Alexa বাঙালির ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’

বাঙালির ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’

প্রকাশিত: ১৬:৪৫ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৬:৪৬ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯

কবি হিসেবেই পরিচিতি অমিত গোস্বামীর। তবে উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিশ্লেষণধর্মী লেখায়ও বেশ সুনাম রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের এই লেখকের। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম, বাস, বেড়ে ওঠা সবই ভারতে। তবে বাংলাদেশের প্রতি রয়েছে বিশেষ টান। বাংলাদেশের শহীদ বুদ্ধিজীবী আলতাফ মাহমুদকে নিয়ে উপন্যাস লিখে এরইমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।

বাঙালির ইংরেজি বর্ষবরণের ইতিহাসের সূত্রপাত ইংরেজ শাসনের সময় থেকে। ব্রিটিশরা প্রথম কলকাতায় জাঁকিয়ে বসে থাকতে শুরু করল শহরের মধ্যখানে চৌরঙ্গী চত্বরে যাকে কিনা ‘হোয়াইট টাউন’ বলা হত। তখনো ঢাকা নবাবী শহর।

কলকাতার এই চৌরঙ্গী চত্বরে ছিল এলিজা ইম্পের বিলাস বহুল বাগান বাড়ি, যা ডিয়ার পার্ক নামে পরিচিত ছিল। সেই বাড়ি থেকে আজকের পার্ক স্ট্রিটের নামকরণ। নিজেদের মতো করে ব্রিটিশরা  সাজাতে শুরু করল পার্ক স্ট্রিটকে। গড়ে উঠল রেস্তোরাঁ, পানশালা, নাচা-গানার জায়গা। কলকাতায় এই বর্ষবরণের হুল্লোড়কেন্দ্র চিরদিনই পার্ক স্ট্রীট। ক্রিসমাস কী এবং কীভাবে উদযাপিত হয় তা জানার জন্যে তখনো বাঙালি পার্ক স্ট্রীটে ভিড় জমাত। আর এখন তো নিজেদের মৃগয়া ক্ষেত্র।

কলকাতার পার্ক স্ট্রিট মেরে কেটে এক কিলোমিটারের কম এলাকা ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১ জানুয়ারি হয়ে ওঠে উদ্দাম।  এখন শুরু হয়েছে  ‘পার্ক স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল’। বিভিন্ন ব্যান্ড ও গায়কদের সমাহারে পুরো ওপেন টি বায়স্কোপ। পাঁচমিশেলি খাবারের সমাহারের সঙ্গে মিশে যায় জিঙ্গল বেল থেকে কোলাভেরি ডি-র ছন্দ, রবীন্দ্রসঙ্গীত ও ‘বারান্দায় রোদ্দুর’-এর সুর। সন্ধ্যা নামতেই রাজপথের ধারে পুলিশি ঘেরাটোপে জনতার উদ্দাম ‘ফ্ল্যাশ ডান্স’। কেউ আবার সকাল সকাল ইকোপার্ক অথবা চিড়িয়াখা ঘুরে নিয়ে  বিকেল থেকে পার্কস্ট্রিটেই হাজির হয়ে যান। আর সন্ধে থেকেই পার্কস্ট্রিটে যেন আলোর ঝরনা  ঝরে। রাস্তায় জনস্রোত। কখনো থমকে সেলফি তোলা কখনো বা গ্রুপ-ফি তে থমকে যায় ভিড়। ছোট্ট ছোট্ট পায়ে মা–বাবার সঙ্গে শিশুরাও হাজির পার্কস্ট্রিটে। এতো আলো দেখে মুগ্ধ কচি চোখ। অ্যালেন পার্কে বড়দিনের উৎসবে একের পর এক গান গেয়ে চলে ব্যান্ড। সঙ্গে রকমারি খাবার দাবারের পসরা। বেলুন, স্যান্টা টুপি, ক্যান্ডি, থেকে শুরু করে মজাদার সব বাঁশির পসরা রয়েছে সারি সারি। কেউ কিনছেন। কেউ আবার ঘুরে ফিরে দেখে চলে যাচ্ছেন। ওদিকে ফ্লুরিসের পাশে দলবেঁধে সেলফিতে মগ্ন সদ্য কলেজের গণ্ডিতে পা রাখা তরুণ তুর্কির দল। বোঝাই যাচ্ছে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার স্বাধীনতা প্রাণভরে উপভোগ করছে ওরা। অ্যালেন পার্ক থেকে একটু এগিয়ে গেলেই রয়েছে অ্যাসেম্বলি অব গড চার্চ। সেখানে জোর কদমে চলছে মিড নাইট মাসের প্রস্তুতি। মিড নাইট মাসের জন্য রাত ১১টায় দরজা খুলবে।

