Alexa বাংলা সংস্কৃতিতে নারী

বাংলা সংস্কৃতিতে নারী

প্রকাশিত: ১৭:৫৫ ১৬ এপ্রিল ২০১৯  

শাহনাজ মুন্নী একজন বাংলাদেশি সাংবাদিক, কবি ও লেখক।বর্তমানে তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল নিউজ টুয়েন্টিফোরের প্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। শিশুকল্যাণ বিষয়ে তিনি বিশেষ আগ্রহ সংরক্ষণ করেন। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ছিলেন ২০জন বিশিষ্টজনের একজন যারা ইউনিসেফের শিশু অধিকার কবিতা উৎসবে অবদান রেখেছেন। এই উৎসবের লক্ষ্য ছিল শিশু-অধিকারের প্রতি সামজিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন।লেখক হিসেবে, তিনি একজন কবি, একজন প্রাবন্ধিক এবং ছোটগল্প লেখক। তিনি শিশুদের জন্য লিখে থাকেন।

বাংলাদেশের আপামর গণমানুষের সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, ভোজনরীতি, আচার-ব্যবহার, জীবিকার উপায়, সামাজিক সম্পর্ক, ধর্মীয় রীতি-নীতি, শিক্ষা-দীক্ষা, পোষাক, উৎসব, জীবন ধারা সব মিলিয়েই বঙ্গ সংস্কৃতি একটি ব্যাপক বিষয়। 

স্বাভাবিকভাবেই বঙ্গ-সংস্কৃতিতে নারীর অবদান খুঁজতে গেলে সমাজে নারীর অবস্থান নির্ণয়ের বিষয়টিও সামনে চলে আসে। কারণ অবস্থানের উপরই নির্ভর করে সমাজে তার প্রভাব প্রতিপত্তি ও তার চিন্তা ধারা প্রকাশ ও বিকাশের বিষয়টি। সমাজাদর্শের মূল কথা প্রবল পুরুষের প্রভুত্ব ও দূর্বল নারীর দাসত্ব। সম্পত্তিতে নারীর অধিকার অস্বীকার করে এবং সতিত্ব অর্থাৎ যৌনশুচিতা অসমতার পথ প্রশস্ত করা হয়েছিল। অসতী স্ত্রী বিনা শর্তে বিনা বিচারে পরিতাজ্য, ব্যভিচারী স্বামীর প্রায়শ্চিত্তে নিস্কৃতি, এমনকি স্মৃতিশাস্ত্রে ‘অসতী’ শব্দের কোনো পুংলিঙ্গ নেই। যাগযজ্ঞে পূজা-আর্চায় নারীর করণীয় কিছুই নেই, পতিসেবাই তার পরম ধর্ম, পতি ভিন্ন তার পৃথক সত্তা নেই। শুধু ইহলোকে নয়, পরলোকেও নারী স্বত্তাহীন, পতিœর সতীত্ব ও অবরোধ প্রথাকে এ সময়ই কুলমর্যাদাজ্ঞাপক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

এই তিনটি ধারা যে অবিমিশ্রভাবে সমান্তরাল চলেছে, তা নয়, বরং একটি অন্যটিকে বহুলাংশে প্রভাবিত করেছে। যেমন, সতীত্বের ধারণাটি লৌকিক সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে, নারী স্বাতন্ত্র্যবোধের ধারণাটিও ক্রমশ অপসৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে মধ্যযুগের রচনা ‘বেহুলা-লখীন্দর’ কাহিনীটির উদাহরণ টানা যায়। এই কাহিনীটি মূলত অ-পৌরাণিক ও লৌকিক।  মধ্যযুগেই পঞ্চদশ শতকে শুরু হয় গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন, চৈতন্য দেব প্রচারিত ভক্তিমার্গে প্রথানুযায়ী নারী মাতা বা পত্নীরূপে প্রবেশ না করে নায়িকা রূপে আবির্ভূত হয়। জীবন চর্চায় যেমন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, উৎসব-আনন্দে-সীমিতভাবে হলেও মেয়েরা সেই সময়ে যোগদান করতো। তবে তত্ত¡গত অর্থে নায়িকাভাব গ্রহণ করলেও পতিব্রতা স্ত্রী ও সর্বত্যগিনী মাতাই নারীর আদর্শ। তাছাড়া সতীত্ব, মাতৃত্ব, পতœীত্ব, বিবাহপ্রথা ইত্যাদি ধারণায় বৈষ্ণব ও সনাতন মতের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য ছিল না।

