Alexa বাংলাদেশের ভয়াবহ যত রেল দুর্ঘটনা

বাংলাদেশের ভয়াবহ যত রেল দুর্ঘটনা

জান্নাতুল মাওয়া সুইটি ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৪৭ ১৪ নভেম্বর ২০১৯   আপডেট: ১৫:৫১ ১৪ নভেম্বর ২০১৯

ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। চারদিক ধোয়াচ্ছন্ন। আগুনের তোড়ে এদিক ওদিক অসহায়ের মত ছুটছে মানুষ। সিরাজগঞ্জে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া রংপুর এক্সপ্রেসের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। এ সময় ট্রেনটির ইঞ্জিনসহ তিনটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগিতে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। 

বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে জেলার উল্লাপাড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট। জানা গেছে, চালকসহ প্রায় অর্ধশত যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। 

মাত্র দু’দিন আগে আরো একটি ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। মঙ্গলবার ভোর রাত পৌনে ৩টার দিকে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর তূর্ণা নিশীথা ও সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যু হয়। 

শুধু এই দুইটি ঘটনায় নয় অতীতে এমন অনেক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রায় হারিয়েছে অনেক মানুষ। সড়কপথের পাশাপাশি রেলপথেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কিন্তু কম নয়। ছোট-বড় নানা দুর্ঘটনার সম্মুখীন ট্রেনেও হতে হয়েছে। আর ট্রেন দুর্ঘটনা মানেই ভয়াবহতা, নির্মমতা। তবে এ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে সব মিলিয়ে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে ১১টি। তেমন কয়েকটি দুর্ঘটনা হলো-

টঙ্গীর বড় দুর্ঘটনা: ১৯৮৯ সালের ১৫ জানুয়ারি টঙ্গীর কাছে মাজুখানে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৭০ জন যাত্রী নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরো ৪০০ জন। এছাড়া ১৯৮৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের কাছাকাছি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এতে ১৩ জন নিহত হন ও ২০০ জন আহত হন।

সেতু ভেঙে দুর্ঘটনা: ১৯৮৩ সালের ২২ মার্চ ঈশ্বরদীর কাছে একটা রেল সেতু দিয়ে চলার সময় ভেঙে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে পরপর কয়েকটা স্পান ভেঙে পড়ে। কয়েকটি বগি নিচে শুকনো জায়গায় পড়ে। এ দুর্ঘটনায় ৬০ জন যাত্রী নিহত হন।

আগুন ধরে দুর্ঘটনা: ১৯৮৫ সালের ১৩ জানুয়ারি খুলনা থেকে পার্বতীপুরগামী সীমান্ত এক্সপ্রেসের কোচে আগুন ধরে যায়। এতে ২৭ জন যাত্রী নিহত হন এবং ২৭ জন আহত হন।

সর্বহারার নাশকতা: ১৯৮৬ সালের ১৫ মার্চ সর্বহারার নাশকতায় ভেড়ামারার কাছে ট্রেন লাইনচ্যুত হয় এবং নদীতে পড়ে যায়। এতে ২৫ জন যাত্রী নিহত হন এবং ৪৫ জন আহত হন।

ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনাহিলি ট্র্যাজেডি: ১৯৯৫ সালের ১৩ জানুয়ারি রাত সোয়া ৯টায় গোয়ালন্দ থেকে পার্বতীপুরগামী ৫১১ নম্বর লোকাল ট্রেনটি হিলি রেলস্টেশনের ১ নম্বর লাইনে এসে দাঁড়ায়। এর কিছুক্ষণ পর সৈয়দপুর থেকে খুলনাগামী ৭৪৮ নম্বর আন্তনগর সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনটি একই লাইনে ঢুকে পড়ে। এ সময় ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে গোয়ালন্দ লোকাল ট্রেনের ইঞ্জিনসহ দুটি বগি আন্তনগর ট্রেনের উপর উঠে যায়। এতে দুটি ট্রেনের অর্ধশতাধিক যাত্রী নিহত হয়। আহত হয় দুই শতাধিক।

নরসিংদীর দুটি ঘটনা: ২০১০ সালে চট্টগ্রামগামী আন্তনগর ‘মহানগর গোধূলি’ ও ঢাকাগামী মেইল ‘চট্টলা’ ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় দুটি ট্রেনের ইঞ্জিন দুমড়ে-মুচড়ে যায়। চট্টলা ট্রেনের একটি বগি মহানগর ট্রেনের ইঞ্জিনের উপর উঠে যায়। সেই দুর্ঘটনায় চালকসহ মোট ১২ জন নিহত হন। এরপর ২০১৬ সালে নরসিংদীর আরশীনগর এলাকায় ভুল সিগন্যালের কারণে লাইনচ্যুত হয় তিতাস কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন। ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছেড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছিল। এতে দুই জন নিহত ও ১০ আহত হন।

টঙ্গীর রেল দুর্ঘটনা: ২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল গাজীপুরের টঙ্গী এলাকায় যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ৫ জন নিহত হন। কমিউটার ট্রেনটি জামালপুর থেকে ঢাকা যাচ্ছিল। টঙ্গী এসেই ঘটে যত বিপত্তি। ট্রেনের ৫টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে যায়। টঙ্গীর নতুনবাজার এলাকায় দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা-জয়দেবপুর রেললাইনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয় প্রায় অর্ধশতাধিক।

কুলাউড়ায় দুর্ঘটনা: ২০১৯ সালের ২৩ জুন মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। উপজেলার বরমচাল রেলক্রসিং এলাকায় সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেসের ৪টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে খালে ছিটকে পড়ে। এ ঘটনায় ৬ জন নিহত হন। নিহতের মধ্যে ৩ জন নারী ও ৩ জন পুরুষ। সেদিন রাত ১২টার দিকে কুলাউড়ার বরমচাল স্টেশনের পাশে ঢাকাগামী উপবনের বগি ছিটকে পড়ে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংঘর্ষ: জেলার কসবা উপজেলায় দুই ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত হন। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর রাত পৌনে ৩টার দিকে উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় শতাধিক যাত্রী আহত হন। সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস এক নম্বর লাইনে ঢুকছিল। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তূর্ণা নিশীথাকে আউটারে থাকার সিগন্যাল দেয়া হয়। চালক সিগন্যাল অমান্য করে মূল লাইনে ঢুকে পড়লে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে ট্রেন দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। সংঘর্ষ ও লাইনচ্যুতিসহ দুর্ঘটনা পাঁচ হাজার ২৯৩টি। সবচেয়ে বেশি, ৪০ জনের প্রাণহানি ঘটে ২০০৬ সালের ১১ জুলাই জয়পুরহাটে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের দ্রুতগামী আন্ত নগর রূপসা এক্সপ্রেসের সঙ্গে যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষে। 

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে গত বছরের মে পর্যন্ত ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে এক হাজার আটটি। এসব দুর্ঘটনায় ১১৫ জন নিহত হয়। এ ছাড়া গত ২৩ জুন বরমচালে ট্রেন দুর্ঘটনায় চারজনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালে ১৬৬টি, ২০১৪ সালে ২৪২টি, ২০১৫ সালে ১৫৩টি, ২০১৬ সালে ১৩১টি, ২০১৭ সালে ১৪০টি, ২০১৮ সালে ১৫০টি আর চলতি বছরের মে পর্যন্ত ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে ২৬টি।

ডেইলি বাংলাদেশ/জেএমএস