বর্ষবরণের রাতে পার্ক স্ট্রিটে আসা মানুষদের হাঁটতে হয় পুলিশের ছকে দেয়া রুট ধরেই। শ্লীলতাহানি, পকেটমারি মতো বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এই ব্যবস্থা। পার্ক স্ট্রিটে খাবারের জায়গা বললে একেবারে প্রথম যে নামটা আসবে তা হল ট্রিঙ্কাস। ১৯৪০ এর দশক নাগাদ ট্রিঙ্কাস তৈরি হয়। মিস্টার ট্রিঙ্কা নামক একজন সুইস ভদ্রলোক স্থাপন করেছিলেন ট্রিঙ্কাস। আসল উদ্দেশ্য ছিল স্বদেশীয় ফ্লুরিজকে টক্কর দেয়া। ‘তখন ট্রিঙ্কাস ছিল নেহাতই টি-রুম। তারপরে ১৯৫৯ সাল নাগাদ এই জায়গাটা কিনলেন ওমপ্রকাশ পুরি আর এলিস জোসুয়া। ১৯৫৯ সাল থেকেই ট্রিঙ্কাস তার চরিত্র বদলাতে শুরু করল। তখন একটা নিজস্ব বেকারি ছিল, যেটা ১৯৮০ সালে বন্ধ করা হয়। তখন থেকে শুধু বার আর রেস্তোরাঁ চলতে থাকে। তখন থেকেই এখানকার সব থেকে বড় আর্কষণ লাইভ মিউজিক। অবশ্য সেই সময় এই চত্বরে বেশ নামকরা রেস্তোরাঁ ছিল যেখানে লাইভ মিউজিক হোত। মোলারুজ, ব্লু-ফক্স, মোকাম্বো ইত্যাদি রেস্তোরাঁতেও গান হোত। আর এখন শুধু এখানেই একমাত্র লাইভ পারফরমেন্স হয়। এটা কখনো বন্ধ হয়নি। কিন্তু একটা সময় এসেছিল যখন সরকার থেকে ৩০ শতাংশ কর ধার্য করেছিল, তখনো লাইভ মিউজিক বন্ধ হয়নি। তখনই আস্তে আস্তে বাকি সব জায়গায় এই গান বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ট্রিঙ্কাস এখনও চালিয়ে যাচ্ছে, একদিনের জন্যও গান এখানে বন্ধ হয়েনি। প্রথমে দেশিয় গান চলে আর তারপর শুরু হয় ওয়েস্টার্ন মিউজিক। আগে এখানে গাইতেন ঊষা আয়ার, পরবর্তী সময়ের ঊষা উত্থুপ। ট্রিঙ্কাস ছেড়ে বেরিয়ে বাঁয়ে পার্ক হোটেল ফেলে এগোতেই পড়বে ম্যুলাঁ রোজ। এখানে সাহেবদের সময়কার একটি খাওয়ার পদ এখনো পাওয়া যায়। চিকেন টেট্রাজিনি। ক্রিম ও চিকেনের এক অদ্ভুত প্রিপারেশন। বাকি সব কিছু গতানুগতিক। ম্যুলা রোজঁ ছেড়ে এগোতেই বাঁয়ে সাবেক অলিম্পিয়া এখন নাম অলিপাব। নাম পালটে গেলেও এদের বিফ স্টেকের উল্লেখ না করলে মদিরা দেবীর কাছে অপরাধী হতেই হবে। স্বাদ একই রকম রেখে রসিকজনের প্রশংসা পাওয়ার রেকর্ড করেছে এই প্রিপারেশন।