তবে নিম্নবর্গের গ্রামীণ লৌকিক জীবনচর্চায় নারীর ভূমিকা যতটা স্বাধীন, উচ্চবর্গের নগর সমাজে নারীর জীবন ছিল ততটাই অবদমিত ও সঙ্কুচিত। 
মধ্য যুগে এক জন নারী কবির নাম আমরা শুনি যাকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম নারী কবি বলা হয়। তিনি চন্দ্রাবতী। যার জন্ম ১৫৫০ খৃষ্টাব্দে। বা ষোলশ শতকে। তিনি মৈমনসিংহ গীতিকা মলুয়ার রচয়িতা। রচনা করেছিলেন রামায়ণ। নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে রামায়ণ রচনা করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার মূলে প্রথম কুঠারাঘাত করেন তিনি। তার রচনায় প্রাধান্য পায় সীতা চরিত্রটি, সীতা তার কাছে কেবল দেবী নন, বরং মানবী। এরপর আর কোন নারী লেখক বা কবির নাম শোনা যায় না।  আঠারো শতক পর্যন্ত নারীর বিচরণ দেখি সেই প্রথাগত আঙ্গিনাতেই। সেই সময় নারী নিজেকে নিয়োজিত রাখে সন্তানের জন্ম, তার লালন পালন, পতিসেবা ও গৃহকর্মের মধ্যেই। 

উনিশ শতকে প্রথম নারী শিক্ষার উদ্যোগ নেন ইংরেজ ধর্ম ও শিক্ষা প্রচারকেরা। ১৯৪৯ সালে জে.এম.ডি. বেথুন কলকাতায় স্থাপন করেন ভিক্টোরিয়া গার্লস স্কুল, পরে যার নাম হয় বেথুন বালিকা বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ে প্রথম দিককার ছাত্রীরা প্রায় সকলেই ছিলেন সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণির, অথবা ব্রাহ্ম বা দেশি খিস্টান ও হিন্দু স¤প্রদায়ের। যদিও এই নারী শিক্ষা শুরু থেকেই নারীকে আর্থনীতিকভাবে স্বাধীন করা ও তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানোর চেয়ে বিয়ের বাজারে নারীকে সুগৃহিনী হিসাবে আকর্ষণীয় করে তুলতেই বেশি সক্রিয় ছিল। অবশ্য একথা স্বীকার করতেই হবে  যে, নারী শিক্ষা, নারী চেতনায় একটা বিপুল রূপান্তর ঘটিয়েছিল। বেশ কয়েকজন শিক্ষিতা নারী এসব পুরনো সংস্কার ভেঙে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন। তবে বাঙালি মুসলমান নারী শিক্ষার আলো পেয়েছিলো আরো পরে। ১৯১১ সালে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। ১৯২৭ সালে প্রথম বাঙালি মুসলমান মহিলা ফজিলাতুন্নেসা এম. এ. পাশ করেন। এর পূর্বেই ১৮৮৯ সালে কংগ্রেসের বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের পাশাপাশি বাঙালি মেয়েদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে প্রচলিত নারীসূলভ জীবন-যাত্রার বাইরে পা রাখেন। পুরুষ প্রধান সমাজে নারী শিক্ষার প্রসার ও নারী জাতির সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এর মাধ্যমেই নারীর প্রথাগত ভাবমূর্তি পরিবর্তিত হয় এবং নারী ক্রমেই পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করার প্রয়াস চালাতে সচেষ্ট হন। 

উনিশ শতককে বিভিন্ন কারণে বাংলার নারী জাগরণের যুগ বলে চিনহিত করা হয়। কেননা এই যুগের মেয়েরা প্রথম তাদের দুষ্টিগ্রাহ্য সৃষ্টিশীলতা নিয়ে সমাজের সামনে আবির্ভূত হন।    

উনিশ শতকে বাংলারে মেয়েরা শুধু শিক্ষা গ্রহণের ব্যাপারে এগিয়ে আসেননি, বরং শিক্ষার মধ্যে দিয়ে নারী লেখক হওয়ার শক্তি অর্জন করতে শুরু করে। 
১৮৫৬ সালে কৃষ্ণ কামিনী দাসি নামে একজন নারী কবির কথা শোনা যায়। 

১৮৭৬ সালে রাসসুন্দরী দেবীর আত্মজীবনী প্রকাশিত হয়। এসময় বিভিন্ন পত্রিকায় বিচ্ছিন্ন ভাবে মেয়েদের লেখার নমুনা পাওয়া যায়। বিশেষত বামাবোধিনী, অবলাবান্ধব (১৮৬৯) বঙ্গনারী ১৮৭৫ , ভারতী (১৮৭৭) ইত্যাদি পত্রিকায়। 

