Alexa বরফেই লাখো বছর টিকে থাকা এক লড়াকু নৃগোষ্ঠী

ডলগ্যান

বরফেই লাখো বছর টিকে থাকা এক লড়াকু নৃগোষ্ঠী

নুরুল করিম ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১২:১৫ ২৪ আগস্ট ২০১৯   আপডেট: ১৫:১৩ ২৪ আগস্ট ২০১৯

ডলগ্যান জনগোষ্ঠী

ডলগ্যান জনগোষ্ঠী

নৃবিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে এখনো প্রায় শতাধিক আদিম জনগোষ্ঠী রয়েছে যাদের ছোঁয়া আধুনিক সভ্যতা পায়নি। আবার অনেক গোষ্ঠীই আধুনিক সভ্যতার কাছে আসেনি। যেমন ‘ডলগ্যান’। তারা সাইবেরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বাস করে। মানুষের বসবাসের পক্ষে অনুপযুক্ত আবহাওয়া হলেও এখানেই প্রায় এক লাখ বছর আগে বসতি গড়ে তুলেছিল এই জনগোষ্ঠী।

তুষারমরু সাইবেরিয়ার অবস্থান অনেকেরই জানা। উত্তর দিকে উত্তর মহাসাগর, দক্ষিণে কাজাখিস্তান, মঙ্গোলিয়া ও চীন সীমান্ত। পূর্বে  প্রশান্ত মহাসাগর এবং পশ্চিমে উরাল পর্বতমালা। এর মাঝখানে এক কোটি একত্রিশ লাখ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই তুষারমরু। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে যে ভৌগোলিক অঞ্চলটি রাশিয়ার অংশ এবং যেটি সমগ্র রাশিয়ার ৭৭ শতাংশ অংশ জুড়ে আছে। সেখানে প্রতি বর্গমাইলে মাত্র ৬ থেকে ৭ জন মানুষ বসবাস করেন। এত কম হওয়ার নেপথ্য কারণ হচ্ছে, শীতকালে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা শূন্যের ৭০ ডিগ্রি নিচে নেমে যায়। সারা বছরে বৃষ্টিপাত হয় মাত্র ১৫ সেমি বা তারও কম। বছরে মাত্র ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ থাকে গ্রীষ্মকাল।

অস্তিত্বের সংগ্রামে হার মানেনা তারা

ডলগ্যানরা মূলত এশিয়ার লড়াকু তাতারদের বংশধর। এশিয়া থেকে হাজার হাজার বছর আগে তারা সাইবেরিয়া গিয়েছিল খাদ্যের সন্ধানে। রাশিয়ার মধ্যে বাস করে, আজও তারা সভ্যতা থেকে নিজেদের ইচ্ছে করেই দূরে রেখেছে। রাশিয়ানরা ১৭ শতাব্দীতে মধ্য ও পূর্ব সাইবেরিয়াতে ডলগ্যানদের দেখা পায়। এই রাশিয়ান উপজাতি অত্যন্ত লড়াকু এবং স্বাধীনচেতা নৃ-গোষ্ঠী।

বেশিরভাগ ডলগ্যান যাযাবর। গরমের সময়ে ডলগ্যানরা উত্তরের দিকে যায়। শীতে দক্ষিণের দিকে আসে একই পথ ধরে। প্রত্যেক বছর যাত্রাপথ পরিবর্তন করে। তিন বছর অন্তর অন্তর আবার পুরনো রুটে ফিরে আসে। জানা যায়, ডুডিনকা নামে এক শহরের আশেপাশে বাস করে প্রায় পাঁচ হাজার ডলগ্যান। প্রায় দুই হাজারের বেশি ডলগ্যান সাইবেরিয়ার একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করে। তুষারঝড় ও মৃত্যুশীতল তাপমাত্রায় প্রতিনিয়ত লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। যাদের জীবনযাত্রা এক কথায় অবিশ্বাস্য।

স্লেজ গাড়ি ও বাড়ি

গাড়ি, বাড়ি ও খাবার

বরফের মধ্যে ডলগ্যানরা চলাফেরার জন্য ব্যবহার করে থাকে স্লেজ গাড়ি। এই গাড়িগুলো করেই টেনে নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ি। এই বাড়িগুলোর নাম ‘চাম’। বহনযোগ্য শঙ্কু আকৃতির বাড়িগুলো সাধারণত একটি ঘরের ও বাক্স আকৃতিরগুলো দুটি ঘরের হয়। একটি ঘরে বড়জোর চারজন বসবাস করতে পারে। প্রত্যেক ঘরে একটা করে জানলা থাকে। ভেতরে সারাদিন চর্বির প্রদীপ জ্বলে। কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করার জন্য বিশেষ নল থাকে। তাদের একটা রীতি আছে, পরিবারের ছেলের বিয়ের পর প্রথম সন্তান জন্মালে, ছেলেকে আলাদা বাড়ি বানিয়ে নিতে হয়।

খাবার হিসেবে সাইবেরিয়ার ডলগ্যানদের প্রথম পছন্দ বল্গা হরিণ। হরিণদের খাদ্য যেখানে পাওয়া যায়, সাধারণত সেখানেই অস্থায়ী গ্রাম পেতে ফেলে তারা। এই বিশাল শিংওয়ালা গড়ে আটশো কেজি ওজনের হরিণগুলির ওপর নির্ভর করেই বেঁচে রয়েছে ডলগ্যানরা। এই বল্গা হরিণরা এই জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও বস্ত্র জোগায়। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গোটা গ্রামকে স্লেজ গাড়িতে করে বহন করে নিয়ে যায়।

এছাড়া পাহাড়ি ভেড়া, খরগোশ,হাঁস, পাখির মাংস ও ডিম খায় ডলগ্যানরা। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ খায় মাছ ও হরিণের দুধ। আটা জাতীয় খাবার খুব কমই খায় ডলগ্যানরা। সবজি প্রায় খায় না বললেই চলে। গ্রীষ্মের সময় মাশরুম সংগ্রহ করে রাখে শীতে খাওয়ার জন্য। সমস্ত খাবার স্লেজের ওপর রেখে বরফের গুড়ো ছড়িয়ে দেয়  বা বরফের গর্তে রাখে।

ডলগ্যান জনগোষ্ঠীর সবাই কিছু না কিছু করে

কে কী করে?

ডলগ্যান জনগোষ্ঠীর কেউই অলস থাকে না। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ—সবাই কিছু না কিছু করে। পুরুষরা শিকারে যায়। কাঠ, হাড়, চামড়া দিয়ে শিকারের অস্ত্র তৈরি করে। স্লেজ গাড়িতে বহনযোগ্য মাছ ধরার নৌকা তৈরি করে। বল্গা হরিণদের দেখভাল করে ও হরিণদের প্রজনন করায়। হরিণের গা থেকে পশম তোলে। বরফের তলায় জমিয়ে রাখা মাছ বা মাংস কুড়ুল দিয়ে কাটে। জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে। গ্রীষ্মকালে দূর থেকে স্লেজে করে বরফ খন্ড নিয়ে আসে খাবার জলের জন্য। শহরে চামড়া ও শিং বেচতে যায়। স্থানান্তরের সময় গ্রাম গুটিয়ে স্লেজে বোঝাই করে।

অন্যদিকে ডলগ্যান নারীরা পরিবারের জন্য খাবার বানায়। বিভিন্ন পশুর পশম ও  চামড়া দিয়ে দিয়ে পোশাক, বিছানার চাদর, তাঁবু তৈরি করে। বল্গা হরিণের পায়ের চামড়া দিয়ে জুতা বানায়। বিভিন্ন পশু পাখির নাড়িভুঁড়ি শুকিয়ে ও পাকিয়ে এরা সুতোর কাজ চালায়। নারীদের আরেকটি কাজ হল, গ্রামের নিরাপত্তারক্ষীদের দেখভাল করা। ডলগ্যান সমাজে বয়স্ক নারী পুরুষদের কথাকে সবাই বেদবাক্য বলে মানা হয়। তাদের কাজ গ্রামবাসীদের মধ্যে একতা ধরে রাখা ও বিয়ের ঘটকালি করা।

ডলগ্যানদের জীবন রহস্যের অনেকটাই এখনো অজানা। তবে এটা সবারই জানা যে, হিমশীতল তুষারমরুর বরফে শুয়ে থাকে রুদ্ধশ্বাস ও লড়াকু জীবন শেষ করা এই যোদ্ধারা কখনো হার মানে না।

ডেইলি বাংলাদেশ/এনকে