বছরের শেষ রাতে পার্ক স্ট্রিটের জনজোয়ারে থাকেন নানা শ্রেণির মানুষ। খাস কলকাতার জেন ওয়াইয়ের ভিড় তো থাকেই, সঙ্গে থাকে প্রথম বার পার্ক স্ট্রিট দেখতে আসা নানা অঞ্চলের মানুষও। জেন ওয়াই ভিড়ে যায় নাইট ক্লাবের দিকে। তবে এই রাতে সেখানে আলাদা ব্যবস্থা। আলাদা টিকেট। আগে কাটতে হয়। মহিলা ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। ঢুকে পড়তে পারলে রাতভর উদ্দামতা। তবে সামলে চলতে হয়। নাহলে বিশালদেহী বাউন্সাররা ধাক্কায় বাইরে বের করে দেবে।  বড়দিনের আগে থেকেই নাইট ক্লাবগুলিতে জমে ওঠে ভিড়। তার উপর আবার শহরের একাধিক পাঁচতারা হোটেলে জমে ওঠে বিদেশি ডান্সারদের নাচ। অনেকেই আবার সারাদিনের কাজকর্ম সেরে একটু দেরি করেই পানাশালায় ঢোকেন। এবারে পাঁচতারা হোটেলের নাইট ক্লাবগুলি ভোর পাঁচটা পর্যন্ত খোলা রাখার ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। আর সেই সুযোগ গ্রহণ করছে শহরের প্রত্যেকটি পাঁচতারা হোটেলের নাইট ক্লাবই। একই সঙ্গে শহরের পানশালাগুলিও রাত তিনটে পর্যন্ত খোলা রাখা যেতে পারে। তবে মদ্যপান করে গাড়ি চালানো চলবে না। নজর। বিভিন্ন জায়গায় ব্রেথ অ্যানালাইজার নিয়ে পুলিশ তৈরি থাকছে। পার্ক স্ট্রিট-সহ যে পাঁচতারা হোটেলগুলির পানশালা ও নাইট ক্লাব ভোর পর্যন্ত খোলা থাকছে, সেগুলির বাইরে থাকছে পুলিশের টিম। প্রয়োজনে গাড়ির চালককে ব্রেথ অ্যানালাইজার দিয়ে পরীক্ষা করা হবে। অতএব সাধু সাবধান।

চলুন এবার ব্রিটিশদের সাবেক রাজধানী থেকে বাঙালির বর্তমান রাজধানী ঢাকায়। ঢাকায় বর্ষবরণ মানেই কিন্তু আমরা বুঝি ১লা বৈশাখ। পান্তাভাত, ইলিশ, রমনা বটমূলে রবীন্দ্র সঙ্গীত, শহর জুড়ে মেলা, রাস্তায় হলুদ বা লাল সাদা সুন্দরী। নাহ, ১ জানুয়ারিতেও তুমুল হুল্লোড় হয় ঢাকাতে। তবে তা বিত্তশালীদের জন্যে। কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের মত সরকারি মোচ্ছব নয়। এখানে মূলত চার দেয়ালের ভেতরে পালিত হয়েছে থার্টি ফার্স্ট নাইট। পাঁচতারা হোটেলে হয় সেখানে প্রচুর পানভোজনের আয়োজন থাকে তবে তা আদৌ পান্তাভাত নয়, সেখানে থাকে ভিনদেশি পানি ও পানীয়৷ ঢাকার ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী আর বারিধারার প্রত্যোকটি দামি হোটেল রেষ্টুরেন্ট সজ্জিত হয় বহুবর্ণিল আলোকমালায়৷ থাকে নাচ গানের উদ্দাম আয়োজন৷ আরো থাকে আতসবাজি ও লেজার শো৷ এই আয়োজনে সামিল হয় সমাজের বিত্তবান তরুণ সমাজ৷ তবে যাদের বিত্ত তেমন নেই কিন্তু চিত্ত বিত্তহীন নয় তারা জড়ো হয় ঢাকায় প্রধানত বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টি.এস.সি চত্বরে এবং বেশ কিছু এলাকায় আয়োজিত কনসার্টে৷ এ সব কনসার্টের আয়োজক বিভিন্ন মোবাইল ফোন কোম্পানি৷ এরা অবশ্য 'ধর্মেও আছে জিরাফেও আছে' কারণ হাল আমলে এরা ১লা বৈশাখেও কনসার্টের আয়োজন করে এবং এতে পয়সা ঢালে৷