উনিশ শতকে এসে বাংলার মুসলিম নারী লেখকের অস্তিত্বের বিষয়টি জোরালো হয়। কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী লেখেন রূপ-জালাল কাব্যগ্রন্থ। (১৮৩৪-১৯০৪)। 
এর মধ্যে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন শিক্ষার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি সাহিত্য রচনার মাধ্যমে নিজের সৃজনশীলতাকে বিকশিত করেন। (১৮২০ -১৯৩২)। 
১৯০৫ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, এম ফাতেমা খাতুন, সুফিয়া কামাল, জোবেদা খানম, নীলিমা ইব্রাহিম, এমন অসংখ্য নারী লেখকের কথা শোনা যায় ।  ১৯৪৭ সালে মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন প্রতিষ্ঠিত বেগম পত্রিকা বাঙালি নারীদের সৃজনশীল লেখালেখি চর্চায় উৎসাহিত করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এই পত্রিকার লক্ষ্যই ছিল গৃহবন্দী বাঙালি মুসলিম নারীদের কাছে পৌছানো। পাশাপাশি নতুন লেখিকা সৃষ্টি । ষাট ও সত্তরের দশকে বেগম বাঙালি নারীদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল। 

বাংলাদেশের নারী এগিয়েছে অনেক তবে এখনো তার অনেক পথ পারি দেয়া বাকি    নারী এখনো লিঙ্গ পার্থক্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা, নারীর বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় আবদ্ধ। হাজার বছর ধরে এই উপমহাদেশে নারী-পুরুষ বৈষম্যের যে মূল্যবোধ গড়ে তোলা হয়েছে, তা শক্তিশালী সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় বর্তমান সমাজের গভীরে প্রোথিত থেকে এখন পর্যন্ত ক্রিয়াশীল রয়েছে। এখনও পুরুষরাই সমাজের প্রধান ব্যক্তি, নারীরা তাদের অধীনস্থ। মানুষ হিসেবে মেয়েদের সামাজিক মর্যাদা পুরুষের সমান, এমন স্বীকৃতি আমাদের সমাজ এখনো দেয়নি। বরং সম্পত্তি ব্যবস্থা, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক প্রথা, আইন, ধর্ম ও রাষ্ট্র পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে নারীর অধীনস্থতাকে টিকিয়ে রাখতেই সহায়তা করে যাচ্ছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় লিঙ্গভিত্তিক শ্রম বিভাজন, সামাজিক কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, সম্পত্তির মালিকানা, কর্মসংস্থানগত সমস্যা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের নারীরা এখনো পিছিয়ে আছে। 

নারী আজ যখন সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে হিমালয়ের চূড়ায় পা রাখছে, তখন সমাজে সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন নারীর প্রতিচ্ছবি। শিল্প সাহিত্য শিক্ষা গবেষণা, খেলাধূলা ও সবরকমের পেশায় নারীর অংশগ্রহণ একদিকে নিজের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে তাকে পেছনে টেনে ধরছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। 
বলা হয়, বাংলাদেশের নারী সক্ষমতা অর্জন করেছে ঠিকই কিন্তু নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন হয়নি। 

ভারতীয় ইতিহাসবিদ রাম চন্দ্র গুহ সম্প্রতি এক আলোচনায় বলেছেন, ‘ধর্ম, আইন ও সমাজের দৃষ্টিতে নারীর অবস্থান পুরুষের সমান না হলে সমাজে নারী পুরুষের সাম্য তৈরি হবে না।’ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ একুশ শতকের আধুনিকতার যুগেও নারীর প্রতি সহিংসতা, নারী নির্যাতন সব সময়ই নারীর চলার পথে আতংকের কাঁটা বিছিয়ে দিচ্ছে।

একদিকে নারীর সামনে মৌলবাদী, ধর্মান্ধদের ফতোয়া, চোখ রাঙানি অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের ভয়াবহ ভোগবাদী ক্ষুধার বলী হওয়ার হাতছানি। এই দুয়ের মাঝখানে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন চর্চায়  সব ক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহণ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু নারী তার পরিপুর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে কতখানি প্রকাশিত হতে পেরেছে বা পারছে তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন থেকেই যায়।  

তবে আশার কথা এই যে, নারীর পশ্চাৎপদতা যে দূর করা প্রয়োজন এই উপলব্ধি আজ সমাজে সর্বত্র ব্যাপকতা লাভ করেছে।  নারী আজ নিজের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে খুঁজে নিতে চেয়েছে আলোকিত পথে চলার দিশা। ব্যক্তিগত বিকাশের মধ্য দিয়ে নারী চাইছে সমাজ ও সংস্কৃতিকে আরো এগিয়ে নিতে। মুছে ফেলতে চাইছে নিজের গায়ে লেগে থাকা হাজার বছরের অমর্যাদার চিনহ। এই চাওয়া যত প্রবল হবে, সমাজ  ও রাষ্ট্র যত বেশি এই চাওয়ার পক্ষে কাজ করবে, ততই ছিন্ন হবে শৃঙ্খল। ততই সমাজ ও সংস্কৃতিতে নারী রাখতে পারবে তার অর্থপূর্ণ সৃজনশীল অবদান।  

ডেইলি বাংলাদেশ/আরআর