বাকরুদ্ধ বোনের ঘাড়ে মাথা রেখে বাবা-মা’কে খুঁজছে তারা

বাকরুদ্ধ বোনের ঘাড়ে মাথা রেখে বাবা-মা’কে খুঁজছে তারা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:২২ ১০ আগস্ট ২০২০  

তিন ভাই-বোন (ছবি: সংগৃহীত)

তিন ভাই-বোন (ছবি: সংগৃহীত)

তারা মোট তিন ভাই-বোন। শুভা তন্ত্রবাই, দেবা তন্ত্রবাই ও বেবি তন্ত্রবাই। ১৪ বছরের কিশোরী শুভা তন্ত্রবাই বাবা-মাকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে সে। একটি নির্মম দুর্ঘটনার দুইদিন পার হয়েছে। রাতের পর আরেক আলোকিত দিন এসেছে কিন্তু তাদের বাবা-মা আর নেই।

কি হয়েছে আর কি হবে সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই শুভার। নির্বাক চোখে-আশপাশের মানুষগুলোর মুখের দিকেই চেয়ে আছে; ছোট ভাই-বোন দু’টিকে আদরে আগলে রেখেছে সে। আর দুই বছরের দেবা তন্ত্রবাই বোনের ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুম চোখে বার বার মাকে খুঁজে ফিরছে। বাবা-মা যে আজ আর নেই! এ কথাগুলো কে বুঝাবে এই অবুঝ শিশুদের।

শুভা নিজেই এখনো বুঝে উঠতে পারছে না বাবা-মার নির্মম এ হত্যাকাণ্ড। ছয় বছরের বেবি তন্ত্রবাই তার ছোট বোনের মতো সেও মাকে খোঁজে না পেয়ে-বাবার কাছে যেতে চাচ্ছে বার বার। এ অবস্থায় বড় বোন শুভার এখন কিছুই করার নাই।

সোমবার শুভা তন্ত্রবাই জানান, বাবা-মার মাঝে তো কিছু হতে দেখেনি। শনিবার রাতে (৮ আগস্ট) বাবা-মা সবাই মিলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়ি। এক খাটে শুয়ে ছিল বাবা-মা ও বোন। ছোট বোন দেবা তন্ত্রবাই মাকে আদরে জড়িয়ে ছিলো। আর বাবাকেও দেখলাম প্রতিদিনের মতো এক রকম। সকালে উঠেই দেখি এ অবস্থা।

তবে পুলিশ জানিয়েছে, পারিবারিক কলহের জের ধরেই বিপুল তন্ত্রবাই দা দিয়ে কুপিয়ে তার স্ত্রী অলক তন্ত্রবাইকে গলা কেটে হত্যা করেছে। তবে প্রতিবেশী এবং চা-বাগান পঞ্চায়েত সম্পাদক রঞ্জিত সাঁওতাল বলছেন অন্য কথা।

পঞ্চায়েত এ নেতা জানান, বিপুল ও অলকের ঝগড়া নিয়ে কোনো দিন তো সালিশ করতে হয়নি। এমনকি বিচারও তো কেউ দেয়নি। তাহলে কিভাবে আমরা বলি পারিবারিক কলহের জেরে এ দুটি খুন। একই বক্তব্য সরেজমিনে শ্রীমঙ্গল বৌলাছড়া চা বাগান ঘুরে আসা একাধিক ব্যক্তির ও সংবাদকর্মীদের।

সংবাদকর্মী শিমুল তরফদার কিশোরী শুভার কথা পর্যালোচনা করে বলেন, মাটির ছোট একটি ঘরে দা দিয়ে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যার পর স্বামী নিজে ফাঁস দিলো। অথচ কোনো সাড়াশব্দ পেল না কোনো সন্তান; এটি হতে পারে না। এ বিষয়টি এ সংবাদকর্মীসহ অনেকের কাছেই ধোঁয়াশা লাগছে। তবে এর সত্যতা যাচাই করতে গেলে পাশের কোনো চা-শ্রমিক পরিবারই কথা বলতে রাজি হননি। শুধু তাই না একাধিক শিশু এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে রহস্যজনক কারণে তাতে বাধা আসে।

শ্রীমঙ্গল থানার তদন্ত কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা জানান, মানবিক সহায়তা যেন পায় এ অবুঝ শিশুরা এর জন্য বাগান ব্যবস্থাপকের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। চেষ্টা থাকবে তাদের প্রয়োজনে কিছু করে দেয়ার। তবে বড় মেয়ে শুভা প্রাপ্ত বয়স্ক হলে বাগানে মায়ের স্থলে কাজের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। 

নিহত বিপুল এবং অলক (ছবি: সংগৃহীত)বাচ্চা তিনটি এখন পাশের ঘরে কাকিদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। জানা গেল, রত্না কাকিমা তাদের আদরে আগলে আছেন। সবাই চিন্তিত এ অনাথ বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।

রোববার (৯ আগস্ট) পারিবারিক কলহের জের ধরে স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যার পর স্বামী নিজে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল উপজেলার বৌলাছড়া চা-বাগান বস্তিতে এ ঘটনাটি ঘটে। চা-শ্রমিক দম্পতির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। এ চা-শ্রমিক দম্পতির তিনটি কন্যা-পুত্র সন্তান রয়েছে।

শ্রীমঙ্গল থানার ওসি আব্দুস ছালেক জানান, সকাল ৮টার দিকে বৌলাছড়া চা-বাগান থেকে খবর পাওয়া যায় যে দু’জন চা-শ্রমিক হত্যার ঘটনা ঘটে। এতে শ্রীমঙ্গল থানা-পুলিশ সকালেই বৌলাছড়া চা-বাগান বস্তিতে গিয়ে উপস্থিত হন। এ সময় পুলিশ একটি মাটির ঘরে ঢুকে চা-শ্রমিক বিপুল তন্ত্রবাইকে ঘরের ছাদের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। আর তার স্ত্রীকে গলা কাটা অবস্থায় মাটিতে পড়া থাকা অবস্থায় উদ্ধার করে।

ডেইলি বাংলাদেশ/আরএম