আসুন এবার ঢোকা যাক চার দেওয়ালের চৌহদ্দিতে। বিটের তালে কেঁপে উঠছে ফ্লোর, চার দেয়াল। মঞ্চ থেকে আঙুলের জাদু দেখাচ্ছেন ডিজেরা। একের পর এক বাজছে হিন্দি, ইংরেজি গান। বিশাল বলরুমজুড়ে বর্ণিল আলো। লাল, নীল আলো-আবছা আঁধারে ওয়েস্টার্র্ন ড্যান্সে মেতে উঠেছেন তরুণ-তরুণীরা। মিউজিকের তালে তালে অন্তরঙ্গভাবে মিশে যাচ্ছিলেন সমবেত নারী-পুরুষ। যারা শাড়ি পরিহিতা তাদের শাড়িতেও ছিল চমক। হাত-পিঠকাটা ব্লাউজের সঙ্গে পাতলা শাড়ি পরেই সমান তালে নাচ সঙ্গীর সঙ্গে। পার্টিকে আকর্ষণীয় করতে সুন্দরী পার্টি গার্লদের বুকিং করা হয় বহু আগে থেকে। এমনকি চলচ্চিত্রের আইটেম গানের মেয়েরাও বিটের তালে নেচে-গেয়ে মাতান পার্টিতে অংশগ্রহণকারীদের। বরণ করে নেওয়া হয় নতুন বছরকে। দেশের ডিজে কন্যাদের এ সময় ব্যস্ততা বেড়ে যায়। এই পার্টিতে থাকে লাতিন ড্যান্স, ফ্যাশন শো। এছাড়া আছে লঞ্চ পার্টি। সারা রাত লঞ্চে নাচে-গানে মাতিয়ে রাখা হবে। সেইসঙ্গে থাকবে ডিজেরা। পপ ও হিন্দি গানের বিটে কেঁপে উঠবে রাতের আকাশ। লঞ্চে থাকবে খাবার ও পানীয়। এখানেই শেষ না। লঞ্চে একান্তে সময় কাটাতে রয়েছে কেবিনের ব্যবস্থা।

তবে ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে কোন উন্মুক্ত স্থানে বা বাড়ির ছাদে কোন সমাবেশ, গান-বাজনা করা এবং আতশবাজি ফোটানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এই যে ৩১ তারিখ সন্ধ্যা থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত ঢাকা শহরের সকল বার বন্ধ থাকে। বাঙালি এখন ফেসটিভ মুডে। যাঁরা বছরের কোনওদিন পার্টি করেন না ৷ তাঁরাও এখন হয়তো ইন্টারনেট বা কাগজ খুলে দেখছেন কোথায় কী হচ্ছে ৷ ক্লাব, ডিস্কো-থেক গুলো ছাড়াও শহরের প্রায় সর্বত্র ব্যাঙ্কোয়েট হল, শপিং মল, অ্যামিউজমেন্ট পার্কগুলিও পার্টি আয়োজনে এখন একে অপরকে টেক্কা দিচ্ছে ৷ রাস্তায় পার্টির হোর্ডিং পড়তে না পড়তেই অনলাইনে সেগুলোর বুকিংও অনেকদিন আগেই সেরে ফেলেছেন পার্টি হপার্সরা ৷

ঘড়িতে যখন ১১টা ৫৫ মিনিট আচমকাই শান্ত হয়ে যায় গোটা বাঙলা। মাত্র ৫ মিনিট! তার  পরেই উচ্ছ্বাস, আতসবাজি ও ভুভুজেলার শব্দে তাল কাটে নীরবতার। পার্ক স্ট্রিটের আকাশ-বাতাসে তখন একটাই সুর, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’। রাত বাড়ে। উত্তেজনার পারদ কিছুটা পড়লেও কমে না উন্মাদনা। মত্ত অবস্থায় পার্টি থেকে বেরিয়ে নামী হোটেলের সামনে ফুটপাথেই শুয়ে পড়েন এক যুবক। বন্ধুকে সেখানে ঘুমোতে দেখে তাঁর পাশেই শুয়ে পড়েন আরও এক জন। এই দৃশ্য দেখে সেই দলের তৃতীয় ব্যক্তিও রাতের মতো ঠিকানা খুঁজে নিলেন বন্ধুদের সঙ্গে ফুটপাথের ধারে। এই কাণ্ড খেয়াল করেই তাদের টেনে তুলতে দৌড়ে গেল পুলিশ। তত ক্ষণে তিন যুবকই নিদ্রা গিয়েছেন। অনেক ডেকেও ঘুম ভাঙানো যায়নি কারো। শুধু একজন জড়ানো কণ্ঠে বলেছে – হ্যাপ্পি নিউ ইয়ার। আসছে বছর আবার হবে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর