বনের গাছ গিলছে করাতকল

বনের গাছ গিলছে করাতকল

ইমরান হোসাইন, পাথরঘাটা (বরগুনা) ডেইলি-বাংলাদেশ ডটকম

প্রকাশিত: ১৫:৫৬ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

পাথরঘাটার কামারহাট বাজারের স্টিলব্রিজ সংলগ্ন অবৈধ করাতকল। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পাথরঘাটার কামারহাট বাজারের স্টিলব্রিজ সংলগ্ন অবৈধ করাতকল। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা ৮২টি করাতকলের মধ্যে ৪৮টিই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দফতরের অনুমোদন ছাড়াই চলছে এসব করাতকল। যত্রতত্রভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা এসব করাতকলে একদিকে যেমন উজাড় হচ্ছে বনজ সম্পদ, অন্যদিকে প্রতি বছর সরকার হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

পাথরঘাটা বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলায় যথাযথ পক্রিয়ায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত করাতকলের সংখ্যা মাত্র ২২টি। অপরদিকে লাইসেন্সবিহীন অবৈধভাবে ৪৮টি পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যে ১২টি লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। বন বিভাগের আইনে বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে করাতকল স্থাপন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও রয়েছে ১৮টি অবৈধ করাতকল।

সংরক্ষিত সামাজিক বনায়নের ভেতর বনঘেঁষে, এমনকি বন কর্মকর্তাদের কার্যালয়ের কাছেই স্থাপন করা হয়েছে অবৈধ করাতকল। সংরিক্ষত বন থেকে চোরাই পথে আনা বিভিন্ন গাছ অবাধে চেরাই ও বিক্রি হচ্ছে এসব করাত কলে। এসব অবৈধ করাতকলে কাঠ চোর ও অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ীরা চেরাচ্ছে বনের গাছ। ফলে ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি ও পরিবেশ, আর উজাড় হচ্ছে বন। এতে হারিয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। হুমকির মুখে পড়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।

করাতকল বিধিমালা-২০১২তে বলা আছে, কোনো সরকারি অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিনোদন পার্ক, উদ্যান এবং জনস্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য সমস্যার সৃষ্টি করে এমন স্থান থেকে কমপক্ষে ২০০ মিটার এবং সরকারি বনভূমির সীমানা হতে কমপক্ষে ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপন করা যাবে না। তবে এই নিদের্শনা কেউ মানছে না। বিধিবহির্ভূতভাবে যত্রতত্র বসানো হয়েছে করাতকল। আর এসব কলগুলো দেদারছে চলার কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বৈধ করাতকলগুলো। 

একাধিক করাতকল মালিক জানান, ট্রলারের কাঠ কাটার সূত্র ধরেই করাত কলের ব্যবসা। স্থানীয় ইউপি ও পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স করা হয়। অবৈধ করাতকলগুলো পরিদর্শনে কোনো সময় উপর মহল থেকে কেউ এলে তাদের ম্যানেজ করা হয়।

বৈধ করাতকল মালিকদের অভিযোগ, অবৈধ করাতকলগুলো দেদারছে চলার কারণে তাদের কলগুলো ভালোভাবে চলছে না। তারা আরো বলেন, বনাঞ্চলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে করাতকল স্থাপনের সরকারি বিধান না থাকলেও স্থানীয় বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে স্থানীয় লোকজন বনাঞ্চলে গড়ে তুলেছেন অবৈধ বহু করাতকল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রেঞ্জ অফিস ও বিট অফিসের নাকের ডগায় মালিকরা করাতকল স্থাপন করে দিন-রাত চোরাই কাঠ চিরাই করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, বিট কর্মকর্তা ও ফরেস্ট গার্ডদের প্রতাক্ষ সহযোগিতায় এসব করাতকল চলছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব করাতকল ও অতিরিক্ত গাছ চুরির কারণে প্রতি বছর সরকারের কোটি কোটি টাকার বাগান ধ্বংস হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান না থাকায় সংরক্ষিত বাগান বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব অবৈধ করাতকলের মাধ্যমে বেপরোয়াভাবে চলছে বৃক্ষ নিধন।

পাথরঘাটা উপজেলা বন ও পরিবেশ কমিটির সভাপতি ফাতিমা পারভীন বলেন, অবৈধ করাতকল বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়া হয়েছে। বন রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। অবৈধ করাতকলে প্রকাশ্যে বনের গাছ চিরাই ও পাচার হচ্ছে। এতে পরিরেশের ভারসাম্য নষ্ট ও মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

পাথরঘাটা বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান অবৈধ করাত কলের দাপটের কথা স্বীকার করে বলেন, এসব অবৈধ করাতকলের বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। যারা অবৈধভাবে চালাচ্ছে তাদেরকে এরইমধ্যে নোটিশ দেয়া হয়ছে। অনেকে লাইসেন্স পেতে অবেদন করেছেন। বাকিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে করাতকল স্থাপনের সঙ্গে আমি কিংবা আমার বিট অফিসারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। 

তবে বিষয়টি নিয়ে পাথরঘাটার ইউএনও মো. হুমায়ূন কবিরের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সামাজিক বন বিভাগের পটুয়াখালী বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, অবৈধ ও অনুমোদনবিহীন করাতকলের তালিকা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে দেয়া হয়েছে। করাতকল মালিকদের বনবিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সর্তক করে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এদের উচ্ছেদ করতে হলে প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন।

 


 

ডেইলি বাংলাদেশ/জেডআর