Alexa আতঙ্কের নাম ‘জাবের বাহিনী’

আতঙ্কের নাম ‘জাবের বাহিনী’

রাজশাহী প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১০:০৮ ২১ জানুয়ারি ২০২০   আপডেট: ১০:০৯ ২১ জানুয়ারি ২০২০

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

চরমপন্থী আর জঙ্গিবাদ উত্থানের আতুরঘর হিসেবে পরিচিত ছিল রাজশাহীর বাগমারা। কিন্তু সে গল্প পাল্টে যায় ২০০৮ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর। 

এক সময়ের রক্তাক্ত জনপদ নামে খ্যাত বাগমারা প্রতিষ্ঠা পায় শান্তির এলাকা হিসেবে। সেই শান্তির বাগমারায় এবার গড়ে উঠেছে ‘জাবের বাহিনী’। 

প্রায় বছর খানেক আগে গড়ে উঠা ওই জাবের বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ উপজেলার বাসুপাড়া ইউপির অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ। অব্যাহত চাঁদাবাজি, হুমকি-ধামকি ও নির্যাতনের কারণে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহসও পাচ্ছে না তারা।

‘জাবের বাহিনী’র অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদ করে ৩ ডিসেম্বর হামলার শিকার হন বীরকয়া গ্রামের মোবারক হোসেন। তিনি বর্তমানে পঙ্গুত্ব জীবন-যাপন করছেন। এর সপ্তাহ খানেক আগে একই গ্রামের মোবারক হোসেনের স্ত্রী আঞ্জুরী বেগমের ওপর হামলা করে জাবের বাহিনী। ওই হামলার সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে ঘুমন্ত আঞ্জুরীর স্তন কেটে দেয়া হয়।

আঞ্জুরী বেগম বলেন, প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়ার সময় তাকে ‘জাবের বাহিনী’র প্রধান জাবের আলীকে নিয়ে ভয় দেখানো হয়। এ সময় জাবের আলীকে নিয়ে গালিগালি করি। এর জের ধরে পরের দিন ভোরে তার বাড়িতে হামলা হয়। তার স্বামী পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করে। কিন্তু তাকে ব্যাপক নির্যাতন করা হয়। 

এক পর্যায়ে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ডান পাশের স্তন কেটে দেয়। এ ব্যাপারে মামলা করলে মেরে ফেলার হুমকি দেয় জাবের আলী। এ কারণে মামলা করার সাহস পায়নি বলে জানান এই নির্যাতিত নারী।

জাবের বাহিনীর নির্যাতনের শিকার মোবারক হোসেন বলেন, তার মায়ের কুলখানি ছিল ৫ ডিসেম্বর। গত ৩ ডিসেম্বর মায়ের কুলখানির অনুষ্ঠানের বাজার করার জন্য বটতলা বাজারে যাচ্ছিলাম। এ সময় জাবের বাহিনীর লোকজন তাকে তুলে নিয়ে যায় মন্দিয়াল গ্রামে। সেখানে জাবেরসহ তার বাহিনীর লোকজন নির্যাতন করে তার পা ভেঙ্গে দেয়। পরে তারা ভ্যানে করে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে পাঠায়। 

মোবারক হোসেন আরো বলেন, এ ঘটনায় স্ত্রী নাজমা বিবি বাদি হয়ে জাবের বাহিনীর প্রধান জাবের আলীসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। 

মামলা করার জন্য জাবের বাহিনীর লোকজন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। পরে বাধ্য হয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে গিয়ে একটি ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে গোপনে চিকিৎসা গ্রহণ করি। কিন্তু এখন পর্যন্ত জাবের বাহিনীর ভয়ে আর এলাকায় যেতে পারিনি।

জাবের বাহিনীর নির্যাতনের শিকার কুতুবপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেন বলেন, জাবের বাহিনী তাকে জ্যোতিনগঞ্জ বাজারে অমানুষিক নির্যাতন করে পা ভেঙ্গে দেয়। কিন্তু ভয়ে তিনি মামলা করতে পারেনি। শনিবার রাতেও জাবের বাহিনীর লোক পরিচয় দিয়ে একজন মোবাইল ফোনে হুমকি দেয়। তাকেসহ এলাকার লোকজনকে নির্যাতন করার বিষয়ে মুখ খুললে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয় বলে জানান তিনি।

কে এই জাবের আলী?

জাবের বাহিনীর প্রধান জাবের আলীর বাড়ি উপজেলার বাসুপাড়া ইউপির মন্দিয়াল গ্রামে। তার বাবার নাম বুদাই গাইন। জাবের আলী এ সময় স্থানীয় ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমানের দোকানের কর্মচারি ছিলেন। পরে তিনি জাল টাকা ও শুটকি মাছের ব্যবসা করে বেশ কিছু অর্থ-সম্পদের মালিক হন। 

এর পর তিনি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলে বিল ও পুকুর দখল করে কয়েক বছরের মধ্যে কোটি টাকার মালিক বনে যান। তার বিরুদ্ধে বর্তমানে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। যার মধ্যে চারটি মামলা বিচারাধীন। পালাতক থাকলেও মাঝে মধ্যে রাতে বাহিনী নিয়ে এলাকায় প্রবেশ করে জাবের আলী।
 
১৯ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ উপজেলার জ্যোতিনগঞ্জ বাজার থেকে জাবের আলীকে গ্রেফতার করে। এ সময় তার বাহিনীর লোকজন পুলিশের উপর হামলা করে হ্যান্ডকাপসহ জাবের আলীকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশের দুই কর্মকর্তাও আহত হন।

স্থানীয়রা জানান, রাতে জাবের আলীকে গ্রেফতারে বাগমারা থানার একজন পরিদর্শক ও একজন সহকারী উপ-পরিদর্শককে নিয়ে উপজেলার জ্যোতিগঞ্জ বাজারে যান। রাত সাড়ে আটটার দিকে পুলিশ সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করে। 

জাবেরকে মোটরসাইকেলে করে থানায় নেয়ার প্রস্তুতিকালে তার সহযোগীরা পুলিশকে ঘিরে ধরেন। তাকে ছেড়ে দিতে পুলিশের প্রতি চাপ প্রয়োগ করেন তার সহযোগীরা। একপর্যায়ে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে হামলা করে পুলিশের কাছ থেকে জাবের আলীকে ছিনিয়ে নেন। 

এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের ধস্তাধস্তিতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা থানার এসআই সৌরভ কুমার চন্দ ও তার সঙ্গে থাকা এএসআই মোশলেম আলী আহত হন। পরে তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।

বাসুপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান বলেন, পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া জাবের আলী এলাকার ত্রাস। বিভিন্ন ঘটনায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। 

পালাতক থাকলেও রাতে বাহিনী নিয়ে গিয়ে গ্রামে গামে ত্রাস সৃষ্টি করে। জাবের বাহিনীর অত্যাচারে অনেকেই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে আছেন। কিন্তু এ বাহিনীর বিরুদ্ধে আইনশৃংখলা বাহিনীর ভূমিকা রহস্যজনক বলে দাবি করেন এই জনপ্রতিনিধি।

বাগমারা থানার এসআই সৌরভ কুমার চন্দ বলেন, জাবের আলী একাধিক মামলার আসামি। পাশের বীরকয়া গ্রামের মোবারক হোসেনকে নির্যাতন করার অভিযোগে তার স্ত্রী নাজমা বিবি মামলা করেছেন। সে মামলার তদন্তে গিয়ে জাবের আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু তার সহযোগিরা তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। জাবের আলী পলাতক থেকে লোকজনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে। 

বাগমারা থানার ওসি আতাউর রহমান বলেন, পলাতক আসামি জাবের আলীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। পুলিশ তাকে ধরতে কাজ করছে। কিন্তু প্রতিদিন স্থান পরিবর্তন করায় গ্রেফতারে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

ডেইলি বাংলাদেশ/এমকে