিনের পর দিন আমার কথা হতে থাকে। কিন্তু তিনি আমাকে যুক্তিতর্কে সন্তুষ্ট করতে পারেননি। সত্য কথা কী, দেবদেবি কেন্দ্রিক হিন্দু ধর্মের আকিদা বিশ্বাস এবং অবোধগম্য রীতিনীতি কোনো সচেতন মানুষকে সন্তুষ্ট করবার মতো নয়ও। এ কারণেই হিন্দু ধর্মের যুবক শ্রেণি দেবদেবি কেন্দ্রিক কল্পনা প্রসূত চিন্তা বিশ্বাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত নয়। বরং তাদের অন্তরজুড়ে আছে কঠিন অস্বস্তি ও অস্থিরতা। আমি মনে করি যদি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় এবং তাদের চিন্তা ও বোধের উপযোগী করে লিটারেচার পরিবেশন করা হয় তাহলে তারা সহজেই ইসলাম ধর্মকে কবুল করে নেবে। এটা আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

এই সময়ে আমি খাজা হাসান নেজামিকৃত হিন্দি কোরআন তরজমা পাঠ করি। আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ বলব আমাদের শিবলি কলেজে একজন মুসলিম অধ্যাপক ছিলেন। সাইয়েদ মওদুদি সাহেবের চিন্তাধারায় তিনি প্রভাবিত ছিলেন। তার এখানে সাপ্তাহিক কোরআনের দরস হত। ইসলামের প্রতি আমার আগ্রহ দেখে আমাকে তিনি তার কোরআনের দরসে বসার অনুমতি দেন। তারপর আমি মওদুদি সাহেবের বইপত্রও পড়তে থাকি। নিয়মিত বসতে থাকি কোরআনের দরসে। ফলে ইসলামের প্রতি আমার আগ্রহ ক্রমাগত বাড়তে থাকে। তারপরও বিভিন্ন শঙ্কা ও কল্পনা আমার এই আত্মিক উন্নতির পথে বারবার এসে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রচন্ড গতিতে চলতে গিয়েও আমি বারবার থেমে গেছি। যে প্রশ্নে এসে আমি বারবার দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছি; তাহলো আমি যদি মুসলমান হই আমার পরিবারের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তখন কেমন হবে? বিশেষ করে আমার ছোট বোনদের ভবিষ্যৎ চিন্তা আমাকে বেশ ভাবিয়ে তুলল। 

কিন্তু এই সময়ে ছোট্ট একটি ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনা আমাকে পরিণতির সকল বাধা পরাজিত করে ইসলাম কবুল করতে বাধ্য করে। একদিন আমি ওই প্রফেসরের সামনে কোরআনের দরসে বসা ছিলাম। সূরা আনকাবুতের পাঠদান চলছিল। তিনি সূরাটির এক চল্লিশ সংখ্যক আয়াতটি পাঠ করেন। তাতে বলা হয়েছে ‘যারা আল্লাহকে ছেড়ে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তাদের উপমা হলো মাকড়সার মতো। মাকড়সা ঘর বানিয়েছে আর সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর যদি তারা জানত।’ চলবে...

ভাষান্তর: মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

সংগ্রহ: মাওলানা ওমর ফারুক

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএজে